প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসউমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)

গল্প ও উপন্যাস

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে শাহাদাতের কয়েক দিন পূর্বের ঘটনা। তিনি হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা:) এবং উসমান ইবনু হুনাইফ (রা:)-এর কাছে দাঁড়িয়ে বললেন, 'তোমরা কী করলে? তোমরা কি আশঙ্কা করছ যে, তোমরা ইরাক জমিনের ওপর এমন কর আরোপ করেছ, যা ওই ভূখণ্ডের মানুষের পরিশোধ করার ক্ষমতা নেই?

তারা বললেন, 'আমরা এমন পরিমাণ কর আরোপ করেছি, যা ইরাকের মানুষেরা বহন করতে সক্ষম; কারণ এর উৎপাদন অনেক বেশি।' 

বিজ্ঞাপন

উমর (রা:) আবার বললেন, 'তোমরা ভালোভাবে যাচাই করে দেখো, তোমরা ভূখণ্ডের মানুষদের ওপর এমন কোনো বোঝা চাপিয়ে দাওনি তো, যা বহন করার ক্ষমতা তাদের নেই?'

তারা বললেন, 'না, আমরা এমন করিনি।'

তখন উমর (রা:) বললেন, 'আল্লাহ যদি আমাকে জীবিত রাখেন, তাহলে আমি ইরাকের বিধবাদের এমন অবস্থায় রেখে যাব, যাতে আমার পরে তাদের কোনো পুরুষের মুখাপেক্ষী হতে না হয়।'

কিন্তু এর মাত্র চার দিন অতিবাহিত হওয়ার পরই তিনি আহত হলেন। উমর (রা:) এর উপর আক্রমণ করা হয়।

ফজরের ওয়াক্ত। উমর (রা.) যখন দুই কাতারের মাঝ দিয়ে যেতেন, তখন বলতেন, 'কাতার সোজা করো।'

যখন তিনি কাতারে কোনো ত্রুটি দেখতে পেতেন না, তখন সামনে এগিয়ে গিয়ে তাকবীর বলতেন। তিনি কখনো প্রথম রাকাতে সূরা ইউসুফ, কখনো সূরা নাহল অথবা এ ধরনের কোনো দীর্ঘ সূরা পড়তেন, যাতে লোকেরা নামাজে এসে যোগ দেওয়ার সুযোগ পায়।

উমর (রাঃ) তাকবীর বলার পরপরই বলে উঠলেন, 'একটি কুকুর আমাকে আঘাত করেছে!'

তখন এক অনারব ব্যক্তি দুই ধারবিশিষ্ট একটি ছুরি নিয়ে ডানে-বামে যাকে পাচ্ছিল তাকেই আঘাত করছিল। এভাবে সে তেরোজন লোককে আঘাত করল। তাদের মধ্যে সাতজন শহীদ হলেন।

একজন মুসলিম যখন বিষয়টি দেখলেন, তখন তিনি তার ওপর একটি চাদর ছুড়ে দিলেন। অনারব ব্যক্তি বুঝতে পারল যে তাকে ধরে ফেলা হয়েছে। তখন সে আত্মহত্যা করল।

*

উমর (রা:) আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রা:)-এর হাত ধরে তাকে সামনে এগিয়ে দিলেন যেন নামাজ শেষ করাতে পারে। 

যারা নামাজে সামনে এবং উমর (রা:)-এর পাশে ছিলেন, তারাই গোটা ঘটনা শুনতে বা দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু মসজিদের অন্যান্য অংশে যারা ছিলেন, তারা কিছুই বুঝতে পারেননি। শুধু তারা উমর (রা.)-এর কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিলেন না, ভাবছিলেন নামাযে কোনো সমস্যা হয়েছে এবং জোরে জোরে বলছিলেন, 'সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ!'

