ইয়েমেনের নিস্তব্ধ এক জনপদে উওয়াইস আল-কারনি (রহ.)-এর জীবন কেটে যাচ্ছিল খুব সাধারণভাবে। তাঁর জীবনে ছিল না রাজকীয় চাকচিক্য, ছিল না মানুষের ভিড়, ছিল না নিজের নাম প্রচার করার কোনো চেষ্টা। তিনি নিজের রবের সঙ্গে সম্পর্ককে মানুষের প্রশংসার চেয়ে বেশি মূল্য দিতেন। তাঁর জীবনের অন্যতম বড় শিক্ষা ছিল—**আল্লাহর পথে চলতে গেলে সবসময় মানুষের বাহবা, সঙ্গ বা স্বীকৃতি পাওয়া জরুরি নয়।**
একসময় এমনও হতে পারে, আপনি ভালো কাজ করছেন অথচ আপনার আশপাশের মানুষ সেটিকে বুঝছে না। আপনি সত্য কথা বলছেন, কিন্তু কেউ আপনার পাশে দাঁড়াচ্ছে না। আপনি আল্লাহর ওপর ভরসা করছেন, কিন্তু পরিস্থিতি আপনার বিপরীত মনে হচ্ছে। তখন মানুষের ভেতরে একটি প্রশ্ন জাগে—“আমি কি ভুল পথে আছি?”
উওয়াইস (রহ.)-এর জীবন আমাদের শেখায়, মানুষের স্বীকৃতি না পাওয়া মানেই আল্লাহর কাছে আপনি অগ্রহণযোগ্য—এমন নয়।
বরং অনেক সময় আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জীবন বাহ্যিকভাবে খুব সাধারণ থাকে।
উওয়াইস (রহ.)-এর বিশেষ মর্যাদার বিষয়টি রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের জানিয়েছিলেন। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় তাঁর মায়ের প্রতি আনুগত্য এবং তাঁর বিশেষ মর্যাদার কথা এসেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি নিজে নিজের মর্যাদা নিয়ে মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বেড়াননি।
এখানেই তাঁর জীবনের আরেকটি গভীর শিক্ষা লুকিয়ে আছে।
**যে ব্যক্তি সত্যিই আল্লাহকে চেনে, সে নিজের আমল নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যায় না।**
সে বরং ভয় করে—“আমার আমল কি কবুল হয়েছে?”
মানুষের সামনে সে হয়তো ভালো কাজ করেছে, কিন্তু নিজের অন্তরে সে নিজেকে নিরাপদ মনে করে না।
### নিজের আমলকে বড় মনে না করা
ধরুন, একজন মানুষ প্রতিদিন কিছু ইবাদত করে। সে কয়েকজন মানুষকে সাহায্য করে। দরিদ্রকে দান করে। মা-বাবার সেবা করে। এরপর ধীরে ধীরে তার মনে হতে পারে—“আমি তো অন্যদের চেয়ে ভালো।”
এখান থেকেই বিপদ শুরু।
কারণ নেক আমল মানুষকে আল্লাহর কাছাকাছি নেওয়ার কথা, কিন্তু সেই আমল যদি অহংকার সৃষ্টি করে, তাহলে মানুষ আমলের উদ্দেশ্যই হারিয়ে ফেলতে পারে।
উওয়াইস (রহ.)-এর জীবনের শিক্ষা হলো—**ভালো কাজ করার পর নিজেকে বড় মনে করো না; বরং আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার জন্য দোয়া করো।**
একজন কৃষক সারাদিন মাঠে কাজ করে। সন্ধ্যায় তার হাতে হয়তো সামান্য কয়েকটি ফসল আসে। সে যদি বলে, “আমি কিছুই করিনি,” তবুও তার শ্রম আল্লাহর কাছে অজানা নয়।
একজন মা রাত জেগে সন্তানের যত্ন নেন। কেউ তাঁর প্রশংসা করে না। তবুও তাঁর কষ্ট আল্লাহ জানেন।
