প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসমনের আয়না

গল্প ও উপন্যাস

মনের আয়না

মনের আয়না

আমাদের মন একটা অদ্ভুত আয়না। সামনে তাকালে সে ভবিষ্যতের ভয় দেখায়, পিছনে তাকালে অতীতের আফসোস দেখায়। আমরা বর্তমানটাকেই হারিয়ে ফেলি।


বিজ্ঞাপন

আধ্যাত্মিকতা আমাদের পিছনে তাকাতে বারণ করে না, কিন্তু কীভাবে তাকাবে সেটা শিখিয়ে দেয়।


দুটো ভাবে পিছনে তাকানো যায় -


এক, অনুশোচনায় তাকানো:--- "ইস, ওটা যদি না করতাম, ওটা যদি করতাম, আমার সাথেই কেন এমন হলো?" - এই তাকানোটা হলো কাঁটার উপর দিয়ে হাঁটার মতো। যত তাকাবে, তত রক্ত ঝরবে। তুমি অতীতকে বদলাতে পারবে না, শুধু বর্তমানের শান্তিটা নষ্ট করবে।


দুই, কৃতজ্ঞতায় তাকানো:--- "যা হয়েছিল, ভালোই হয়েছিল। ওই কষ্টটা আমাকে শক্ত করেছে, ওই ভুলটা আমাকে মানুষ চিনিয়েছে, ওই অন্ধকার রাতটাই আমাকে ভোরের মূল্য শিখিয়েছে।" - এই তাকানোটা হলো ফুলের উপর দিয়ে হাঁটা।


পিছনে তাকাও, কিন্তু আসামীর মতো নয়, একজন কৃতজ্ঞ যাত্রীর মতো তাকাও। দেখো, তুমি কোথা থেকে কোথায় এসেছো।


যে মানুষটা আজ তোমাকে কাঁদিয়েছে, সে-ই তো তোমাকে শিখিয়েছে তুমি কতটা সহ্য করতে পারো। যে দরজাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেটাই তো তোমাকে নতুন রাস্তা খুঁজতে বাধ্য করেছে। তাহলে রাগ কেন? ধন্যবাদ দাও।


একটা গাড়ির কথা ভাবো। গাড়ির সামনে একটা বড় কাঁচ থাকে, আর পিছনে দেখার জন্য একটা ছোট্ট আয়না। কেন?


কারণ জীবনের ৯০% সময় তোমাকে সামনে তাকিয়ে চালাতে হবে। পিছনের আয়নাটা শুধু মাঝে মাঝে দেখার জন্য, যাতে তুমি বুঝতে পারো তুমি কতটা এগিয়েছো, পিছনে কোনো বিপদ আসছে কিনা। কিন্তু কেউ যদি সারাক্ষণ পিছনের আয়নার দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালায়, সে এক্সিডেন্ট করবেই।


আমরাও তাই করি। আমরা সারাক্ষণ পিছনে তাকিয়ে জীবন চালাতে চাই।


 অতীত হলো তোমার শিক্ষক, জেলখানার জেলার নয়। শিক্ষককে সম্মান করতে হয়, তার কাছে শিখতে হয়, তার কাছেই পড়ে থাকতে হয় না। তোমার অতীতের কাজ তোমাকে আটকে রাখা নয়, তোমাকে এগিয়ে দেওয়া।


তুমি আজ যে মানুষটা, তার পিছনে হাজারটা ভাঙা গল্প, হাজারটা রাত জাগা, হাজারটা ভুল সিদ্ধান্ত আছে। সেগুলোকে ঘৃণা করো না। ওগুলো না থাকলে এই তুমিটা-ই থাকতে না।


তাই পিছনে তাকালে বুক চাপড়ে বোলো না - "আমার সব শেষ।" বরং বুকে হাত রেখে বলো - "এত কিছুর পরেও আমি এখনো দাঁড়িয়ে আছি, এতটা পথ হেঁটে এসেছি।"


এটাই তোমার শক্তি।


কথাটা শুনতে সুন্দর, কিন্তু করবে কীভাবে? যখন মনটা পোড়ে, তখন কৃতজ্ঞতা আসে না। তার জন্য তিনটে ছোট অভ্যাস -


১. রাতে ৩ মিনিটের ডায়েরি:--- ঘুমানোর আগে ৩টে জিনিস লেখো, যার জন্য আজ তুমি কৃতজ্ঞ। সেটা বড় চাকরি পাওয়া না-ও হতে পারে, "আজ চা টা খুব ভালো হয়েছিল, আজ কেউ আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল" - এটুকুই। দেখবে, তোমার মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে আফসোস থেকে কৃতজ্ঞতায় শিফট করবে।


২. পুরনো কষ্টকে ধন্যবাদ দাও:--- চোখ বন্ধ করে একটা পুরনো কষ্টের কথা ভাবো, যা তোমাকে এখনো কাঁদায়। এবার তাকে মনে মনে বলো - "তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছিলে, কিন্তু তুমি আমাকে এটা শিখিয়েছো - (ফাঁকা জায়গাটা পূরণ করো)। তার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। তোমার কাজ শেষ, এবার তুমি যেতে পারো।" প্রতিশোধ নয়, কৃতজ্ঞতায় ছাড়ো।


৩. নিজের পায়ের ছাপ গোনো:--- যখনই মনে হবে "আমি কিছুই করতে পারিনি", তখন ২ বছর আগের তোমার কথা ভাবো। তুমি কতটা বদলেছো? আগে যে কথায় ভেঙে পড়তে, আজ সেটা সামলে নাও। আগে যে জিনিসটা বুঝতে না, আজ সেটা বোঝো। এটা কি কম বড় অর্জন?


শেষ কথা এটাই বলার ---


জীবন সামনে হাঁটার নাম, পিছনে তাকিয়ে কাঁদার নাম নয়।


পিছনে তাকানোটা যদি করতেই হয়, তাহলে রাজার মতো তাকাও। নিজের অতীত সাম্রাজ্যের দিকে তাকিয়ে দেখো - কত যুদ্ধ পেরিয়ে, কত ক্ষত নিয়েও তুমি আজও টিকে আছো।


অনুশোচনা তোমাকে বলে - "তুমি ভুল ছিলে।"

আর কৃতজ্ঞতা তোমাকে বলে - "তুমি শিখেছো।"


তুমি কোনটা শুনতে চাও?


তাই আজ থেকে, যখনই পিছনে তাকাবে, চোখে জল নয়, ঠোঁটে একটা হাসি নিয়ে তাকাবে। আর বলবে - "ধন্যবাদ অতীত, তুমি ছিলে বলেই আমি আজ আমি হতে পেরেছি।"

০ মন্তব্য · ৪৬ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!