প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসরিজিকের মালিক আল্লাহ

গল্প ও উপন্যাস

রিজিকের মালিক আল্লাহ

রিজিকের মালিক আল্লাহ

#বাগদাদের এক ব্যস্ত বাজারে হামিদ নামে এক ব্যবসায়ী বাস করত। ছোটবেলা থেকেই সে পরিশ্রমী ছিল। অল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিল, আর কয়েক বছরের মধ্যেই তার দোকান বাজারের অন্যতম বড় দোকানে পরিণত হয়েছিল। দোকানে কাপড়, মসলা, চামড়া, সুগন্ধি—কী ছিল না! দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরা তার কাছে আসত। তার বাড়ি ছিল বড়, উঠানে দামি পাথর বসানো, ঘরে নানা রকম আসবাবপত্র। লোকেরা তাকে দেখে বলত, “আল্লাহ হামিদকে কত কিছু দিয়েছেন!”


বিজ্ঞাপন

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ছিল—হামিদ নিজে কখনো সুখী ছিল না।


সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার প্রথম চিন্তা হতো, “আজ কত বিক্রি হবে?”

দুপুরে ভাবত, “অমুক ব্যবসায়ীর দোকানে আমার চেয়ে বেশি মাল কেন?”


রাতে হিসাবের খাতা খুলে বসে বলত, “এ মাসে লাভ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু গত মাসের চেয়ে কম।”


তার কাছে দশটি বাক্স থাকলে সে এগারো নম্বর বাক্সের চিন্তা করত। দশটি ঘোড়া থাকলে এগারো নম্বর ঘোড়া কেনার কথা ভাবত। বাজারে তার একটি দোকান থাকলেও পাশের দোকানটি কেন তার নয়—সেটাই তাকে অস্থির করে রাখত।


তার স্ত্রী মাঝে মাঝে বলত, “আপনার তো আল্লাহর দেওয়া অনেক কিছু আছে। একটু বিশ্রাম নিন।”


হামিদ উত্তর দিত, “যে মানুষ থেমে যায়, সে পিছিয়ে পড়ে।”

স্ত্রী বলত, “কিন্তু আপনি তো সামনে এগোতে গিয়ে নিজের শান্তিটাই হারিয়ে ফেলছেন।”


হামিদ এসব কথা শুনে বিরক্ত হয়ে যেত। একদিন বাজারে এক বৃদ্ধ ব্যবসায়ী তাকে বললেন, “হামিদ, তোমার ব্যবসা ভালো চলছে। কিন্তু তোমার মুখে সবসময় চিন্তা কেন?”

হামিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমি আরও বড় হতে চাই।”


বৃদ্ধ বললেন, “কত বড়?”

হামিদ একটু ভেবে বলল, “যত বড় হলে আর কোনো চিন্তা থাকবে না।”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, “সেই দিনটি হয়তো কখনো আসবে না।”


হামিদ কথাটি পছন্দ করল না। সে মনে মনে ভাবল, “বৃদ্ধ মানুষ, তাই এমন কথা বলেন। আমার কাছে যদি আরও বেশি সম্পদ আসে, তখন দেখব কীভাবে চিন্তা থাকে।”


এরপর তার লোভ আরও বেড়ে গেল। সে শহরের বাইরে একটি বড় গুদাম কিনল। নতুন নতুন পণ্য আনতে লাগল। অন্য ব্যবসায়ীরা যেখানে একটি চালান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকত, হামিদ সেখানে তিনটি চালান আনত। কিন্তু যত সম্পদ বাড়তে লাগল, তার ভয়ও তত বাড়তে লাগল।


“চোর যদি আসে?”

“দাম যদি কমে যায়?”

“মাল যদি নষ্ট হয়?”

“অন্য ব্যবসায়ী যদি আমার চেয়ে সস্তায় বিক্রি করে?”

“কেউ যদি আমার ব্যবসার গোপন কৌশল জেনে যায়?”