এরপর আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রা:.) উমর (রাঃ) এর জায়গায় গিয়ে মুসল্লিদের নিয়ে সংক্ষিপ্ত নামাজ আদায় করলেন।

নামাজ শেষ হলে আহত উমর (রা;) বললেন, 'হে ইবনু আব্বাস! কে আমাকে আঘাত করেছে, তা খুঁজে দেখো।'

ইবনু আব্বাস (রা.) কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করে এসে বললেন, 'মুগীরার গোলাম।'

উমর (রা:) বললেন, কারিগর?

আব্বাস বললেন, 'হ্যাঁ।'

উমর (রা.) বললেন, 'আল্লাহ তাকে ধ্বংস করুন! আমি তার প্রতি কোনো অন্যায় করিনি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে এমন কোনো ব্যক্তির হাতে মৃত্যুবরণ করাননি, যে নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে।'

*

এরপর উমর (রা.)-কে তার ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো এবং অন্যান্য সাহাবীরাও তার সঙ্গে গেল। তখন মানুষের অবস্থা এমন হয়ে গেল, যেন এর আগে তারা কোনো বিপদের সম্মুখীন হয়নি। কেউ বলছিল, 'চিন্তা করবেন না, তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন।' আবার কেউ বলছিল, 'আমরা আশঙ্কা করছি, তিনি মারা যাবেন।'

উমর (রা:) কাছে খেজুরের শরবত আনা হলো। তিনি তা পান করলেন, কিন্তু তা তার পেটের ক্ষত দিয়ে বের হয়ে গেল। এরপর দুধ আনা হলো। তিনি তা পান করলেন, সেটিও তার ক্ষত দিয়ে বের হয়ে গেল। তখন সবাই বুঝতে পারল যে তিনি মৃত্যুবরণ করবেন।

মানুষজন উমর (রাঃ)-কে দেখতে আসতে শুরু করলো। এসে তার প্রশংসা করতে লাগল।

এর মাঝে একজন যুবক এসে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার জন্য সুসংবাদ গ্রহণ করুন—আপনি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহচর্য লাভ করেছেন, ইসলামে আপনার অগ্রগণ্য মর্যাদা সম্পর্কে আপনি নিজেই জানেন। এরপর আপনি শাসক হয়েছেন এবং ন্যায়বিচার করেছেন। অবশেষে আপনি শাহাদাত লাভ করছেন।'

উমর (রা.) বললেন, 'আমি কামনা করি, এই সমস্ত মর্যাদা যেন আমার ভুলত্রুটির সমান হয়ে যায় যাতে আমার না কোনো লাভ থাকে, না কোনো ক্ষতি।'

যুবকটি যখন ফিরে যাচ্ছিল, তখন দেখা গেল তার কাপড় মাটিতে লেগে যাচ্ছে। উমর (রা:) বললেন, 'যুবকটিকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনো।'

যখন তাকে ফিরিয়ে আনা হলো, উমর (রা.) বললেন, 'হে আমার ভাতিজা! তোমার কাপড় উঁচু করে পরো। এতে তোমার কাপড় পরিষ্কার থাকবে এবং তোমার রবের কাছে এটি অধিক তাকওয়ার পরিচায়ক হবে।' [ সুবহানাল্লাহ! প্রিয় পাঠক, খেয়াল করুন টাখনুর উপর কাপড় রাখা কতটা ইম্পর্টেন্ট যে উমর (রা:) মত্যুর মুহুর্তেও একজনকে টাখনুর উপর কাপড় রাখার নসিহত করেছেন। সাহাবীরা রাখতেন, একজন টাখনুর নিচে কাপড় পড়েছে দেখে তাকে নসিহত করেছেন। পুরুষদের টাখনুর উপর কাপড় খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়]

এরপর উমর (রা.) বললেন, 'হে আবদুল্লাহ ইবনু উমর! দেখো, আমার ওপর মানুষের কত ঋণ রয়েছে।'

