প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসস্বর্ণমুদ্রা

গল্প ও উপন্যাস

স্বর্ণমুদ্রা

স্বর্ণমুদ্রা

এক যুগে অত্যন্ত এক ধনী ব্যবসায়ী ছিল। তার ধন-সম্পদ ও ব্যবসার পরিধি এতই বিশাল ছিল যে, সে নিজেই তার সম্পদের সঠিক হিসাব জানত না।


বিজ্ঞাপন

কিন্তু লোকটি ছিল প্রচণ্ড কৃপণ। সে তার পরিবার, গরিব-দুঃখী বা নিজের আরামের জন্যও কখনো একটি পয়সা খরচ করতে চাইত না। তার একমাত্র নেশা ছিল স্বর্ণ জমানো।


নিজের সম্পদের নিরাপত্তার জন্য সে তার প্রাসাদের মাটির নিচে এক গোপন কুঠুরি নির্মাণ করেছিল। সেই কুঠুরির দরজা ছিল ভারী লোহার তৈরি, যা খুলতে একটি বিশেষ চাবি লাগত। কেউ জানত না এই কুঠুরির কথা।


প্রতিদিন গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ত, তখন ব্যবসায়ী চুপিচুপি সেই কুঠুরিতে যেত। সেখানে রাখা পাহাড়সমান স্বর্ণমুদ্রা ও হীরা-জহরত নেড়েচেড়ে দেখত আর এক অদ্ভুত আনন্দে তার বুক ভরে যেত।


একদিন সে একইভাবে তার গোপন কুঠুরিতে ঢুকে স্বর্ণমুদ্রা গুনতে বসল। চাবিটি সে দরজার বাইরেই ভুল করে রেখে এসেছিল। হঠাৎ অসাবধানতাবশত ভারী লোহার দরজাটি বন্ধ হয়ে গেল!


ব্যবসায়ী চমকে উঠে দরজার কাছে ছুটে গেল। সে প্রাণপণে ধাক্কা দিতে লাগল, কিন্তু ভারী দরজা একটুও নড়ল না। বাইরে থেকে চাবি না দিলে ভেতর থেকে এই দরজা খোলার কোনো উপায় ছিল না।


সে পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগল, "বাঁচাও! কেউ দরজা খোলো!" কিন্তু কুঠুরিটি মাটির এত গভীরে ছিল যে, তার সেই আর্তনাদ বাইরের কারও কানেই পৌঁছাল না।


তার পরিবার ভাবল, সে হয়তো ব্যবসার কাজে দূরবর্তী কোনো শহরে গেছে, যা সে প্রায়ই করত।

দিনের পর দিন পার হতে লাগল। ব্যবসায়ীটি সেই অন্ধকার ঘরে আটকা পড়ে রইল।


তার চারদিকে থরে থরে সাজানো রাশি রাশি স্বর্ণমুদ্রা, ঝলমলে হীরা আর মণি-মুক্তা। কিন্তু তার পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় তার গলা ফেটে রক্ত বের হওয়ার উপক্রম। 


সে ক্ষুধার জ্বালায় কয়েকটা স্বর্ণমুদ্রা চিবানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তাতে তার দাঁত ভেঙে মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে গেল।


সে বুঝতে পারল, তার সারাজীবনের জমানো এই বিশাল সম্পদ তাকে এক ফোঁটা পানি বা এক টুকরো রুটিও কিনে দিতে পারছে না!


কয়েকদিন পর, যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এল, তখন সে চরম অনুশোচনায় নিজের আঙুল কেটে বের হওয়া রক্ত দিয়ে কুঠুরির দেয়ালে জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য কথাটি লিখে রেখে গেল:


"আজ আমার কাছে পৃথিবীর সব ধন-সম্পদ আছে। কিন্তু কেউ যদি আজ আমাকে মাত্র এক গ্লাস পানি আর এক টুকরো শুকনো রুটি দেয়, তবে আমি হাসিমুখে আমার এই পুরো সম্পদের পাহাড় তাকে দিয়ে দেব!"


কয়েক মাস পর তার পরিবার যখন সেই কুঠুরির সন্ধান পেয়ে দরজা ভাঙল, তখন তারা দেখল,


স্বর্ণমুদ্রার পাহাড়ের ওপর লোকটির শুকনো কঙ্কাল পড়ে আছে, আর দেয়ালে লেখা আছে রক্তে ভেজা সেই করুণ সত্যটি।


আমরা সারাজীবন পাগলের মতো শুধু টাকা আর সম্পদের পেছনে ছুটি। 


কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে, টাকা বা সম্পদ নিজে থেকে আমাদের কোনো সুখ বা শান্তি দিতে পারে না। এর আসল মূল্য হলো এটিকে সঠিক জায়গায় ব্যবহার করায়।


এক বুযুর্গ বলেন, 


যে সম্পদ দিয়ে আপনি নিজের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারলেন না...

যে সম্পদ দিয়ে কোনো গরিবের ক্ষুধা মেটাতে পারলেন না...

যে সম্পদ দিয়ে পরকালের জন্য কোনো নেক আমল জমা করতে পারলেন না...


সেই জমানো সম্পদের কোনোই দাম নেই! 


কখনোই টাকার 'দাস' হয়ে নিজের জীবন ও আখেরাতকে ধ্বংস করবেন না।


০ মন্তব্য · ৩৭ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!