নদীর তীরে ছোট্ট একটি গ্রামে রাশিদ নামে এক যুবক বাস করত। তাদের ঘরটি ছিল মাটির তৈরি, ছাদে খড়, উঠানে একটি পুরোনো আমগাছ। সংসারে ছিল শুধু রাশিদ আর তার বৃদ্ধ মা আমেনা। রাশিদের বাবা বহু বছর আগেই ইন্তেকাল করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই রাশিদ মায়ের কষ্ট দেখেছে। মা মানুষের বাড়িতে সেলাই করতেন, কখনো চাল পরিষ্কার করে দিতেন, কখনো অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজে সাহায্য করতেন। সেই সামান্য উপার্জনেই ছেলেকে বড় করেছিলেন।
রাশিদ ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রমী ছিল। পড়াশোনায়ও ভালো ছিল। গ্রামের মক্তবের শিক্ষক প্রায়ই বলতেন, “এই ছেলেটার মধ্যে সম্ভাবনা আছে। যদি শহরে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারে, একদিন বড় কিছু করতে পারবে।”
রাশিদেরও স্বপ্ন ছিল শহরে গিয়ে পড়াশোনা করবে, ভালো চাকরি করবে এবং মাকে একটি পাকা বাড়িতে রাখবে।
বয়স যখন বিশের কাছাকাছি, তখন সে শহরের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পেল। বেতন গ্রামের তুলনায় অনেক বেশি। থাকার ব্যবস্থাও ছিল। তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন যেন পূরণ হতে চলল।
এক সন্ধ্যায় সে আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরে মাকে বলল, “আম্মা, আল্লাহ আমার জন্য একটা সুযোগ দিয়েছেন। আমি শহরে কাজ করব। ভালো বেতন পাব। কিছুদিন পর আপনাকে শহরে নিয়ে যাব।”
মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
“তুমি কি সত্যিই যেতে চাও?”
রাশিদ বলল, “হ্যাঁ আম্মা। এতদিন আপনি কষ্ট করেছেন। এবার আমি আপনার কষ্ট দূর করব।”
মা কিছু বললেন না।
রাতে রাশিদ ঘুমিয়ে পড়ার পর আমেনা দীর্ঘক্ষণ জেগে রইলেন। তিনি জানতেন, তার শরীর আগের মতো শক্ত নেই। হাঁটতে গেলে লাঠির প্রয়োজন হয়। কিন্তু ছেলের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে চান না।
পরদিন সকালে তিনি বললেন, “বাবা, তুমি শহরে চলে যাও। আমার জন্য চিন্তা করো না। আমি কোনোভাবে চলতে পারব।”
রাশিদ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি পারবেন?”
“আল্লাহ আছেন।”
“কিন্তু আপনার ওষুধ?”
“কখনো না কখনো ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”
রাশিদ বুঝতে পারল, মা তাকে আটকাতে চাইছেন না। বরং নিজের কষ্ট লুকিয়ে ছেলের ভবিষ্যৎ গড়তে চাইছেন।
যাওয়ার দিন ঠিক হয়ে গেল।
কিন্তু যাওয়ার আগের রাতে হঠাৎ আমেনার প্রচণ্ড জ্বর এল। রাশিদ সারারাত মায়ের মাথায় পানি দিল। ভোরের দিকে জ্বর কিছুটা কমল।
সকালে গ্রামের চিকিৎসক এসে বললেন, “কিছুদিন নিয়মিত ওষুধ খাওয়াতে হবে। একা রাখা ঠিক হবে না।”
রাশিদের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
শহরের চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় একেবারে সামনে। যদি সে না যায়, চাকরিটি অন্য কাউকে দেওয়া হবে।
তার সামনে যেন দুটি পথ দাঁড়িয়ে গেল—একদিকে তার বহু বছরের স্বপ্ন, অন্যদিকে অসুস্থ মা।
সে সেদিন অনেকক্ষণ নদীর ধারে বসে ছিল।
বন্ধু সাইফ এসে বলল, “তুই এত চিন্তা করছিস কেন?”