তার ঘুম কমে গেল। খাবারের স্বাদ কমে গেল। পরিবারের সঙ্গে বসার সময়ও তার হাতে হিসাবের খাতা থাকত।


একদিন সন্ধ্যায় সে বাজার থেকে ফিরছিল। পথের ধারে দেখল, বাহলুল (রহ.) একটি পুরোনো দেয়ালের পাশে বসে আছেন। সামনে কয়েকজন দরিদ্র মানুষ। তাঁদের সঙ্গে তিনি হাসিমুখে কথা বলছিলেন। হামিদ ঘোড়া থামাল।


সে বলল, “বাহলুল, আপনি এখানে বসে আছেন আর আমি সারাদিন ব্যবসা করে ক্লান্ত হয়ে মরছি!”

বাহলুল (রহ.) তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তাহলে তোমার কাছে আমার চেয়ে বেশি আছে।”

হামিদ বলল, “কীভাবে?”

“তুমি বললে তুমি সারাদিন ব্যবসা করো। তোমার কাছে সম্পদ আছে, দোকান আছে, গুদাম আছে। আমার কাছে এসব নেই। অথচ তুমি ক্লান্ত, আর আমি শান্তিতে বসে আছি।”


হামিদ কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, “শান্তিতে বসে থাকলে সম্পদ আসে না।”

বাহলুল বললেন, “সম্পদ আনার জন্য পরিশ্রম করা ভালো। কিন্তু সম্পদের দাস হয়ে যাওয়া ভালো নয়।”

হামিদ বলল, “আপনি কি বলতে চান আমি ব্যবসা ছেড়ে দেব?”

“না,” বাহলুল বললেন। “আমি বলছি, ব্যবসা তোমার হাতে থাকবে, হৃদয়ে নয়।”


হামিদ কিছু বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল।


বাহলুল (রহ.) মাটিতে পড়ে থাকা একটি ছোট পাথর তুলে হাতে নিলেন।


বললেন, “এই পাথরটি যদি তোমার হাতে থাকে, তুমি এটিকে যেখানে ইচ্ছা রাখতে পারবে। কিন্তু যদি তুমি এটিকে মুঠোর ভেতর এত শক্ত করে চেপে ধরো যে হাত ব্যথা হয়ে যায়, তখন পাথরটি তোমার হাতে আছে ঠিকই, কিন্তু তুমি তার কারণে কষ্ট পাচ্ছ।”


হামিদ বলল, “এর সঙ্গে আমার সম্পদের কী সম্পর্ক?”

বাহলুল বললেন, “সম্পদ তোমার হাতে থাকলে তা নিয়ামত। কিন্তু সম্পদ যখন তোমার হৃদয়কে আঁকড়ে ধরে, তখন তা পরীক্ষায় পরিণত হয়।”


হামিদ কোনো উত্তর দিল না।


কয়েকদিন পর তার জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা তাকে গভীরভাবে নাড়া দিল।


তার সবচেয়ে বড় গুদামে হঠাৎ আগুন লাগল। রাতের অন্ধকারে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। লোকেরা পানি এনে আগুন নেভানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক মাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।


সকালে হামিদ গুদামের সামনে দাঁড়িয়ে ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বহু বছরের সঞ্চয়ের একটি বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে। সে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। চারপাশের লোকেরা তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল।


কেউ বলল, “আল্লাহ উত্তম কিছু দেবেন।”

কেউ বলল, “ব্যবসায় এমন হয়।”

কিন্তু হামিদের মনে শুধু একটি কথাই ঘুরছিল—“সব শেষ!”


সেদিন প্রথমবার সে বুঝতে পারল, যে সম্পদকে সে নিজের নিরাপত্তার দেয়াল মনে করেছিল, সেই সম্পদই তাকে কতটা ভয় দিয়ে রেখেছিল।


কিছুক্ষণ পর সে দেখল, গুদামের এক পাশে তার পুরোনো কর্মচারী করিম দাঁড়িয়ে আছে। করিমের পোশাক ধুলায় ভরা। সে সারারাত আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছে।


হামিদ বলল, “তুমি কি সারারাত এখানে ছিলে?”