তারা হিসাব করে দেখলেন, তার ঋণ প্রায় ছিয়াশি হাজার দিরহাম। উমর (রা.) বললেন, 'উমরের পরিবারের সম্পদ দিয়ে যদি এই ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয়, তাহলে তাদের সম্পদ থেকেই তা পরিশোধ করো। আর যদি তা যথেষ্ট না হয়, তাহলে বনু আদী ইবনু কা‘বের কাছে সাহায্য চাও। তাদের সম্পদও যদি যথেষ্ট না হয়, তাহলে কুরাইশের কাছে সাহায্য চাও। তাদের ছাড়া অন্য কারও কাছে চেয়ো না। আর আমার পক্ষ থেকে এই ঋণ পরিশোধ করে দাও।'

এরপর তিনি আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা:)-কে বললেন, 'উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.)-এর কাছে যাও এবং বলো যে উমর ইবনুল খাত্তাব আপনাকে সালাম জানিয়েছেন।’ তবে ‘আমীরুল মুমিনীন’ বলবে না; কারণ আজ আমি আর মুমিনদের আমীর নই। আর বলবে- উমর ইবনুল খাত্তাব তার দুই সঙ্গীর সঙ্গে—অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা:) ও আবু বকর (রা.)-এর পাশে দাফন হওয়ার অনুমতি চাইছেন।’

*

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) আয়িশা (রা.)-এর কাছে গিয়ে সালাম দিলেন এবং প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। ভিতরে গিয়ে ফেখলেন আয়িশা (রা:) বসে কাঁদছেন।

তিনি বললেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং তার দুই সঙ্গীর পাশে দাফন হওয়ার অনুমতি চেয়েছেন।'

আয়িশা (রা.) বললেন, 'আমি এই স্থানটি নিজের জন্য রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমি উমরকে নিজের ওপর প্রাধান্য দিচ্ছি।' [আল্লাহর ইচ্ছায় উমর ইবনুল খাত্তাবের কবর নবীজি এবং আবু বকর (রা:) এর পাশে ঠিক হলো। এটা ছিল আল্লাহর এক বিশেষ পরিকল্পনা।] 

*

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.)-কে ফিরে আসতে দেখে উমর (রা.) বললেন, 'আমাকে উঠিয়ে বসাও।'

এক ব্যক্তি তাকে নিজের শরীরের ওপর ভর দিয়ে বসালেন।

উমর (রা.) বললেন, 'কী সংবাদ?'

আবদুল্লাহ বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি যা চেয়েছেন, তা-ই হয়েছে। তিনি অনুমতি দিয়েছেন।'

উমর (রা:) বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ! এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো বিষয় আমার কাছে ছিল না।'

এরপর বললেন, 'আমি যখন মৃত্যুবরণ করব, তখন আমাকে নিয়ে যাবে। তারপর আয়িশাকে আবার সালাম দিয়ে বলবে-উমর ইবনুল খাত্তাব অনুমতি চাইছেন।

তিনি যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমাকে সেখানে দাফন করবে। আর যদি তিনি প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে আমাকে মুসলিমদের কবরস্থানে নিয়ে যাবে।'

*

এরপর উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা.) অন্যান্য নারীদের সঙ্গে সেখানে এলেন। তাদেরকে দেখে পুরুষ সাহাবীরা সরে গেল। তিনি উমর (রা.)-এর কাছে প্রবেশ করে কিছুক্ষণ কাঁদলেন।

এরপর পুরুষেরা প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি অন্য স্থানে চলে গেলেন। এবং ভেতর থেকে তার কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।

*

লোকেরা বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার পরবর্তী খলিফা নিযুক্ত করে যান।'

উমর (রা.) বললেন, 'আমি এই দায়িত্বের জন্য এমন কয়েকজনকে ছাড়া আর কাউকে অধিক যোগ্য মনে করি না, যাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা:) মৃত্যুর পূর্বে সন্তুষ্ট ছিলেন।

