ষড়যন্ত্রের অন্ধকার থেকে রওজা মোবারকের হেফাজত: নুরুদ্দিন জঙ্গী (রহ.)-এর বিস্ময়কর কাহিনী
### ১. তাহাজ্জুদের পর সেই ভয়ংকর স্বপ্ন
৫৫৭ হিজরীর এক রাত। সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গী (রহ.) তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে বিশ্রামে ছিলেন। হঠাৎ তিনি এক বিস্ময়কর স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখতে পেলেন। তিনি দুজন নীল চোখের লোকের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “ইয়া নুরুদ্দিন! এরা আমাকে বিরক্ত করছে। এদের হাত থেকে আমাকে মুক্ত করো।”
ঘুম ভেঙে গেলে সুলতান গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়লেন। কিন্তু তিনি ভাবলেন, হয়তো এটি নিছক স্বপ্ন। কিছুক্ষণ পর আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। একই স্বপ্ন পুনরায় দেখা দিল। পরপর কয়েকবার এমন ঘটার পর তিনি আর বিষয়টিকে অবহেলা করলেন না।
সুলতান বুঝতে পারলেন, মদিনার পবিত্র নগরীতে কোনো বিপদ ঘটতে পারে। তাই তিনি দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং প্রায় ১৬ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে মদিনার উদ্দেশে রওনা হলেন।
### ২. মদিনায় পৌঁছে শুরু হলো অনুসন্ধান
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সুলতান মদিনায় পৌঁছালেন। তাঁর মনে তখন একটাই প্রশ্ন—স্বপ্নে দেখা সেই দুজন মানুষ কোথায়?
তিনি টানা দুই সপ্তাহ ধরে মদিনার বিভিন্ন স্থানে খোঁজ চালালেন। কিন্তু নীল চোখের সেই দুজনের কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। অবশেষে সুলতান একটি ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করলেন।
তিনি মদিনার সকল বাসিন্দাকে এক বিশাল ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানালেন। উদ্দেশ্য ছিল, স্বপ্নে দেখা লোক দুজনের মধ্যে কেউ সেখানে উপস্থিত আছে কি না, তা খুঁজে বের করা।
সেদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোজে অংশ নিলেন। সবাই খাবার খেলেন, কিন্তু সুলতানের কাঙ্ক্ষিত সেই দুজনকে দেখা গেল না।
তখন তিনি জানতে চাইলেন, “মদিনার আর কেউ কি এই ভোজে আসেনি?”
একজন উত্তর দিলেন, “হুজুর, দুজন মুসাফির বুজুর্গ আছেন। তাঁরা সারাদিন ইবাদত করেন এবং মানুষের সঙ্গে খুব একটা মেলামেশা করেন না।”
এই কথা শুনেই সুলতানের মনে সন্দেহ জাগল।
### ৩. মুসাফিরদের ঘরে গিয়ে চমকে উঠলেন সুলতান
সুলতান আর দেরি করলেন না। তিনি দ্রুত সেই দুই ব্যক্তির আস্তানায় পৌঁছে গেলেন।
তাদের দেখামাত্রই তিনি চমকে উঠলেন। স্বপ্নে দেখা সেই নীল চোখের দুজন মানুষ—এরাই তো!
তারা নিজেদের সাধারণ মুসাফির বলে পরিচয় দিলেও সুলতান তাদের কথায় সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি তাদের আটকে রেখে ঘরটি ভালোভাবে তল্লাশি করার নির্দেশ দিলেন।
ঘরের প্রতিটি জিনিস পরীক্ষা করা হচ্ছিল। হঠাৎ তল্লাশির সময় মেঝেতে বিছানো নামাজের চাটাইয়ের দিকে নজর পড়ল। চাটাই সরিয়ে নিচের পাথরও সরানো হলো।
আর তখনই প্রকাশ পেল এক ভয়ংকর রহস্য!
পাথরের নিচে দেখা গেল একটি গভীর সুড়ঙ্গ। কথিত আছে, সেই সুড়ঙ্গ মাটির নিচ দিয়ে সরাসরি রওজা মোবারকের দিকে এগিয়ে গেছে।
সুলতান বুঝতে পারলেন, এটি কোনো সাধারণ মুসাফিরের ঘর নয়। এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর ষড়যন্ত্র।
### ৪. তিন বছরের গোপন চক্রান্ত
সুলতানের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সেই দুই ব্যক্তি অবশেষে নিজেদের পরিচয় স্বীকার করল। বর্ণিত কাহিনী অনুযায়ী, তারা ছিল ইহুদি গুপ্তচর।
তারা জানায়, দীর্ঘ তিন বছর ধরে রাতের অন্ধকারে মাটি খুঁড়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করছিল। খনন করা মাটি চামড়ার মশকে ভরে গোপনে মদিনার বাইরে নিয়ে গিয়ে ফেলত, যাতে কেউ তাদের সন্দেহ না করে।
তাদের উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত জঘন্য—রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র দেহ মোবারক চুরি করা।
কিন্তু তারা যতবারই রওজা মোবারকের কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করত, ততবারই প্রচণ্ড ভূমিকম্প শুরু হতো। মাটি কেঁপে উঠত, চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ত। ফলে তারা আর সামনে এগোতে পারত না।
অবশেষে তাদের চক্রান্ত সুলতানের কাছে প্রকাশ হয়ে গেল।
### ৫. ষড়যন্ত্রের অবসান ও সিসার প্রাচীর
ঘটনার সত্যতা প্রকাশ পাওয়ার পর সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গী (রহ.) কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। বর্ণিত ইতিহাস অনুযায়ী, সেই দুই অপরাধীকে জনসমক্ষে শাস্তি দেওয়া হয়।
এরপর ভবিষ্যতে এমন কোনো চক্রান্ত যাতে আর সফল হতে না পারে, সে জন্য সুলতান রওজা মোবারকের চারপাশে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
কথিত আছে, বিপুল পরিমাণ সিসা গলিয়ে মাটির গভীর পর্যন্ত একটি দুর্ভেদ্য প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল—রওজা মোবারকের পবিত্র স্থানকে ভূগর্ভস্থ কোনো ষড়যন্ত্র থেকে সুরক্ষিত রাখা।
এই ঘটনার পর সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গী (রহ.)-এর নাম রওজা মোবারকের হেফাজতের ইতিহাসে এক বিশেষ স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে ওঠে।
### ৬. এই কাহিনী থেকে আমাদের শিক্ষা
এই বর্ণিত কাহিনী আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
* আল্লাহর ইচ্ছার সামনে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হতে পারে না।
* পবিত্র স্থান ও ইসলামের সম্মান রক্ষায় সতর্কতা ও দায়িত্ববোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
* সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকা একজন শাসকের মহান কর্তব্য।
* আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করাও ঈমানদারের দায়িত্ব।
নোট: এই কাহিনীটি ইসলামী ইতিহাসে প্রচলিত একটি বর্ণনা হিসেবে পরিচিত। এর বিভিন্ন সংস্করণে কিছু তথ্যের ভিন্নতা দেখা যায়। তাই এটিকে ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবে উপস্থাপন করাই উত্তম, নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে নয়।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!