প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসএক দরিদ্র যুবক

গল্প ও উপন্যাস

এক দরিদ্র যুবক

এক দরিদ্র যুবক

ছোট্ট জনপদের প্রান্তে থাকত এক দরিদ্র যুবক। তার নাম ছিল সালেহ। পরিবারের অবস্থা খুব ভালো ছিল না। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই তার কাঁধে এসে পড়েছিল। দিনের বেলা সে শহরের এক ব্যবসায়ীর গুদামে কাজ করত। কাজটি খুব সাধারণ—গুদামের মাল গুছিয়ে রাখা, হিসাবের খাতা পৌঁছে দেওয়া, পণ্য ওঠানো-নামানো এবং সন্ধ্যায় দরজা-জানালা ঠিকমতো বন্ধ করে দেওয়া। বেতনও খুব বেশি ছিল না। কিন্তু সালেহের একটি গুণ ছিল—সে আমানতের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিল।

ব্যবসায়ী হাজী আবদুর রহমান ছিলেন সচ্ছল মানুষ। তিনি সালেহকে পছন্দ করতেন, কারণ অন্য কর্মচারীরা যেখানে সুযোগ পেলেই একটু-আধটু নিজের জন্য সরিয়ে রাখত, সেখানে সালেহ একটি সুতোও অনুমতি ছাড়া নিত না। একদিন ব্যবসায়ী তাকে বললেন, “সালেহ, তুমি গরিব—আমি জানি। তোমার সংসারে অভাবও আছে। কিন্তু তোমাকে আমি একটি কথা বলতে চাই, মানুষের সম্পদ পাহারা দেওয়া নিজের সম্পদ পাহারা দেওয়ার চেয়েও কঠিন। কারণ নিজের জিনিসের হিসাব মানুষ নিজেই রাখে, কিন্তু অন্যের জিনিসের হিসাব একদিন আল্লাহর কাছে দিতে হয়।”

বিজ্ঞাপন

সালেহ মাথা নিচু করে বলল, “হুজুর, আমি চেষ্টা করি যেন আপনার কোনো জিনিসের ব্যাপারে আমাকে লজ্জিত হতে না হয়।”

কয়েক মাস পর শহরের ব্যবসায়ীরা একটি বড় মেলার জন্য দূরের শহরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল। হাজী আবদুর রহমানও তার গুদামের অনেক মূল্যবান কাপড় ও পণ্য নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। যাওয়ার আগের রাতে তিনি গুদামের একটি ছোট ঘরে কিছু মূল্যবান জিনিস রেখে তালা লাগিয়ে দিলেন। তারপর সালেহকে বললেন, “আমি তিন দিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি। এই ঘরের চাবি তোমার কাছে থাকবে। এখানে এমন কিছু জিনিস আছে যেগুলোর মূল্য অনেক। কাউকে চাবি দেবে না। এমনকি আমার কোনো আত্মীয় এলেও আমার অনুমতি ছাড়া ঘর খুলবে না।”

সালেহ বলল, “আপনি নিশ্চিন্তে যান।”

ব্যবসায়ী চলে গেলেন।

প্রথম দিন সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই কাটল। দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যার পর হঠাৎ প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো। শহরের অনেক রাস্তা পানিতে ডুবে গেল। বিদ্যুৎও চলে গেল। গুদামের আশপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। কর্মচারীরা সবাই নিজেদের বাড়িতে চলে গেল। কিন্তু সালেহের বাড়ি ছিল অনেক দূরে, আর সে জানত গুদামের নিরাপত্তার দায়িত্ব তার ওপর।

রাত গভীর হলো। চারদিক নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে শুধু বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

সালেহ গুদামের বারান্দায় বসে ছিল। তার হাতে একটি পুরোনো লণ্ঠন। সে বারবার চারপাশ দেখছিল।