করিম বলল, “জি।”

“তোমার নিজের ঘর?”

“সেটা পরে দেখব।”

“কেন?”


করিম শান্তভাবে বলল, “মালিক, আপনার গুদাম বাঁচানোর চেষ্টা করা আমার দায়িত্ব ছিল।”


হামিদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার এত সম্পদ ছিল, অথচ সম্পদ হারানোর ভয়ে সে ভেঙে পড়েছিল। আর করিমের নিজের ঘরে হয়তো সামান্য জিনিসপত্র, তবু সে অন্যের সম্পদ বাঁচাতে রাত কাটিয়েছে।


হামিদের মনে প্রশ্ন জাগল—“তাহলে ধনী কে?”

সে সেদিন বিকেলে আবার বাহলুল (রহ.)-এর কাছে গেল।

বাহলুল তাকে দেখে বললেন, “আজ তোমার মুখে আগের মতো ব্যস্ততা নেই।”

হামিদ বলল, “আমার অনেক কিছু পুড়ে গেছে।”

বাহলুল বললেন, “কী পুড়েছে?”

“আমার পণ্য, আমার টাকা, আমার বছরের পরিশ্রম।”

বাহলুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আর কী বেঁচে আছে?”


হামিদ বলল, “আমি।”

“তোমার পরিবার?”

“আলহামদুলিল্লাহ, তারা নিরাপদ।”

“তোমার ঈমান?”

হামিদ মাথা নিচু করল।

বাহলুল বললেন, “তাহলে সব শেষ হয়নি।”

হামিদের চোখে পানি চলে এল।


বাহলুল বললেন, “মানুষ যখন হারায়, তখন সে শুধু যা চলে গেছে তা দেখে। কিন্তু মুমিনের উচিত যা রয়ে গেছে, তার দিকেও তাকানো। কারণ আল্লাহ কোনো বান্দার কাছ থেকে একটি জিনিস নিয়ে অন্য অসংখ্য নিয়ামত রেখে দিতে পারেন।”


হামিদ বলল, “কিন্তু আমার এত ক্ষতি হয়েছে!”

“হ্যাঁ,” বাহলুল বললেন, “ক্ষতি হয়েছে। কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই ক্ষতি তোমাকে একটি প্রশ্ন করার সুযোগ দিয়েছে—তুমি কি সম্পদের মালিক ছিলে, নাকি সম্পদ তোমার মালিক হয়ে গিয়েছিল?”


হামিদ নীরব হয়ে গেল।

বাহলুল বললেন, “তুমি এতদিন ভাবতে, আরও সম্পদ পেলে শান্তি পাবে। এখন দেখলে, সম্পদ তোমার কাছে ছিল; কিন্তু শান্তি ছিল না। তাই বুঝতে শেখো—শান্তি কোনো গুদামে জমা থাকে না।”


হামিদ ধীরে ধীরে বলল, “তাহলে আমি কী করব?”

বাহলুল উত্তর দিলেন, “হালালভাবে পরিশ্রম করবে। ব্যবসা করবে। সম্পদ উপার্জন করবে। কিন্তু মনে রাখবে—রিজিকের মালিক তুমি নও। তুমি শুধু চেষ্টা করো, আর ফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দাও।”


হামিদ বলল, “আর যদি আবার সম্পদ আসে?”

বাহলুল মৃদু হেসে বললেন, “তখন সম্পদকে এমনভাবে ব্যবহার করবে, যাতে তা তোমাকে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে না সরিয়ে দেয়।”


সেদিন থেকে হামিদ তার জীবন বদলাতে শুরু করল।

সে ব্যবসা ছেড়ে দেয়নি। বরং আরও সততার সঙ্গে ব্যবসা করতে লাগল। কিন্তু তার লক্ষ্য বদলে গেল। আগে সে শুধু নিজের সম্পদ বাড়ানোর জন্য ব্যবসা করত। এখন সে নিজের পরিবারের হক আদায় করত, কর্মচারীদের ন্যায্য মজুরি দিত, দরিদ্রদের সাহায্য করত এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করত।


কয়েক বছর পর তার ব্যবসা আবার আগের চেয়েও বড় হয়ে উঠল। কিন্তু এবার তার আচরণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।


কেউ জিজ্ঞেস করলে, “আপনার এত সম্পদ, আপনি কি এখন খুব নিশ্চিন্ত?”