একজন বাবা পরিবারের জন্য হালাল রোজগারের উদ্দেশ্যে সারাদিন পরিশ্রম করেন। কেউ তাঁর ক্লান্তি দেখে না। তবুও আল্লাহ দেখেন।
একজন সন্তান বৃদ্ধ মায়ের পাশে বসে থাকে, অথচ সমাজ তাকে কোনো পুরস্কার দেয় না। তবুও সেই সেবার মূল্য আল্লাহর কাছে থাকতে পারে।
উওয়াইস (রহ.)-এর জীবন যেন আমাদের শেখায়—**মানুষের সার্টিফিকেটের দরকার নেই, যদি আল্লাহর কাছে আমল গ্রহণযোগ্য হয়।**
### যখন কেউ আপনার ভালো কাজ দেখবে না
মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো—সে চায় তার ভালো কাজ অন্যরা জানুক।
আপনি কাউকে সাহায্য করলেন—মনে হলো, সে অন্তত আপনাকে ধন্যবাদ দিক।
আপনি কারও বিপদে পাশে দাঁড়ালেন—চাইলেন, মানুষ আপনার কথা বলুক।
আপনি কোনো ভালো কাজ করলেন—চাইলেন, সবাই আপনাকে ভালো মানুষ বলুক।
কিন্তু উওয়াইস (রহ.)-এর জীবন আমাদের অন্য একটি পথ দেখায়।
কিছু ভালো কাজ এমন হওয়া উচিত, যা শুধু আল্লাহ জানেন।
রাতের অন্ধকারে দুই রাকাত নামাজ।
কাউকে না জানিয়ে সামান্য দান।
কারও ভুল ক্ষমা করে দেওয়া।
মায়ের জন্য নিঃশব্দে পানি এনে দেওয়া।
কারও দুঃখ শুনে তার জন্য গোপনে দোয়া করা।
কেউ জানল না—তবুও আপনি করলেন।
কারণ আপনি জানেন, **আল্লাহ জানেন।**
এটাই ইখলাসের সৌন্দর্য।
### খ্যাতি না পাওয়ার কষ্ট
একদিন কল্পনা করুন, একজন মানুষ অনেক ভালো কাজ করল। কিন্তু তার নাম কেউ বলল না।
অন্য একজন সামান্য একটি কাজ করল, কিন্তু তার প্রশংসায় চারদিক ভরে গেল।
প্রথম মানুষটি যদি কষ্ট পেয়ে ভালো কাজ ছেড়ে দেয়, তাহলে বুঝতে হবে তার অন্তর মানুষের স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করছিল।
কিন্তু যদি সে বলে, “আমার রব তো দেখেছেন,” তাহলে তার অন্তর শক্তিশালী হয়েছে।
উওয়াইস (রহ.)-এর জীবন এই শিক্ষাই দেয়।
আপনার ভালো কাজের খবর যদি কেউ না রাখে, তবুও হতাশ হবেন না।
আপনার মা যদি আপনার ত্যাগের কথা কাউকে না বলেন, তবুও মায়ের সেবা করুন।
আপনার বাবা যদি আপনার জন্য গর্ব প্রকাশ না করেন, তবুও তাঁর পাশে থাকুন।
আপনার বন্ধু যদি আপনার উপকার ভুলে যায়, তবুও আল্লাহর জন্য ক্ষমা করুন।
আপনি যদি সত্যের ওপর থাকেন এবং মানুষ আপনাকে ভুল বোঝে, তবুও ধৈর্য ধরুন।
কারণ মানুষের স্মৃতি ছোট, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান অসীম।
### উওয়াইস (রহ.) আমাদের আরেকটি বিষয় শেখান—নিজেকে প্রচার করো না
মানুষ যত ভালো কাজ করে, ততই তার মনে হতে পারে যে অন্যদের জানানো দরকার।
কিন্তু আল্লাহর বান্দার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো—সে কি প্রশংসা ছাড়াও ভালো থাকতে পারে?
আপনি যদি কাউকে সাহায্য করেন এবং সে আপনাকে অপমান করে, আপনি কি তবুও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাকে ক্ষমা করতে পারবেন?
আপনি যদি সৎ থাকেন এবং কেউ আপনাকে বোকা মনে করে, আপনি কি তবুও সততা ছাড়বেন না?