হঠাৎ গুদামের পেছনের দিক থেকে ক্ষীণ একটি শব্দ পেল সে।

সে কান খাড়া করল।

আবার শব্দ হলো।

মনে হলো কেউ যেন কাঠের দরজায় হাত দিচ্ছে।

সালেহ লণ্ঠন হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে পেছনের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল, দুজন লোক দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তারা তাকে দেখে পালানোর চেষ্টা করল। সালেহ চিৎকার করে লোকজন ডাকল। আশপাশের কয়েকজন এসে তাদের ধরে ফেলল।

পরদিন সকালে শহরের লোকেরা জানতে পারল, রাতে গুদামে চুরি করার চেষ্টা হয়েছিল। সবাই সালেহের প্রশংসা করতে লাগল।

কিন্তু আসল পরীক্ষা তখনও বাকি ছিল।

সেদিন দুপুরে হাজী আবদুর রহমানের এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় গুদামে এলেন। তিনি বললেন, “সালেহ, হাজী সাহেব আমাকে বলেছেন, ঘরের ভেতরের কিছু জিনিস বের করে দিতে।”

সালেহ বিনয়ের সঙ্গে বলল, “মাফ করবেন, হাজী সাহেব আমাকে স্পষ্টভাবে বলেছেন, তাঁর অনুমতি ছাড়া কাউকে ঘর খুলতে না দিতে।”

লোকটি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “আমি কি অপরিচিত? আমি তাঁর আত্মীয়। তুমি আমাকে বিশ্বাস করছ না?”

সালেহ মাথা নিচু করে বলল, “আমি আপনাকে অবিশ্বাস করছি না। কিন্তু আমার কাছে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটাকে অমান্য করতে পারি না।”

লোকটি রাগ করে চলে গেলেন।

সন্ধ্যার দিকে তিনি আবার এলেন। এবার তার সঙ্গে আরও দুজন লোক ছিল।

তিনি বললেন, “তুমি যদি এখনো দরজা না খোল, তাহলে তোমার চাকরি চলে যাবে।”

সালেহ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার নিজের অবস্থা তখন খুব খারাপ। কয়েকদিন ধরে ঘরে চাল কম ছিল। ছোট ভাইয়ের জন্য ওষুধ কিনতে হবে। চাকরি চলে গেলে সংসার কীভাবে চলবে, সে জানত না।

লোকটি আবার বললেন, “চাবি দাও।”

সালেহ নিজের পকেটের দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “চাকরি চলে গেলে আমি হয়তো কিছুদিন কষ্ট করব। কিন্তু আল্লাহর কাছে যদি আমানত নষ্ট করার অপরাধী হয়ে যাই, তাহলে সেই ক্ষতি কীভাবে পূরণ করব?”

লোকটি রাগ করে চলে গেলেন।

তিন দিন পর হাজী আবদুর রহমান ফিরে এলেন। ফিরে এসে প্রথমেই তিনি গুদামের হিসাব নিলেন। সবকিছু ঠিকঠাক ছিল।

তারপর তিনি সালেহকে ডেকে বললেন, “এই তিন দিনে কী হয়েছে?”

সালেহ পুরো ঘটনা খুলে বলল।

ব্যবসায়ী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “তুমি কি জানো, যে আত্মীয় তোমাকে চাপ দিয়েছিল, সে আমার অনুমতি ছাড়াই কিছু পণ্য নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল? আমি ইচ্ছা করেই কাউকে কিছু বলিনি। আমি দেখতে চেয়েছিলাম, আমার কর্মচারীদের মধ্যে কে আমার অনুপস্থিতিতে আমানত রক্ষা করে।”

সালেহ অবাক হয়ে গেল।

ব্যবসায়ী বললেন, “কিন্তু তুমি জানো না, তোমার জন্য আমি আরেকটি পরীক্ষা রেখেছিলাম।”

তিনি একটি ছোট বাক্স খুললেন। ভেতরে ছিল কিছু টাকা।

“এখানে তোমার তিন মাসের অতিরিক্ত বেতন আছে।”

সালেহ বলল, “হুজুর, আমি তো কোনো অতিরিক্ত কাজ করিনি।”

