প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসপারস্যের বাহিনী

গল্প ও উপন্যাস

পারস্যের বাহিনী

পারস্যের বাহিনী

রোমান সৈন্যরা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে শত্রুর কাছে পৌঁছেছিল… তারপর সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গেই তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল বিষাক্ত ধোঁয়া! 

ভাবুন তো... খ্রিষ্টীয় ২৫৬ সাল। সিরিয়ার ইউফ্রেটিস নদীর তীরে রোমানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর—Dura-Europos। শহরটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে সাসানীয় পারস্যের বাহিনী।

বিজ্ঞাপন

প্রাচীর ভাঙতে পারছে না তারা। তাই তারা এমন একটি কৌশল নিল, যা আজকের যুদ্ধের ইতিহাসেও অবিশ্বাস্য মনে হয়— মাটির নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে শহরের প্রাচীরের নিচে পৌঁছে যাওয়া। রোমানরাও বুঝে গেল বিপদ। তারাও পাল্টা সুড়ঙ্গ খুঁড়ল। দুই পক্ষের সৈন্যরা যখন মাটির নিচে একে অপরের দিকে এগিয়ে আসছিল... একসময় তারা মুখোমুখি হয়ে গেল।

তারপর— অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতর হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ল মারাত্মক ধোঁয়া। প্রায় ২০ জন সৈন্য সেখানেই মারা গেল। প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রায় ১,৮০০ বছর পর সেই সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বের করে পেলেন— মানুষের হাড়, অস্ত্র এবং যুদ্ধের সেই ভয়ংকর মুহূর্তের প্রমাণ।

প্রথম অধ্যায় — যে শহরটি দুই সাম্রাজ্যের মাঝখানে ছিল

Dura-Europos ছিল ইউফ্রেটিস নদীর তীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন শহর। এটি গ্রিক, পার্থিয়ান এবং পরে রোমান ও সাসানীয় শক্তির প্রভাবের মধ্যে ছিল। খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে শহরটি রোমান নিয়ন্ত্রণে আসে। এর অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— কারণ এটি ছিল রোমান সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। কিন্তু ২৫৬ সালে সাসানীয় সম্রাট Shapur I-এর বাহিনী শহরটি আক্রমণ করে।

দ্বিতীয় অধ্যায় — প্রাচীর ভাঙা যাচ্ছিল না

রোমানরা শহরের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করেছিল। প্রাচীরের ভেতরের দিকে বিশাল মাটির embankment তৈরি করা হয়েছিল, যাতে শত্রুর আক্রমণে দেয়াল সহজে ভেঙে না পড়ে। সাসানীয় বাহিনী তখন অন্য পথ বেছে নেয়। তারা প্রাচীরের নিচে mine tunnel খুঁড়তে শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল— দেয়ালের নিচের মাটি সরিয়ে সেটিকে দুর্বল করে ফেলা। তারপর প্রাচীর ধসে পড়বে। শহরের প্রতিরক্ষা ভেঙে যাবে। কিন্তু রোমানরা তাদের পরিকল্পনা বুঝে ফেলেছিল।

তৃতীয় অধ্যায় — শুরু হলো মাটির নিচের যুদ্ধ

রোমান সৈন্যরা পাল্টা tunnel খুঁড়তে শুরু করল। উদ্দেশ্য ছিল সাসানীয়দের underground mine-এ পৌঁছে তাদের থামানো। এটি ছিল এমন এক যুদ্ধ— যেখানে উপরে শহরের প্রাচীর।

আর তার কয়েক মিটার নিচে— দুই বাহিনীর সৈন্যরা অন্ধকারের মধ্যে একে অপরকে খুঁজছে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা পরে এই tunnel system-এর অবশেষ খুঁজে পান। সেখানে শুধু সুড়ঙ্গ নয়— সৈন্যদের মৃতদেহও পাওয়া যায়।

চতুর্থ অধ্যায় — তারপর এল ধোঁয়া

রোমানরা যখন সাসানীয়দের tunnel-এ পৌঁছায়, পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যায়।