রাশিদ সব খুলে বলল।
সাইফ বলল, “তুই তো মাকে টাকা পাঠাতে পারবি। শহরে গিয়ে চাকরি কর। এখনকার যুগে সবাই এভাবেই করে।”
রাশিদ বলল, “কিন্তু ডাক্তার বলেছেন, তাকে একা রাখা ঠিক হবে না।”
সাইফ বলল, “তাহলে কোনো আত্মীয়কে রেখে যা।”
রাশিদ জানত, গ্রামের আত্মীয়দের সবারই নিজেদের সংসার আছে। কেউ দীর্ঘদিন মায়ের দেখাশোনা করতে পারবে না।
সেদিন রাতে সে মায়ের পাশে বসে বলল, “আম্মা, আমি শহরে যাচ্ছি না।”
মা অবাক হয়ে বললেন, “কেন?”
“আপনার এই অবস্থায় আপনাকে রেখে আমি যেতে পারব না।”
মা বললেন, “না বাবা! আমার জন্য নিজের জীবন নষ্ট করো না।”
রাশিদ মায়ের হাত ধরে বলল, “আপনি আমার জন্য কত রাত না খেয়ে কাটিয়েছেন, কত কষ্ট করেছেন, কত স্বপ্ন ত্যাগ করেছেন। আজ আপনার প্রয়োজনের সময় আমি যদি আপনাকে একা রেখে চলে যাই, তাহলে আমার উপার্জন দিয়ে কী হবে?”
মায়ের চোখ ভিজে গেল।
তিনি বললেন, “বাবা, আমি তো চাই তুমি সফল হও।”
রাশিদ বলল, “আম্মা, আমি জানি। কিন্তু আমার বিশ্বাস, মায়ের সেবা করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার মধ্যে এমন সফলতা আছে, যা কোনো চাকরির বেতন দিয়ে কেনা যায় না।”
চাকরির সুযোগটি শেষ হয়ে গেল।
কয়েকজন গ্রামের মানুষ রাশিদকে নিয়ে কথা বলতে লাগল।
“ছেলেটা বোকা। এমন চাকরি কেউ ছাড়ে?”
কেউ বলল, “মায়ের সেবা করতে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে।”
রাশিদ এসব শুনে চুপ থাকত।
সে মায়ের জন্য ওষুধ আনত, রান্না করত, ঘর পরিষ্কার করত। পাশাপাশি নিজের পুরোনো মাটির কাজ আবার শুরু করল। বাজারে মাটির কলস ও হাঁড়ি বিক্রি করত। আয় কম ছিল, কিন্তু সে হাল ছাড়েনি।
একদিন বাজারে তার দেখা হলো শহরের সেই প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে, যেখানে সে চাকরি পাওয়ার কথা ছিল।
লোকটি বললেন, “তুমি কেন কাজে যোগ দিলে না?”
রাশিদ বলল, “আমার মা অসুস্থ ছিলেন। তাকে একা রেখে যেতে পারিনি।”
লোকটি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন, “তোমার মতো মানুষের সংখ্যা কমে গেছে।”
রাশিদ বলল, “আমি তো শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করেছি।”
কয়েক মাস কেটে গেল।
একদিন গ্রামের পাশের নদীতে প্রচণ্ড বন্যা হলো। অনেক ঘর পানিতে ডুবে গেল। গ্রামের মানুষ আশ্রয়ের জন্য উঁচু জায়গায় যেতে শুরু করল। রাশিদ নিজের মাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার পর অন্যদের সাহায্য করতে বেরিয়ে পড়ল।
সে এক বৃদ্ধ দম্পতিকে নৌকায় তুলে দিল। তারপর এক গর্ভবতী নারীকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিল। এরপর সে নিজের ঘরে ফিরে দেখল, তাদের সামান্য খাবারও শেষ হয়ে গেছে।
মা বললেন, “বাবা, তুমি তো সারাদিন মানুষের জন্য ছুটেছ। এখন আমাদের খাবার কী হবে?”
