প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসবরকত

গল্প ও উপন্যাস

বরকত

বরকত

পুরোনো শহরের ব্যস্ত বাজারে ছোট্ট একটি রুটির দোকান ছিল। দোকানটির মালিকের নাম ছিল আবু সালিম। ভোরের আজান শোনা যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই সে ঘুম থেকে উঠত। অজু করে ফজরের নামাজ আদায় করত, তারপর বাড়ির চুলায় আগুন জ্বালিয়ে রুটি তৈরির কাজে লেগে যেত। তার স্ত্রী আটা মাখতেন, আর আবু সালিম রুটি বেলতেন ও তন্দুরে সেঁকতেন। সূর্য ওঠার আগেই দোকানে গরম রুটির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত।

আবু সালিম ধনী ছিল না। তার দোকানও বড় ছিল না। একটি কাঠের কাউন্টার, পুরোনো দাঁড়িপাল্লা, কয়েকটি পিতলের পাত্র আর একটি মাটির তন্দুর—এই ছিল তার সম্পদ। প্রতিদিনের বিক্রির টাকা দিয়ে সংসারের খরচ চলত। বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ, সন্তানের পড়াশোনা এবং ঘরের খাবার—সবকিছুর হিসাব তাকে খুব সতর্ক হয়ে করতে হতো।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু তার একটি বিষয় নিয়ে পুরো বাজারে সুনাম ছিল—সে কখনো ওজনে কম দিত না।

একদিন সকালে এক ক্রেতা এসে বলল, “আবু সালিম, এক কেজি রুটি দাও।”

আবু সালিম দাঁড়িপাল্লায় রুটি রাখল। ওজন করে দেখল, এক কেজির চেয়ে সামান্য বেশি হয়েছে।

ক্রেতা বলল, “এতটুকু বেশি হয়েছে, একটা রুটি কমিয়ে দাও।”

আবু সালিম মাথা নেড়ে বলল, “না ভাই, আপনি এক কেজি চেয়েছেন। আমি এক কেজির চেয়ে একটু বেশি দিয়েছি। আপনি চাইলে এইটুকু নিয়ে যান।”

লোকটি বলল, “কিন্তু এতে তো আপনার ক্ষতি!”

আবু সালিম হাসল।

“একটা রুটির লাভ-ক্ষতি আমি জানি না। কিন্তু মাপে কম দেওয়া যে ক্ষতি, সেটা আমি জানি।”

লোকটি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

বাজারের পাশের আরেক দোকানি কথাটি শুনে হেসে বলল, “আবু সালিম, এভাবে ব্যবসা করলে তুমি কোনো দিন বড়লোক হতে পারবে না।”

আবু সালিম বলল, “বড়লোক হওয়ার জন্য আমি দোকান খুলি নি। হালালভাবে সংসার চালানোর জন্য খুলেছি।”

দোকানি বলল, “তুমি যদি প্রতিবার সামান্য কম দাও, কেউ বুঝবেও না।”

আবু সালিম উত্তর দিল, “মানুষ না বুঝলেও আল্লাহ বুঝবেন।”

দোকানি আর কিছু বলল না।

কয়েকদিন পর শহরে খাদ্যের দাম বেড়ে গেল। আটার দামও অনেক বেড়ে গেল। বাজারের প্রায় সব রুটি বিক্রেতাই দাম বাড়িয়ে দিল।

আবু সালিমও বাধ্য হয়ে রুটির দাম কিছুটা বাড়াল।

কিন্তু তার এক পুরোনো ক্রেতা এসে বলল, “আপনার দাম অন্যদের চেয়ে বেশি।”

আবু সালিম বলল, “আটার দাম বেড়েছে। আমি আগের দামে বিক্রি করলে আমার সংসার চালানো কঠিন হবে।”

লোকটি বলল, “অন্যরা তো কম দামে দিচ্ছে।”

আবু সালিম বলল, “তাহলে আপনি সেখান থেকে নিতে পারেন। আমি কাউকে জোর করছি না।”