প্রত্নতাত্ত্বিক Simon James-এর পুনর্বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাসানীয়রা sulfur ও bitumen/naphtha-জাত দাহ্য পদার্থ জ্বালিয়ে tunnel-এ বিষাক্ত ধোঁয়া তৈরি করে থাকতে পারে। সেই সংকীর্ণ সুড়ঙ্গে ধোঁয়া বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা ছিল খুব কম। ফলে সৈন্যদের জন্য শ্বাস নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এই ঘটনাকে অনেক গবেষক প্রাচীন chemical warfare-এর অন্যতম প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ হিসেবে দেখেছেন। তবে ঘটনাটির সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণায় কিছু বিতর্ক রয়েছে। 

পঞ্চম অধ্যায় — প্রায় ২০ জন সৈন্য অন্ধকারেই মারা গেল

১৯৩০-এর দশকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা Tower 19-এর কাছে সেই underground complex খনন করেন। সেখানে পাওয়া যায়— মানুষের দেহাবশেষ, সৈন্যদের সরঞ্জাম, এবং tunnel-এর ভয়ংকর ধ্বংসাবশেষ। পরবর্তী গবেষণায় ধারণা করা হয়, সেখানে অন্তত ১৯ জন রোমান সৈন্য এবং একজন সাসানীয় সৈন্য মারা গিয়েছিল। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়—

একজন মৃত রোমান সৈন্যের কাছে পাওয়া একটি মুদ্রার তারিখ ২৫৬ খ্রিষ্টাব্দ-এর সঙ্গে মিলে যায়। এটি siege-এর সময়কাল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে। 

ষষ্ঠ অধ্যায় — কিন্তু সুড়ঙ্গের যুদ্ধেই শহর শেষ হয়নি

সাসানীয়দের প্রথম underground attack পুরোপুরি সফল হয়নি। রোমানরা প্রাচীর রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল। এরপর সাসানীয়রা আরও mining operation শুরু করে। শহরের অন্য অংশে তারা একটি বিশাল assault ramp তৈরি করে। এই ramp-এর সাহায্যে সৈন্য ও siege equipment প্রাচীরের কাছে পৌঁছাতে পারত। অবশেষে প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে। Dura-Europos ২৫৬ খ্রিষ্টাব্দে সাসানীয়দের হাতে পতিত হয়।

সপ্তম অধ্যায় — তারপর শহরটি যেন সময়ের মধ্যে জমে গেল

শহরটি দখলের পর আর আগের মতো পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। ফলে অনেক ভবন, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যুদ্ধের চিহ্ন অস্বাভাবিকভাবে সংরক্ষিত থাকে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেখানে পেয়েছেন— রোমান সামরিক স্থাপনা, মন্দির, একটি বিখ্যাত synagogue, প্রাচীন Christian house-church, Mithraic sanctuary, বাড়িঘর, এবং সেই underground siege works।

এই কারণে Dura-Europos-কে প্রাচীন Near East বোঝার জন্য অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ archaeological site হিসেবে দেখা হয়। 

অষ্টম অধ্যায় — ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত "যুদ্ধক্ষেত্র"

Dura-Europos আমাদের যুদ্ধের একটি ভিন্ন ছবি দেখায়। যুদ্ধ শুধু তলোয়ার, বর্শা আর ঢালের লড়াই ছিল না। প্রাচীন সেনাবাহিনী ব্যবহার করত— সুড়ঙ্গ, siege ramp, প্রাচীর দুর্বল করার কৌশল, আগুন, ধোঁয়া, এবং পরিবেশকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার নানা পদ্ধতি।

আর এই শহরের মাটির নিচে সেই যুদ্ধের প্রমাণ আজও রয়ে গেছে। প্রায় ১,৮০০ বছর পরও।

শেষ কথা।

Dura-Europos-এর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় কোনো বিশাল যুদ্ধ নয়। বরং সেই অন্ধকার tunnel। ভাবুন— উপরে একটি শহর। প্রাচীরের ওপারে শত্রু। আর মাটির নিচে কয়েকজন সৈন্য অন্ধকারে নিজেদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছে। হঠাৎ চারপাশের বাতাস বদলে গেল।

ধোঁয়ায় ভরে গেল সুড়ঙ্গ। কয়েক মিনিটের মধ্যে যারা সেখানে যুদ্ধ করছিল— তারা নিজেরাই হয়ে গেল প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের অংশ। আজ আমরা সেই সুড়ঙ্গের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি— প্রাচীন যুদ্ধের কৌশল আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি নির্মম এবং sophisticated ছিল।

০ মন্তব্য · ৪৬ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!