ডাক্তার বলেছেন এটার নাম স্লিপ প্যারালাইসিস। গ্রামে বলে বোবায় ধরা। নামে কিছু যায় আসে না।
শুধু প্রতি রাতে টের পাই, জেগে আছি, অথচ নড়তে পারি না। চারপাশে কী হচ্ছে সব বুঝি। চোখদুটো একটু ফাঁক হয়ে থাকে, বন্ধ করতেও পারি না। শুকিয়ে ওঠে, জ্বালা করে, কিন্তু জল গড়ায় না।
ঘড়ির শব্দ ছাড়া তখন আর কিচ্ছু শোনা যায় না। নিজের নিশ্বাসের শব্দটুকুও না।
আর ঘরের কোণে 'সেটা' দাঁড়িয়ে থাকে।
নেশাগ্রস্তের মতো মেপে রেখেছি। মেঝেতে মোজাইকের চৌখুপ্পি কাটা। প্রথম রাতে ছিল দেয়াল ঘেঁষে। এগারো নম্বর চৌকোয়।
দ্বিতীয় রাতে দশ।
তৃতীয় রাতে নয়।
রোজ একটা করে এগোয়। ভুল হয় না। তাড়াহুড়ো নেই। শুধু দূরত্বটা কমে। পুরোটাই একটা হিসেবের খেলা।
সাত নম্বরের রাতে প্রথম গন্ধটা পেলাম। ভেজা মাটি আর বাসি ফুলের। শ্মশানের ধারে যে গন্ধটা মাটির সঙ্গে লেগে থাকে।
চার নম্বরের রাতে জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছিল সোজা ওর গায়ে। মেঝেতে ছায়া পড়েনি।
দু ' নম্বর রাতে খেয়াল করলাম, আমি যতক্ষণ তাকিয়ে থাকি ততক্ষণ ওটা নড়ে না। চোখের পাতা একবার কেঁপে গেলেই এক ইঞ্চি এগিয়ে আসে। কাজেই বোবায় ধরার মধ্যেও আমি সজাগ ছিলাম। বিন্দুমাত্র যেন চোখে পাতা না নড়ে সেটা খেয়াল রেখেছি।
গতকাল রাতে সে ছিল এক নম্বরে। খাটের পায়ার একদম গায়ে লাগানো। ওটাই শেষ চৌখুপ্পি।
আজ আমায় আবার বোবায় ধরেছে। নড়তে পারছি না। চিত হয়ে শুলে বেশিক্ষণ থাকে বলে আজ পাশ ফিরে শুয়েছিলাম। চোখ গেল ঘরের কোণায়।
কোণটা ফাঁকা।
আপ্রাণ চেষ্টা করছি চিৎকার করার। একবার গলা থেকে আওয়াজ বেরোলেই...। চোখটা টেনে নামালাম খাটের পায়ার দিকে। এদিকটাও ফাঁকা।
ঘর তখন আধো অন্ধকার। মনে হচ্ছে আমি ছাড়াও আরও অনেকে রয়েছে ঘরে। দেয়ালের কোল ঘেঁষে, আলমারির পিছনে, দরজার আড়ালে, ফলস সিলিং এর ফাঁকে। জট পাকানো অন্ধকারটা ভারী হয়ে ঝুলে আছে। শুধু আমি হঠাৎ চিৎকার করে ফেলতে পারি, এই ভেবে তারা বেরিয়ে আসতে পারছে না।
আমি তখনও পাশ ফিরে শুয়ে গোঙাচ্ছি। মুখের একপাশে লালা জমে বালিশ ভিজে যাচ্ছে, মুছতে পারছি না, ঠোঁটের কষটা থুতুর অ্যাসিডে জ্বালা করছে। আমার পায়ের পাতা থেকে বুক অবধি চাদর টানা, কিন্তু ঘাড়টা অনাবৃত।
হঠাৎ বুঝতে পারলাম, আমার পিছনের দিকে বিছানাটা একটু দেবে গেল।
তারপর আরেকটু।
ঘরের অন্ধকারগুলো এবার নড়ল। দেয়ালের কোল ছেড়ে, আলমারির পিছন ছেড়ে। তারা আর অপেক্ষা করছে না।
ঘড়িটা হঠাৎ থেমে গেল।
এখন শুধু ঘাড়ে নিশ্বাসটা পড়া বাকি।
আমি হয়তো আর বোবায় ধরা থেকে বেরোতে পারব না। কিন্তু ঘরের কোণে যেটা দাঁড়িয়ে ছিল, সেটার কথা এখন আপনিও জানেন। যেটা ও চায় না। ও এখন জানে আপনি কোথায় বসে পড়ছেন।
আজ রাতে পাশ ফিরে শোওয়ার সময় একটু…
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!