লোকটি চলে গেল।

সেদিন দুপুরে দোকানে ক্রেতা কমে গেল। আবু সালিমের মনটা খারাপ হলো।

তার স্ত্রী বললেন, “আজ তো অনেক রুটি বাকি রয়ে গেল।”

আবু সালিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হ্যাঁ।”

স্ত্রী বললেন, “আমরা যদি একটু ওজন কমিয়ে দিতাম, তাহলে খরচ কম পড়ত।”

আবু সালিম শান্তভাবে বলল, “না। আমাদের ঘরে খাবার কম থাকলেও মানুষের হক কমিয়ে খাব না।”

সেদিন রাতে তার বৃদ্ধ মা তাকে ডাকলেন।

“বাবা, তুমি চিন্তিত?”

“হ্যাঁ, আম্মা। ব্যবসা আগের মতো চলছে না।”

মা বললেন, “তুমি কি কারও হক মেরে ব্যবসা চালাচ্ছ?”

“না।”

“হারাম কিছু মিশিয়েছ?”

“না।”

“তাহলে চিন্তা করো না। যে রিজিক আল্লাহ হালাল করেছেন, তা পেতে তোমাকে মানুষের হক কাটতে হবে না।”

মায়ের কথায় আবু সালিমের মন শান্ত হলো।

পরদিন সে আগের মতোই দোকান খুলল।

সকালে একজন বৃদ্ধা এলেন। তার হাতে খুব সামান্য টাকা।

তিনি বললেন, “বাবা, এত টাকা আছে। এতে যতটুকু রুটি হয় দাও।”

আবু সালিম রুটি মেপে দিল।

বৃদ্ধা টাকা গুনে বললেন, “বাবা, আমার টাকা তো একটু কম।”

আবু সালিম বলল, “ঠিক আছে। যতটুকু আছে, ততটুকুই দিন।”

বৃদ্ধা বললেন, “তাহলে রুটি একটু কমিয়ে দাও।”

আবু সালিম বলল, “না মা। আপনার যত টাকা আছে, তার হিসাবেই আমি রুটি দিয়েছি।”

বৃদ্ধা চোখ তুলে বললেন, “আল্লাহ তোমার ঘরে বরকত দিন।”

তিনি চলে গেলেন।

দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন যুবক সবকিছু দেখছিল। সে বলল, “চাচা, আপনি চাইলে ওই বৃদ্ধার কাছ থেকে পুরো দাম নিতে পারতেন। তিনি তো বুঝতেই পারতেন না।”

আবু সালিম বলল, “তুমি কি জানো, একজন অসহায় মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে টাকা নেওয়া আর তার হাতে থাকা শেষ কয়েকটি মুদ্রা নেওয়ার মধ্যে কত পার্থক্য?”

যুবক চুপ হয়ে গেল।

আবু সালিম বলল, “ব্যবসায় শুধু পণ্য বিক্রি হয় না। চরিত্রও বিক্রি হয়। তুমি যদি মানুষের বিশ্বাস বিক্রি করে টাকা উপার্জন করো, তাহলে একদিন দেখবে তোমার দোকান আছে, টাকা আছে, কিন্তু বরকত নেই।”

কয়েক মাস কেটে গেল।

আবু সালিমের দোকান খুব বড় হলো না, কিন্তু তার সুনাম বাড়তে লাগল। দূরের মানুষও তার দোকানে আসতে শুরু করল।

একদিন শহরের এক বড় ব্যবসায়ী তার দোকানে এলেন।

তিনি বললেন, “আমি শুনেছি তুমি ওজনে কম দাও না।”

আবু সালিম বলল, “আমি চেষ্টা করি।”

ব্যবসায়ী বললেন, “আমি তোমার কাছ থেকে প্রতিদিন অনেক রুটি কিনব। কিন্তু একটা শর্ত আছে।”

“কী শর্ত?”

