প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসসময় পরিব্রাজক

গল্প ও উপন্যাস

সময় পরিব্রাজক

সময় পরিব্রাজক

২০৫২ সাল। ঢাকার একটি গোপন ভূগর্ভস্থ ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানী আরিয়ান তার জীবনের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দীর্ঘ বারো বছরের গবেষণার পর তিনি তৈরি করেছেন ‘ক্রোনোস-১’—পৃথিবীর প্রথম সফল টাইম মেশিন


বিজ্ঞাপন

আরিয়ানের লক্ষ্য কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা দেখা ছিল না। তার উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত। আজ থেকে ঠিক পনেরো বছর আগে, এক রোদঝলা দুপুরে তার দশ বছরের একমাত্র মেয়ে দিয়া এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। সেই থেকে আরিয়ানের জীবনের সব আলো নিভে গিয়েছিল। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বিজ্ঞানের নিয়ম ভেঙে হলেও তিনি নিজের অতীতকে বদলে দেবেন, মেয়েকে ফিরিয়ে আনবেন।


মেশিনটি চালু করতেই ল্যাবরেটরি জুড়ে নীল আলোর তীব্র এক ঝলক দেখা গেল। আরিয়ান ক্রোনোস-১ এর ভেতরে বসে সময় সেট করলেন—১১ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ সাল, দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিট। ঠিক যে সময়ে দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল।


এক তীব্র ঝাঁকুনি আর আলোর গতি পার করে আরিয়ান নিজেকে আবিষ্কার করলেন পনেরো বছর আগের সেই পরিচিত রাস্তার মোড়ে। চারপাশটা ঠিক আগের মতোই আছে। একটু দূরেই তিনি দেখতে পেলেন তার ছোট্ট মেয়ে দিয়া আইসক্রিম হাতে নিয়ে হাসিমুখে রাস্তা পার হতে যাচ্ছে। আর ঠিক একই সময়ে একটা দ্রুতগামী কালো গাড়ি তীব্র গতিতে সেই মোড়ের দিকে এগিয়ে আসছে।


আরিয়ানের বুক ধড়ফড় করে উঠল। তিনি আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে চিৎকার করে দিয়ার দিকে ছুটে গেলেন, "দিয়া! দাঁড়াও! রাস্তা পার হয়ো না!"


দিয়া তার বাবার চেনা গলা শুনে চমকে দাঁড়িয়ে গেল এবং পিছিয়ে এল। ঠিক সেই মুহূর্তেই কালো গাড়িটি তীব্র গতিতে দিয়ার ঠিক সামনে দিয়ে চলে গেল। দিয়া বেঁচে গেল! আরিয়ান মেয়েকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তার চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রু ঝরছিল। তিনি ইতিহাস বদলে দিয়েছেন। মেয়েকে বাঁচিয়েছেন,কিন্তু ঠিক তখনই চারপাশের বাতাস কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল।

আরিয়ানের হাতের টাইম-ট্র্যাকার ডিভাইসটি লাল আলোয় সতর্কবার্তা দেখাতে লাগল: ‘টাইমপ্যারাডক্স ডিটেক্টেড’


আরিয়ান খেয়াল করলেন, রাস্তা পার হতে না পেরে দিয়া যে পিছিয়ে এসেছিল, তার কারণে রাস্তার অপর পাশে থাকা একটি স্কুলবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের একটি দেয়ালে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খেল। চারপাশ মানুষের চিৎকারে ভারী হয়ে উঠল। আরিয়ান বুঝতে পারলেন, প্রকৃতির নিয়মকে ফাঁকি দেওয়া যায় না। একজনের ভাগ্য পরিবর্তন করতে গিয়ে তিনি আরও বহু মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলেছেন।


টাইম ট্রাভেলের মূল নিয়ম এটাই—অতীতের একটি ছোট পরিবর্তন ভবিষ্যতের এক বিশাল বিপর্যয় ডেকে আনে।


অত্যন্ত ভারী মন নিয়ে আরিয়ান বুঝতে পারলেন, নিজের স্বার্থের জন্য তিনি এতগুলো মানুষের ক্ষতি করতে পারেন না। তিনি কাঁদলেন, মেয়ের কপালে শেষবারের মতো একটা চুমু খেলেন এবং দিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে নিরাপদ ফুটপাতে রেখে দ্রুত নিজের টাইম মেশিনে ফিরে এলেন।

ল্যাবরেটরিতে ফিরে এসে আরিয়ান যখন ক্রোনোস-১ থেকে বের হলেন, তার চারপাশ আবার আগের মতোই নিঃঝুম। দিয়া আর নেই। কিন্তু আরিয়ানের মনে এখন আর কোনো আফসোস নেই। তিনি বুঝতে পেরেছেন, অতীতকে আঁকড়ে ধরে রাখার নাম জীবন নয়, বরং যা হারিয়ে গেছে তাকে মেনে নিয়ে বর্তমানকে সুন্দর করে তোলাই জীবনের আসল অর্থ। তিনি ল্যাপটপটি খুলে টাইম মেশিনের সমস্ত ফর্মুলা চিরতরে মুছে দিলেন।

০ মন্তব্য · ২২ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!