প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসকৌতূহল

গল্প ও উপন্যাস

কৌতূহল

কৌতূহল

ভদ্রমহিলা ছিলেন উত্তর ভারতের নামি তাওয়ায়েফ। ভারতের নানা প্রান্তের রাজা-নবাবদের দরবারে তাঁর যথেষ্ট নামডাক ছিল। সেই সূত্রেই ১৭৪৬ সালে নবাব আলিবর্দী খানের দুই নাতি ইকরামউদ্দৌলা ও সিরাজউদ্দৌলার বিয়েতে নওয়াজেস মুহাম্মদ খান তাঁকে এবং তাঁর দলকে নাচগানের জন্য নিয়ে এসেছিলেন মুর্শিদাবাদ শহরের মোতিঝিলে। সেই আসরেই নাকি মুন্নি বেগমের প্রতি আকৃষ্ট হন মীরজাফর আলি খান। তখনও তিনি নবাব হননি। কিন্তু মুন্নি বেগমকে তিনি আর ফিরতে দিলেন না, মুর্শিদাবাদেই রেখে নিজের হারেমে তুলে নিলেন।

ভাবতে অবাক লাগে, মুন্নি বেগম তখন এমন এক সময়ে ছিলেন, যখন ভারতের যে কোনো শাহজাদা, রাজা কিংবা নবাবকে বিয়ে করার মতো নামডাক ও পরিচিতি তাঁর ছিল। তাঁর কেরিয়ারও তখন তুঙ্গে। তা হলে কেন তিনি নিজের সেই জীবন, সেই প্রতিষ্ঠা, সেই সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ ছেড়ে মীরজাফরের সঙ্গে মুর্শিদাবাদে থেকে গেলেন? কে জানে! হয়তো মীরজাফরের রূপ, গুণ, বংশমর্যাদা কিংবা ব্যক্তিত্ব তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু মীরজাফর কেন মুন্নি বেগমের প্রেমে পড়েছিলেন, সে প্রশ্নের উত্তর জানার কৌতূহল থেকেই যায়।

বিজ্ঞাপন

সমকালীন কিছু ইংরেজের বর্ণনায় মুন্নি বেগমের রূপের বিশেষ প্রশংসা পাওয়া যায় না। এমনকি তাঁর গলাও নাকি খুব ভালো ছিল না, বরং পুরুষালি ধরনের গলা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবু মানুষকে কি শুধু রূপ আর কণ্ঠস্বর দিয়েই বিচার করা যায়? মুন্নি বেগমের মধ্যে এমন কিছু নিশ্চয়ই ছিল, যা মীরজাফরকে আকৃষ্ট করেছিল। আর সেই আকর্ষণ যে সামান্য ছিল না, পরবর্তী জীবনের ঘটনাগুলোই তার প্রমাণ।

মুন্নি বেগমের আসল রূপ প্রকাশ পায় মীরজাফর নবাব হওয়ার পর। সাধারণ বংশোদ্ভূত এক মহিলা নিজামত পরিবারের উচ্চবংশীয় বেগমদের দাপটে চুপ করে থাকবেন-এমনটা হয়নি। বরং তাঁর নিজের দাপটে হারেমের উচ্চবংশীয় বেগম সহ নিজামত পরিবারের অনেকেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। বিচক্ষণ এই মহিলা মীরজাফরের নির্বাসন জীবনের সঙ্গী হয়ে কলকাতায় গিয়েছিলেন। সেখানেও তিনি থেমে থাকেননি। নিজের দুই পুত্রের নামে মসনদের উত্তরাধিকার আদায় করেছেন, ইংরেজ অফিসারদের নিজের পক্ষে এনেছেন, আরও কত কিছু করেছেন! অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, একসময় এই অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী মহিলাই তাঁর নাবালক সন্তানদের হয়ে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে গেলেন।

মুন্নি বেগম দয়ালু ছিলেন, কিন্তু একই সঙ্গে ছিলেন প্রবল প্রতিহিংসাপরায়ণ। সমালোচনা একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললে বা তাঁর বিরোধিতা করলে তার ফল ভালো হতো না। নিজামত পরিবারের সদস্যরা তো বটেই, স্বয়ং নবাবরাও তাঁকে সমঝে চলতেন। কারও বিরুদ্ধাচরণ তিনি সহজে ভুলতেন না, কখনও প্রকাশ্যে, কখনও নীরবে, সেই বিরোধিতার মাশুল গুনতে হতো।

অথচ এত অর্থ, সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও মুন্নি বেগমের শেষ জীবনটা ছিল বড় একাকী। পঞ্চাশ বছর বয়সে স্বামীকে হারিয়েছিলেন। তারপর নাবালক দুই পুত্রের অকালমৃত্যু তাঁকে আরও নিঃস্ব করে দিয়েছিল। যে মহিলার চারপাশে একসময় এত মানুষ, এত ক্ষমতা, এত জৌলুশ ছিল, শেষ পর্যন্ত তাঁর আপন বলতে কেউই রইল না।

প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে একদিন এই দাপুটে বেগমও মৃত্যুবরণ করলেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে ১৮১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় গভর্নর-জেনারেলের নির্দেশে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের দুর্গপ্রাচীর থেকে ৯০ বার তোপ দাগা হয়েছিল। সেদিন দুর্গের পতাকাও অর্ধনমিত রাখা হয়েছিল।

কী অদ্ভুত সময়ের পরিহাস!

যে মহিলার জীবনে একসময় ক্ষমতা, ঐশ্বর্য আর প্রভাবের এত জৌলুশ ছিল, আজ তিনি মুর্শিদাবাদ শহরের জাফরাগঞ্জ সমাধিস্থলে অবহেলায় চিরনিদ্রায় শায়িত। একসময় সশস্ত্র প্রহরীঘেরা নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে, অঢেল ঐশ্বর্যের মাঝে তাঁর দিন কাটত,

আজ তাঁর সমাধিস্থলে আসা অধিকাংশ পর্যটকই জানেন না মুন্নি বেগমের কথা, জানেন না তাঁর সমাধির অবস্থান। যে মহিলার ইশারায় একসময় কত মানুষের ভাগ্য বদলে যেত, আজ তাঁর স্মৃতিটুকুও যেন বিস্মৃতির আড়ালে চাপা পড়ে আছে।

কখনও কখনও মনে হয়, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিহাস বোধহয় এটাই, ক্ষমতা মানুষকে যতটা উঁচুতে তোলে, সময় একদিন তাকে ততটাই নীরবে নামিয়ে আনে।

একদিন তাঁর প্রাসাদের নহবতখানা থেকেই সকাল-সন্ধ্যা ভেসে আসত নহবতের সুর। আর আজ সেই দাপুটে বেগমের সমাধির প্রাচীরে বসে কর্কশ কণ্ঠে কাক ডাকে। 

০ মন্তব্য · ২৬ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!