“আমি একসঙ্গে অনেক রুটি নেব। তুমি আমাকে একটু কম ওজন দেবে। আমি বেশি দামে বিক্রি করব। তোমারও লাভ হবে, আমারও।”

আবু সালিম বুঝতে পারল, লোকটি তাকে প্রতারণার প্রস্তাব দিচ্ছে।

সে বলল, “আমি পারব না।”

ব্যবসায়ী বললেন, “কেন? সবাই তো করে।”

আবু সালিম বলল, “সবাই করে কি না জানি না। কিন্তু আমি করতে পারব না।”

ব্যবসায়ী বললেন, “তুমি জানো, আমার সঙ্গে ব্যবসা করলে তোমার দোকান কয়েক মাসের মধ্যে বড় হয়ে যাবে?”

আবু সালিম বলল, “আমার দোকান বড় হয়ে যদি আমার আমল ছোট হয়ে যায়, তাহলে সেই বড় দোকান আমার দরকার নেই।”

ব্যবসায়ী রাগ করে চলে গেল।

সেদিন রাতে আবু সালিমের স্ত্রী বললেন, “আপনি কি মনে করেন, লোকটির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে ভুল করেছেন?”

আবু সালিম বলল, “হয়তো দুনিয়ার হিসাবে লাভের সুযোগ হারিয়েছি। কিন্তু অন্তত রাতে ঘুমানোর সময় বুকের ওপর কোনো বোঝা থাকবে না।”

কিছুদিন পর বাজারে একটি বড় ঘটনা ঘটল।

শহরের খাদ্য পরিদর্শক বাজারের বিভিন্ন দোকানে ওজন পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। একের পর এক দোকানে ওজনে কম দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেল। কারও দাঁড়িপাল্লায় কারচুপি, কারও মাপে গোপন পরিবর্তন।

অবশেষে তিনি আবু সালিমের দোকানে এলেন।

তিনি রুটি ওজন করলেন।

এক কেজির বদলে সামান্য বেশি।

পরের ওজনেও একই অবস্থা।

পরিদর্শক বললেন, “তোমার দাঁড়িপাল্লা ঠিক আছে।”

আবু সালিম বলল, “আলহামদুলিল্লাহ।”

পরিদর্শক জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি জানো, বাজারের প্রায় সবাই ওজনে কম দিচ্ছে?”

আবু সালিম মাথা নাড়ল।

“জানি।”

“তাহলে তুমি কেন দাও না?”

আবু সালিম বলল, “কারণ আমি যখন ক্রেতা হই, তখন আমি চাই বিক্রেতা আমার হক ঠিকভাবে দিক। তাই আমি যখন বিক্রেতা হই, তখন অন্যের হক কমাতে চাই না।”

পরিদর্শক বললেন, “তোমার দোকানকে বাজারের সৎ দোকান হিসেবে ঘোষণা করা হবে।”

আবু সালিম বলল, “আমার নাম ঘোষণা করার দরকার নেই। শুধু মানুষ যেন ঠিক ওজন পায়।”

কিন্তু খবর ছড়িয়ে পড়ল।

এরপর থেকে আরও বেশি মানুষ তার দোকানে আসতে লাগল।

একদিন সেই বড় ব্যবসায়ী আবার এলেন, যিনি তাকে ওজনে কম দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

তিনি বললেন, “আবু সালিম, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি।”

আবু সালিম বলল, “কী হয়েছে?”

ব্যবসায়ী বললেন, “আমি তোমাকে হারাম পথে লাভ করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তুমি তা ফিরিয়ে দিয়েছিলে। এখন আমার নিজের ব্যবসায় সমস্যা হয়েছে। আমার কর্মচারীরা আমাকে ঠকিয়েছে। তখন বুঝেছি, অন্যকে ঠকিয়ে ব্যবসা করলে একদিন নিজের ওপরও সেই প্রতারণা ফিরে আসে।”

আবু সালিম বলল, “আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন।”

ব্যবসায়ী বললেন, “তুমি কি আমার সঙ্গে আবার ব্যবসা করবে?”

