শহরের নামকরা স্থপতি অর্ক। দশ বছর পর সে আজ নিজের গ্রামে ফিরছে। এসি গাড়ির কাচ ভেদ করে বাইরে তাকাতেই অর্কর চোখ আটকে গেল। পিচঢালা রাস্তার দুপাশে এখন বড় বড় দালান। তার চেনা সেই কাঁচা রাস্তা, মাটির ঘর আর দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। মনের ভেতর একটা অচেনা শূন্যতা মোচড় দিয়ে উঠল।
গাড়ি এসে থামল গ্রামের শেষ প্রান্তে, যেখানে এখনো আধুনিকতার ছোঁয়া পুরোপুরি লাগেনি। গাড়ি থেকে নামতেই অর্কর নাকে এল মাটির সোঁদা গন্ধ। সামনেই তার নানাবাড়ির সেই পুরোনো মাটির ঘরটি। বারান্দায় বসে আছেন দাদু। বয়সের ভারে পিঠটা নুয়ে পড়েছে, কিন্তু অর্ককে দেখেই ওনার ফোকলা মুখের হাসিটা চওড়া হয়ে গেল।
"এসেছিস দাদুভাই? কত বছর দেখিনি তোকে!" বৃদ্ধের গলার কাঁপা কাঁপা আওয়াজে যেন এক অদ্ভুত শান্তি ছিল।
পরদিন সকালে অর্কর ঘুম ভাঙল পাখির কিচিরমিচিরে, যা শহরে কাল্পনিক। সে বাইরে এসে দাঁড়াল। কুয়াশা মোড়ানো ভোরের আলোয় দেখল, পাশের বাড়ির রহমত চাচা লাঙল কাঁধে মাঠে যাচ্ছেন। অর্ক আলপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে নদীর ঘাটে গেল।
সেখানে এখনো একটি ছোট খেয়া নৌকা বাঁধা। নদীর শান্ত জল আর বাঁশের সাঁকোটি দেখে অর্কর মনে পড়ে গেল ছোটবেলার কথা—যখন সে বন্ধুদের সাথে এই নদীতে ঝাঁপ দিত, আর বিকেলে বটতলার ধুলোবালি মেখে খেলত।
বিকালে অর্ক গ্রামের একমাত্র টিকে থাকা শিউলি গাছটার নিচে গিয়ে বসল। সেখানে তার শৈশবের খেলার সাথি, গ্রামেরই এক সাধারণ মেয়ে মায়াবতীর সাথে দেখা। মায়াবতী এখন গ্রামের বাচ্চাদের পড়ায়।
মায়াবতী মুচকি হেসে বলল, "শহরের বড় বড় দালান বানাতে বানাতে আমাদের এই মাটির ঘরগুলোর কথা ভুলে গেলে অর্ক?"
অর্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ভুলিনি মায়া। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আমাদের গ্রামটাও তো বদলে যাচ্ছে। মাটির ঘরগুলো ভেঙে ইটের দেয়াল উঠছে। কাঁচা রাস্তাগুলো পাকা হচ্ছে।"
মায়া শান্ত গলায় উত্তর দিল, "উন্নতি তো দরকার অর্ক। কিন্তু আমরা যেন আমাদের শেকড় আর ভেতরের সহজ-সরল মানুষটাকে হারিয়ে না ফেলি। এই গ্রামের আসল সৌন্দর্য তো এর ইট-পাথরে নয়, মানুষের খাঁটি আবেগে।"
মায়ার কথাগুলো অর্কর মনে গভীরভাবে দাগ কাটল। সে বুঝতে পারল, সে জৌলুস খুঁজতেই শহরে গিয়েছিল, কিন্তু মনের আসল শান্তি রয়ে গেছে এই গ্রামের মাটিতেই।
শহরে ফিরে যাওয়ার আগে অর্ক দাদু আর মায়াকে ডেকে বলল, "আমি শহরে ফিরে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু এবার চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার জন্য নয়। আমি এই গ্রামের ঐতিহ্য ধরে রেখে একটি আধুনিক অথচ পরিবেশবান্ধব স্কুল বানিয়ে দেব। যেখানে আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির ছোঁয়া থাকবে।"
অর্ক গাড়িতে ওঠার সময় একমুঠো গ্রামের মাটি পকেটে নিয়ে নিল। সে জেনে গেছে, পৃথিবীর যেখানেই সে যাক না কেন, তার ভেতরের আসল মানুষটা চিরকাল এই মৌত্রী বড়হর গ্রামের শিউলি তলাতেই রয়ে যাবে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!