এরপর তিনি আলী (রা.), উসমান (রা.), যুবাইর (রা.), তালহা (রা.), সা‘দ (রা.) এবং আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রা.)-এর নাম উল্লেখ করলেন।

এরপর উমর (রা.) বললেন, 'আমার পর যে খলিফা হবে, আমি তাকে প্রথম যুগের মুহাজিরদের ব্যাপারে ওসিয়ত করছি—সে যেন তাদের অধিকার সম্পর্কে অবগত থাকে এবং তাদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করে।

আমি তাকে আনসারদের ব্যাপারে ভালো আচরণের ওসিয়ত করছি। তারা এমন লোক, যারা মুহাজিরদের আগেই মদীনায় বসতি স্থাপন করেছিল এবং তাদের আগেই ঈমান গ্রহণ করেছিল। সে যেন তাদের সৎকর্মশীলদের ভালো কাজ গ্রহণ করে এবং তাদের অপরাধীদের ক্ষমা করে দেয়।

আমি তাকে বিভিন্ন শহরের অধিবাসীদের ব্যাপারেও ভালো আচরণের ওসিয়ত করছি। কারণ তারা ইসলামের সাহায্যকারী, সম্পদ সংগ্রহকারী এবং শত্রুদের জন্য আতঙ্কস্বরূপ। তাদের সন্তুষ্টি ছাড়া তাদের অতিরিক্ত সম্পদ ছাড়া আর কিছু যেন নেওয়া না হয়।

আমি তাকে বেদুঈন আরবদের ব্যাপারেও ভালো আচরণের ওসিয়ত করছি। কারণ তারা আরবদের মূল এবং ইসলামের শক্তির উৎস। তাদের সম্পদের অতিরিক্ত অংশ থেকে গ্রহণ করে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে তা ফিরিয়ে দিতে হবে।

আর আমি তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা:) -এর জিম্মায় থাকা অমুসলিমদের ব্যাপারে ওসিয়ত করছি—তাদের সঙ্গে করা চুক্তি যেন পূর্ণ করা হয়, তাদের রক্ষার জন্য যুদ্ধ করা হয় এবং তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো দায়িত্ব তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়।'

*

এরপর উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ইন্তিকাল করলেন।

সাহাবীরা তার জানাজা নিয়ে বের হলেন এবং হাঁটতে লাগলেন। আলী (রা:) তখন উমর (রা:) জন্য দোয়া করলেন, 'আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। আপনি আপনার পেছনে এমন কাউকে রেখে যাননি, যার মতো আমল নিয়ে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা আমার কাছে আপনার চেয়ে বেশি প্রিয়। আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই আশা করতাম/ধারণা করতাম যে, আল্লাহ আপনাকে আপনার দুই সঙ্গীর সঙ্গে একত্রিত করবেন।'

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) আয়িশা (রা.)-কে সালাম দিয়ে বললেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব প্রবেশের অনুমতি চাইছেন।'

আয়িশা (রা.) বললেন, 'তাকে প্রবেশ করাও।'

তাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো এবং তার দুই সঙ্গী (নবী সল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবু বকর) এর পাশে দাফন করা হলো।" ( সহী বুখারী)

*

যখন দাফন সম্পূর্ণ হয়ে গেল। আল্লাহর রাসুলের পাশে আবু বকর (রা:) এর কবর। তার পাশে উমর উবনুল খাত্তাব এর কবর। 

তিনজনের কবর একসাথে দেখে আলী (রা:) স্মরণ করেন নবী (সাঃ) এর একটি কথা। যখন নবীজি বলেছিলেন, 'আমি, আবু বকর ও উমর—এসেছি; আমি, আবু বকর ও উমর—প্রবেশ করেছি; আমি, আবু বকর ও উমর—বের হয়েছি।' ( বুখারী, মুসলিম)

০ মন্তব্য · ৩৯ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!