আবু সালিম কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “যদি ব্যবসা সঠিকভাবে হয়, অবশ্যই।”

ব্যবসায়ী বললেন, “আমি এবার তোমার শর্তে ব্যবসা করতে চাই।”

“আমার কোনো শর্ত নেই।”

“আছে।”

“কী?”

ব্যবসায়ী বললেন, “সঠিক ওজন, সঠিক দাম এবং কোনো প্রতারণা নয়।”

আবু সালিম মৃদু হাসল।

“তাহলে আমাদের শর্ত একই।”

সময়ের সঙ্গে তাদের ব্যবসা ভালো হতে লাগল। আবু সালিম ধনী হয়ে গেল কি না, সেটা নিয়ে সে কখনো চিন্তা করত না। সে শুধু চেষ্টা করত তার ঘরে যেন হারাম সম্পদ না ঢোকে।

বছর কয়েক পর তার ছেলে বড় হয়ে বাবার সঙ্গে দোকানে কাজ শুরু করল।

একদিন ছেলে বলল, “আব্বা, আপনি সবসময় একটু বেশি ওজন দেন। এতে তো আমাদের লাভ কমে যায়।”

আবু সালিম দাঁড়িপাল্লার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা, ব্যবসায় লাভ শুধু টাকার হিসাব নয়।”

ছেলে বলল, “তাহলে?”

আবু সালিম বলল, “যে টাকা তুমি ঘরে নিয়ে যাবে, সেটা তোমার সম্পদ। কিন্তু যে বিশ্বাস নিয়ে মানুষ তোমার দোকান থেকে বের হবে, সেটা তোমার চরিত্র।”

ছেলে চুপ করে রইল।

আবু সালিম আবার বলল, “মনে রেখো, এক রুটি কম দিয়ে তুমি হয়তো একদিন বেশি টাকা পাবে। কিন্তু যদি সেই এক রুটির কারণে কোনো মানুষের হক নষ্ট হয়, তাহলে সেই টাকা তোমার জন্য বোঝা হয়ে যেতে পারে।”

ছেলে বলল, “তাহলে ব্যবসার সবচেয়ে বড় মূলধন কী?”

আবু সালিম বলল, “বিশ্বাস।”

“আর তার চেয়েও বড়?”

“আল্লাহভীতি।”

সেদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে আবু সালিম দাঁড়িপাল্লাটি পরিষ্কার করল। তারপর সেটি দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখে বলল, “হে আল্লাহ, আমার ওজন ঠিক রাখার মতো আমার আমলও ঠিক রাখুন।”

তার ছেলে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।

সেদিন সে বুঝল—তার বাবা শুধু রুটি বিক্রি করেন না; তিনি মানুষকে শেখান, **হালাল রিজিকের স্বাদ অল্প হলেও তাতে শান্তি থাকে।**

### গল্পের শিক্ষা

ব্যবসায় সততা শুধু মানুষের বিশ্বাস অর্জনের উপায় নয়, এটি একজন মুসলমানের চরিত্রের পরীক্ষা। ক্রেতা না দেখলেও, বাজারের লোকজন না জানলেও, আল্লাহ সবকিছু দেখেন।

কারও হক সামান্য কমিয়ে দেওয়াকে ছোট বিষয় মনে করা উচিত নয়। মানুষের সম্পদ, সময়, শ্রম কিংবা বিশ্বাস—সবকিছুর ব্যাপারেই আমানতদারি জরুরি।

**অল্প লাভে সন্তুষ্ট থেকে হালাল পথে থাকা, বেশি লাভের জন্য মানুষের হক নষ্ট করার চেয়ে উত্তম।**

মনে রাখবেন, **হারাম উপার্জন ঘরে সম্পদ বাড়াতে পারে, কিন্তু বরকত বাড়ায় না। আর হালাল উপার্জন অল্প হলেও তার মধ্যে এমন শান্তি থাকতে পারে, যা বিপুল সম্পদ দিয়েও কেনা যায় না।**

০ মন্তব্য · ৩২ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!