হামিদ বলত, “আগে আমার সম্পদ কম ছিল, কিন্তু লোভ বেশি ছিল। এখন সম্পদ বেশি, কিন্তু লোভকে ছোট করার চেষ্টা করি। আমি শিখেছি—সম্পদ বাড়ানো আর হৃদয়কে ধনী করা এক জিনিস নয়।”


একদিন তার ছেলে তাকে জিজ্ঞেস করল, “আব্বা, মানুষ কত টাকা হলে ধনী হয়?”


হামিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “যে মানুষ আল্লাহর দেওয়া অল্প নিয়ামতের জন্যও শুকরিয়া করতে পারে, সে দরিদ্র ঘরে থেকেও ধনী। আর যে মানুষ হাজার সম্পদের পরও আরও হাজারের জন্য অস্থির থাকে, সে প্রাসাদে থেকেও অভাবী।”


তার ছেলে বলল, “আপনি এই শিক্ষা কোথায় পেলেন?”


হামিদ আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “একদিন একজন জ্ঞানী মানুষ আমাকে বুঝিয়েছিলেন—হাতে সম্পদ থাকা আর হৃদয়ে সম্পদ থাকা এক কথা নয়।”


সেদিন থেকে হামিদের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল তার হিসাবের খাতায় নয়, তার হৃদয়ে। সে বুঝেছিল, মানুষের প্রকৃত নিরাপত্তা তার সিন্দুকে কত স্বর্ণ আছে তাতে নয়; বরং তার অন্তর কতটা আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল, সেটাতেই।


### গল্পের শিক্ষণীয় বিষয়


এই কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সম্পদ নিজে খারাপ নয়; বরং সম্পদ কীভাবে অর্জন ও ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। হালাল উপার্জন করা, পরিবারকে দেখাশোনা করা এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা বৈধ ও প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু যখন সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষের হৃদয়কে অস্থির করে দেয়, তখন সেই সম্পদ আর প্রশান্তির কারণ থাকে না।


আমরা অনেক সময় মনে করি, “আরও একটু টাকা হলে আমি সুখী হব”, “আরও বড় বাড়ি হলে শান্তি পাব”, “আরও সম্পদ হলে দুশ্চিন্তা থাকবে না।” কিন্তু মানুষের চাহিদার শেষ নেই। একটি পূরণ হলে আরেকটি চাহিদা সামনে আসে। তাই শুধু সম্পদ বাড়ানোর চেষ্টা নয়, **কানাআত—আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতে সন্তুষ্ট থাকা**—শেখাও জরুরি।


আরেকটি বড় শিক্ষা হলো, বিপদ কখনো কখনো মানুষের চোখ খুলে দেয়। কোনো ক্ষতি আমাদের জীবনের সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য আসে না; কখনো তা আমাদের ভুল অগ্রাধিকার বুঝিয়ে দেওয়ার মাধ্যমও হতে পারে। যা হারিয়েছি তার জন্য কষ্ট থাকবে, কিন্তু যা রয়ে গেছে তার জন্য শুকরিয়া করাও শিখতে হবে।


সবশেষে মনে রাখতে হবে—**রিজিকের জন্য চেষ্টা আমাদের দায়িত্ব, কিন্তু রিজিকের মালিক আল্লাহ। সম্পদ হাতে রাখুন, কিন্তু হৃদয়ের সিংহাসনে আল্লাহকেই রাখুন।**

০ মন্তব্য · ৮১ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!