প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসআদালতের কাঠগড়ায় ‘বল্টু মিঞা’

গল্প ও উপন্যাস

আদালতের কাঠগড়ায় ‘বল্টু মিঞা’

আদালতের কাঠগড়ায় ‘বল্টু মিঞা’

ঢাকার এক জজ কোর্টের এজলাসে তখন পিনপতন নীরবতা। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে এলাকার কুখ্যাত চোর বল্টু। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ—সে গভীর রাতে এক ধনকুবেরের বাড়িতে ঢুকে আলমারি ভেঙে নগদ পাঁচ লাখ টাকা ও গহনা চুরি করেছে।


বিজ্ঞাপন

মামলার বিচারক ছিলেন অত্যন্ত গম্ভীর ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি। তিনি চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বল্টুর দিকে তাকালেন।


বিচারক গম্ভীর গলায় বললেন, "উঁহু! বল্টু মিঞা, তোমার বিরুদ্ধে তো অকাট্য সব প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে তুমি আলমারি ভাঙছ। এখন সত্যি করে বলো, চুরি করা টাকা আর গহনাগুলো কোথায় লুকিয়ে রেখেছ?


"বল্টু বুক ফুলিয়ে বলল, "হুজুর, আমি তো চুরিই করিনি! ওটা সিসিটিভির ক্যামেরার ভুল।"বিচারক রেগে গিয়ে টেবিল চাপড়ে বললেন, "মিথ্যা কথা বলবে না! ঘরের ভেতর রাখা সিসিটিভি ক্যামেরায় স্পষ্ট তোমার মুখ দেখা গেছে। এটা কীভাবে ভুল হতে পারে?


"বল্টু মাথা চুলকে বলল, "হুজুর, আইন তো সবার জন্য সমান, তাই না? তাহলে একটু ভেবে দেখুন। যে বাড়ির মালিক গভীর রাতে চোর ধরার জন্য ঘরের ভেতর সিসিটিভি ক্যামেরা অন করে রাখতে পারেন, সেই মালিক কেন ঘুমানোর আগে আলমারির দরজাটা লক করতে ভুলে গেলেন? এটা তো চোরদের ফাঁদে ফেলার একটা চক্রান্ত, হুজুর! আমি তো শুধু আলমারিটা খোলা দেখে ভেতরে হাওয়া বাতাস ঠিকমতো খেলছে কি না, তা পরীক্ষা করতে গিয়েছিলাম!


"বল্টুর এমন অদ্ভুত যুক্তি শুনে পুরো আদালতের আইনজীবী আর দর্শকরা হোহো করে হেসে উঠলেন। বিচারক সাহেব নিজের হাসি কোনোমতে চেপে রেখে হাতুড়ি পেটালেন—"অর্ডার! অর্ডার!"এরপর সরকারি আইনজীবী (পিপি) দাঁড়িয়ে বললেন, "হুজুর, আসামির কথা সম্পূর্ণ বানোয়াট। সে শুধু চুরিই করেনি, চুরির টাকা দিয়ে পরের দিনই একটা দামী মোটরবাইক কিনেছে। তার পকেট থেকে বাইকের রসিদও পাওয়া গেছে!


"বিচারক এবার বল্টুর দিকে তাকিয়ে বললেন, "কী বল্টু মিঞা? এবার কী বলবে? টাকা যদি চুরিই না করো, তবে মোটরবাইক কেনার এত টাকা কোথায় পেলে?"বল্টু এবার দুই হাত জোড় করে বলল, "হুজুর, খোদার কসম! আমি বাইকটা টাকা দিয়ে কিনিনি। ওটা আমি কুড়িয়ে পেয়েছি!


"বিচারক চোখ বড় বড় করে বললেন, "কুড়িয়ে পেয়েছ মানে? রাস্তার মোড়ে কি আজকাল মোটরবাইক কুড়িয়ে পাওয়া যায়?


"বল্টু বিনীতভাবে বলল, "আরে না হুজুর, ঘটনাটা শুনুন। কাল দুপুরে আমি যখন রাস্তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম এক ভদ্রলোক তার বাইকটা স্টার্ট করা অবস্থায় রেখে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছেন।


আমি বাইকটার দিকে তাকাতেই ভদ্রলোক ফোনে কাউকে বলছিলেন—'আরে ভাই, আমি তো এখন পুরো ফ্রি! কোনো কাজ নেই, যেখানে খুশি চলে যেতে পারি!' হুজুর, আমি ভাবলাম উনি যখন যেখানে খুশি চলে যেতে পারেন, তাহলে বাইকটা নিশ্চয়ই ওনার আর কোনো কাজে লাগবে না। তাই আমি ভাবলাম, প্রকৃতির এই উপহারটা রাস্তায় ফেলে রাখা ঠিক হবে না। আমি জাস্ট বাইকের ওপর বসলাম আর চলে এলাম। এটা কি চুরি হলো হুজুর? আমি তো ওনার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়েছি!


"বল্টুর কথা শুনে এবার বিচারক সাহেব আর নিজের হাসি ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি হেসেই খুন! আদালতের সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল।


হাসি থামিয়ে বিচারক রায় দিলেন, "বল্টু মিঞা, তোমার যুক্তি সত্যিই অসাধারণ! তবে আইন অনুযায়ী অপরের ইচ্ছার ভুল ব্যাখ্যা করার অপরাধে এবং আলমারির 'হাওয়া বাতাস' পরীক্ষা করার জন্য তোমাকে আগামী ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হলো। আশা করি জেলের ভেতর হাওয়া বাতাস কেমন খেলে, তা তুমি ভালোভাবেই পরীক্ষা করতে পারবে!"বল্টু তখন কান চুলকাতে চুলকাতে বলল, "ঠিক আছে হুজুর, সরকারের ঘরে যখন ফ্রিতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে, তখন আর আপত্তি কী!"

০ মন্তব্য · ৪০ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!