হাজী আবদুর রহমান বললেন, “তুমি যা করেছ, তা শুধু আমার গুদাম পাহারা নয়। তুমি প্রমাণ করেছ, মানুষের চোখের আড়ালেও তোমার অন্তর আল্লাহকে মনে রাখে।”

সালেহ টাকা নিতে ইতস্তত করল।

ব্যবসায়ী বললেন, “এটি তোমার কাজের পুরস্কার নয়; এটি তোমার সততার প্রতি আমার সম্মান।”

সালেহ টাকা হাতে নিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল। তার মনে পড়ল সেই রাতের কথা, যখন চাকরি হারানোর ভয় তাকে ঘিরে ধরেছিল। সে বুঝতে পারল, মানুষের দেওয়া নিরাপত্তা সাময়িক, কিন্তু আল্লাহর ওপর ভরসা করলে অন্তর শক্ত হয়ে যায়।

কয়েক বছর পর সেই সালেহ আর সাধারণ কর্মচারী থাকল না। হাজী আবদুর রহমান তাকে নিজের ব্যবসার অংশীদার করে নিলেন। কারণ তিনি জানতেন, যে মানুষ সামান্য সম্পদের আমানত রক্ষা করতে পারে, তাকে বড় দায়িত্ব দিলেও সে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না।

সালেহ ধনী হওয়ার পরও নিজের পুরোনো দিনের কথা ভুলে যায়নি। সে প্রায়ই কর্মচারীদের বলত, “মানুষ যখন তোমাকে দেখে না, তখন তুমি কী করছ—সেটাই তোমার আসল চরিত্রের পরীক্ষা। লোকের প্রশংসা পাওয়ার জন্য সৎ হওয়া সহজ। কিন্তু যখন কেউ দেখছে না, তখনও হারাম থেকে নিজেকে বাঁচানোই প্রকৃত তাকওয়ার লক্ষণ।”

একদিন তার এক কর্মচারী তাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি তখন এত ভয় থাকা সত্ত্বেও দরজা খুললেন না কেন?”

সালেহ মৃদু হেসে বলল, “কারণ আমি ভাবিনি দরজার ওপাশে শুধু মালিকের সম্পদ আছে। আমি ভেবেছিলাম, দরজার ওপাশে আমার আমানত আছে। আর আমার ওপর যে আমানত রাখা হয়েছে, তার হিসাব একদিন আমাকে সেই রবের কাছেই দিতে হবে, যাঁর কাছ থেকে কিছুই গোপন নয়।”

সেদিন কর্মচারীটি কোনো উত্তর দিতে পারল না।

সালেহ জানত, দুনিয়াতে মানুষ তাকে হয়তো সৎ বলবে, বিশ্বাসযোগ্য বলবে, ভালো কর্মচারী বলবে। কিন্তু তার আসল আকাঙ্ক্ষা ছিল অন্য কিছু—সে চেয়েছিল, আসমানের মালিক যেন তাকে আমানতদার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।

গল্পের শিক্ষণীয় বিষয় হলো—আমানত রক্ষা শুধু বড় বড় সম্পদের ক্ষেত্রে নয়; ছোট একটি দায়িত্বও আমানত। মানুষ না দেখলেও আল্লাহ দেখেন। অভাব মানুষকে হারামের দিকে ঠেলে দিতে পারে, কিন্তু ঈমান তাকে থামিয়ে দিতে পারে। ক্ষমতাবান বা পরিচিত কেউ অন্যায় করতে বললেও সত্যের সীমা অতিক্রম করা যাবে না। চাকরি, টাকা, সম্মান—সবই হারিয়ে যেতে পারে; কিন্তু আল্লাহর কাছে একজন আমানতদার মানুষের মর্যাদা অনেক বড়। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—“এখানে মানুষ আমাকে দেখছে কি না” নয়, বরং “আল্লাহ আমাকে দেখছেন—আমি কি তাঁর সন্তুষ্টির মতো কাজ করছি?”

০ মন্তব্য · ৫৪ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!