রাশিদ হাসল।
“আল্লাহ ব্যবস্থা করবেন।”
পরদিন সকালে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল।
শহর থেকে কয়েকজন লোক গ্রামে এল। তাদের সঙ্গে ছিল খাবার, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
তাদের নেতৃত্বে ছিলেন সেই কর্মকর্তা, যিনি একদিন রাশিদের চাকরির বিষয়ে কথা বলেছিলেন।
তিনি রাশিদকে বললেন, “আমরা তোমার কথা শুনেছিলাম। তুমি নিজের চাকরি ছেড়ে মায়ের পাশে থেকেছ। তারপর বন্যার সময় তুমি নিজের কথা না ভেবে গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছ। আমাদের প্রতিষ্ঠানে তোমার মতো বিশ্বস্ত মানুষ দরকার।”
রাশিদ অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু আমি তো আপনার প্রতিষ্ঠানে কাজ করিনি।”
লোকটি বললেন, “তাই তো তোমাকে আমরা আরও বেশি বিশ্বাস করছি।”
তিনি রাশিদকে নতুন একটি চাকরির প্রস্তাব দিলেন—এবার এমন কাজ, যেখানে তাকে প্রতিদিন শহরে থাকতে হবে না। গ্রামের কাছেই একটি শাখায় কাজ করার সুযোগ থাকবে।
রাশিদের চোখে পানি চলে এল।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “হে আল্লাহ, আমি ভেবেছিলাম একটি দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। আপনি দেখিয়ে দিলেন, আপনার কাছে দরজার অভাব নেই।”
মা দূর থেকে ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
তিনি বললেন, “আমি বলেছিলাম না, আল্লাহ আছেন?”
রাশিদ মায়ের কাছে গিয়ে তাঁর হাত চুমু খেল।
“হ্যাঁ আম্মা। কিন্তু আজ আমি সেটা হৃদয় দিয়ে বুঝলাম।”
সময়ের সঙ্গে রাশিদের জীবন বদলে গেল। সে ভালো চাকরি পেল। মায়ের চিকিৎসা করাল। গ্রামের দরিদ্র শিশুদের পড়াশোনার জন্য নিজের আয়ের একটি অংশ ব্যয় করতে লাগল।
কিন্তু সে কখনো সেই পুরোনো দিনগুলো ভুলে যায়নি।
বহু বছর পর তার নিজের সন্তান হলো। একদিন ছেলে তাকে জিজ্ঞেস করল, “আব্বা, আপনি কি কখনো বড় চাকরির সুযোগ ছেড়ে দিয়েছিলেন?”
রাশিদ হাসল।
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
রাশিদ বলল, “কারণ তখন আমার সামনে দুটি দরজা ছিল। একটি দরজা আমাকে টাকা দিতে পারত, আর অন্যটি আমাকে আমার মায়ের সেবা করার সুযোগ দিচ্ছিল। আমি দ্বিতীয় দরজাটি বেছে নিয়েছিলাম।”
ছেলে বলল, “তাহলে কি প্রথম দরজাটি হারিয়ে গিয়েছিল?”