আপনি যদি মা-বাবার সেবা করেন এবং কেউ আপনাকে বলে, “এতে তোমার কী লাভ?” আপনি কি তবুও সেবা চালিয়ে যাবেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আপনার ইখলাসের পরীক্ষা।
উওয়াইস (রহ.)-এর জীবন আমাদের বলে—**মানুষের চোখে আপনার মূল্য কমে গেলেও আল্লাহর জন্য আপনার কাজের মূল্য কমে যায় না।**
### একজন অখ্যাত মানুষের কাছে দোয়া চাওয়া
উমর (রা.)-এর মতো মহান সাহাবি যখন উওয়াইস (রহ.)-এর পরিচয় জানতে আগ্রহী হয়েছিলেন এবং তাঁর কাছে দোয়া চেয়েছিলেন, তখন এর মধ্যে একটি অসাধারণ শিক্ষা ছিল।
উমর (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম মহান ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তিনি জানতেন—আল্লাহর কাছে কার মর্যাদা কত, তা বাহ্যিক পরিচয় দিয়ে বোঝা যায় না।
এটি আমাদের অহংকারের জন্য বড় শিক্ষা।
কখনো আপনি অফিসে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে দেখতে পারেন।
কখনো একজন বৃদ্ধ রিকশাচালককে দেখতে পারেন।
কখনো কোনো দরিদ্র শ্রমিককে দেখতে পারেন।
কখনো একজন সাধারণ বৃদ্ধাকে দেখতে পারেন।
আপনি জানেন না, তাঁদের মধ্যে কে আল্লাহর কাছে আপনার চেয়ে বেশি মর্যাদাবান।
তাই কাউকে তুচ্ছ করা থেকে নিজেকে বাঁচাতে হবে।
কারণ **আল্লাহর কাছে মানুষের আসল মর্যাদা পোশাকে নয়, সম্পদে নয়, পরিচয়ে নয়—তাকওয়া ও আমলে।**
### নিজের অজ্ঞাত অবস্থাকে আল্লাহর জন্য গ্রহণ করা
উওয়াইস (রহ.)-এর জীবন আমাদের আরও একটি সুন্দর শিক্ষা দেয়—সবাইকে আপনার সম্পর্কে জানাতে হবে না।
আপনি কী করেন, কত ইবাদত করেন, কাকে সাহায্য করেন—সবকিছু মানুষের জানার প্রয়োজন নেই।
আপনার জীবনে এমন একটি অংশ থাকুক, যেখানে আপনি আর আপনার রব ছাড়া আর কেউ থাকবে না।
সেখানে থাকবে আপনার কান্না।
থাকবে আপনার দোয়া।
থাকবে আপনার অনুতাপ।
থাকবে আপনার গোপন সাদাকা।
থাকবে আপনার ক্ষমা করে দেওয়া।
থাকবে আপনার মা-বাবার জন্য করা নিঃশব্দ সেবা।
মানুষ যদি আপনার জীবনের এই অংশ না জানে, তাতে আপনার কিছু হারাবে না।
বরং হয়তো এটাই আপনার সবচেয়ে নিরাপদ আমল হয়ে থাকবে।
### শেষ পর্যন্ত আসল পরিচয় কী?
একদিন পৃথিবীর সব পরিচয় শেষ হয়ে যাবে।
আপনার পেশা থাকবে না।
আপনার পদ থাকবে না।
আপনার সম্পদ থাকবে না।
আপনার সামাজিক মর্যাদা থাকবে না।
মানুষ আপনাকে কতবার প্রশংসা করেছে—সেটিও কোনো কাজে আসবে না।
তখন থাকবে শুধু আপনার আমল এবং আল্লাহর রহমত।
উওয়াইস আল-কারনি (রহ.)-এর জীবন তাই আমাদের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন রাখে—
**“তুমি মানুষের কাছে কতটা পরিচিত হতে চাও, নাকি আল্লাহর কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হতে চাও?”**
যদি মানুষ আপনাকে ভুলে যায়, তবুও আল্লাহ যেন আপনাকে ভুলে না যান—এই দোয়াই হওয়া উচিত।
যদি আপনার ভালো কাজের কোনো ছবি না থাকে, তবুও আল্লাহ যেন তা কবুল করেন—এটাই যথেষ্ট।
যদি কেউ আপনার ত্যাগের গল্প না জানে, তবুও আল্লাহ যেন তা জানেন—এটাই সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
আর যদি কোনোদিন মনে হয়, “আমাকে কেউ মূল্য দেয় না,” তখন উওয়াইস (রহ.)-এর জীবন মনে করুন।
**পৃথিবীর অজ্ঞাত হওয়া পরাজয় নয়। আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়াই প্রকৃত সফলতা।**
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!