রাশিদ বলল, “হয়তো। কিন্তু আল্লাহ পরে এমন একটি দরজা খুলেছিলেন, যা আমি কল্পনাও করিনি।”
তারপর সে ছেলেকে বলল, “জীবনে সব সময় বুঝতে পারবে না কোন সুযোগ তোমার জন্য ভালো। তাই শুধু লাভ-ক্ষতির হিসাব করো না। কখনো কখনো একটি সুযোগ ছেড়ে দেওয়াও আল্লাহর কাছে বড় ইবাদতের কারণ হতে পারে।”
বৃদ্ধ বয়সে আমেনা যখন অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হলেন, রাশিদ প্রতিদিন তার পাশে বসত। এক রাতে মা ছেলের হাত ধরে বললেন, “বাবা, তোমার জন্য আমি কখনো দোয়া করা বন্ধ করিনি।”
রাশিদ বলল, “আম্মা, আপনার দোয়াই তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।”
মা মৃদু হাসলেন।
“আমি তোমাকে কিছু দিতে পারিনি।”
রাশিদ চোখের পানি মুছে বলল, “আপনি আমাকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শিক্ষা দিয়েছেন—আল্লাহর ওপর ভরসা করতে।”
কিছুদিন পর আমেনা ইন্তেকাল করলেন।
রাশিদ মায়ের জানাজার পর সেই পুরোনো আমগাছের নিচে অনেকক্ষণ বসে রইল। তার মনে পড়ছিল শৈশবের কথা—মা তাকে হাতে ধরে মক্তবে নিয়ে যাচ্ছেন, নিজের খাবার থেকে তাকে শেষ রুটিটুকু দিয়ে দিচ্ছেন, রাত জেগে তার কাপড় সেলাই করছেন।
তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সে বলল, “হে আল্লাহ, আমার মায়ের প্রতি আমার যতটুকু কর্তব্য ছিল, আমি জানি না তা ঠিকভাবে করতে পেরেছি কি না। আপনি আমার ভুলগুলো ক্ষমা করুন এবং আমার মায়ের প্রতি রহম করুন।”
তারপর সে উঠে দাঁড়াল।
জীবনে সে অনেক কিছু অর্জন করেছিল—চাকরি, সম্মান, বাড়ি, পরিবার। কিন্তু তার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল সেই দিনটি, যেদিন সে নিজের স্বার্থের সামনে মায়ের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল।
গল্পের শিক্ষণীয় বিষয়
এই গল্প আমাদের শেখায়, মা-বাবার সেবা কোনো ছোট কাজ নয়। জীবনের বড় স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে তাদের অধিকার ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক মানুষকে সব পরিস্থিতিতে নিজের জীবনের সব দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হবে। বরং শিক্ষা হলো—যখন বাবা-মা সত্যিই আপনার প্রয়োজন অনুভব করেন, তখন তাদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় শিক্ষা হলো, আল্লাহর ওপর ভরসা করা মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। রাশিদ চাকরি হারানোর পর বসে থাকেনি; সে কাজ করেছে, মায়ের সেবা করেছে এবং হালাল পথে উপার্জনের চেষ্টা করেছে।
তৃতীয় শিক্ষা হলো, একটি সুযোগ হারানো মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কখনো কখনো আমরা যে দরজাটি বন্ধ হয়ে যাওয়া বলে মনে করি, আল্লাহ তার চেয়ে উত্তম আরেকটি দরজা খুলে দিতে পারেন।
চতুর্থ শিক্ষা হলো, মানুষের কথাকে জীবনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মাপকাঠি বানানো উচিত নয়। গ্রামের মানুষ রাশিদকে বোকা বলেছিল, কিন্তু পরে তার সিদ্ধান্তের মূল্য তারাই বুঝেছিল।
আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—যে মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো ভালো কাজকে নিজের স্বার্থের ওপর অগ্রাধিকার দেয়, তার ত্যাগ কখনোই আল্লাহর অজানা থাকে না।
মানুষ হয়তো আপনার ত্যাগ দেখবে না, আপনার কষ্ট বুঝবে না, এমনকি আপনাকে ভুলও বুঝতে পারে। কিন্তু আল্লাহ আপনার নিয়ত জানেন। তাই জীবনের কঠিন সিদ্ধান্তের সময় শুধু এই প্রশ্ন করবেন না—“আমি কী পাব?” বরং এটাও ভাবুন—“এই কাজের মাধ্যমে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারব কি?”
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!