১৮১৬ সাল। মিশরের থিবস। দুপুর। বালির নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছে সোয়া সাত টনের একটা গ্রানাইট মুখ। মুখটা হাসছে।
সূর্য মাথার ওপর। বালি এত গরম যে খালি পায়ে দাঁড়ানো যায় না।
সেই বালির ওপর হাঁটু গেড়ে বসে আছেন প্রকাণ্ড চেহারার এক ইতালীয়। ছ-ফুট সাত ইঞ্চি লম্বা মানুষটা একসময় লন্ডনের সার্কাসে ভারোত্তোলক ছিলেন। বিশেষভাবে বানানো একটা কাঠামোর ওপর বসা বারোজন মানুষকে তুলে মঞ্চ ঘুরতেন।
চামড়ার থলি থেকে তিনি খানিকটা জল ঢাললেন মুখটার ওপর। কাপড় দিয়ে মোছার আগেই জলটা শুকিয়ে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল কুরনা গ্রামের রশিদ।
“ফরাসিরা চেষ্টা করেছিল, সাহেব। পারেনি। বুকের ডান দিকে একটা ফুটো করে রেখে গেছে।”
বেলজোনি উত্তর দিলেন না। ইশারায় বালি সরাতে বললেন। সারা দুপুর ধরে বালি সরানো হলো। মুখ আর বুকের অংশ বেরিয়ে এল। সেই মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা হাসি লেগে আছে। দুজনেই কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
রশিদ জিজ্ঞেস করল, “কাঠের গুঁড়ি লাগাতে বলি?”
পরদিন ভোরে সার দিয়ে গোল কাঠের গুঁড়ি পাতা হলো। পাথরের শরীরটায় দড়ি বাঁধা হলো। একশো তিরিশ জন মানুষ দড়ি ধরে দাঁড়াল। মুখটা কার, বেলজোনি তখনও জানতেন না।
রশিদ বলল, “দড়ি ছিঁড়বে, সাহেব।”
বেলজোনি বললেন, “টানো।”
---
“দুশো দশ বছর পরে তুই সোফায় বসে পা নাচাচ্ছিস। পেগটা বানা।”
পটা সম্বিৎ ফিরে পেল।
পটা বলল, “জটুদা, আজ একটা রিল দেখলাম। বলছে, একশো বছর পরে আমরা কেউ থাকব না। দুশো বছর পরে কেউ মনেও রাখবে না আমাদের।”
জটুদা গ্লাসে চুমুক দিলেন।
“রামেসিস।”
“অ্যাঁ?”
“দ্বিতীয় রামেসিস। মিশরের ফ্যারাও। ছেষট্টি বছর রাজত্ব করেছিলেন। মারা যান প্রায় নব্বই বছর বয়সে।”
“বাপ রে!”
“কেউ কেউ বলে, ছেলেমেয়ে ছিল একশোরও বেশি।”
পটা বুঝল, জটুদা ফুল মুডে আছেন।
“রামেসিস নিজের নামটা টিকিয়ে রাখা নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। যা বানিয়েছিলেন, তার গায়ে নিজের নাম। যা বানাননি, অনেক সময় তার গায়েও নিজের নাম খোদাই করিয়েছিলেন।”
“মানে?”
“পুরোনো রাজাদের বানানো মন্দির আর মূর্তিতেও নিজের নাম বসিয়ে দিতেন।” জটুদা গ্লাস নামালেন। “নামটা পাথরে এত গভীরভাবে খোদাই করাতেন, যাতে পরে কেউ ঘষে তুলে না দিতে পারে।”
পটা সোজা হয়ে বসল।
“কাজে দিয়েছিল?”
“দিয়েছিল বইকি। ১৯৭৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। প্যারিসের ল্য বুর্জে বিমানবন্দরে লাল কার্পেট পাতা হলো। ফরাসি রিপাবলিকান গার্ডের সদস্যরা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রইলেন। ফরাসি সরকারের একজন মন্ত্রীও অপেক্ষা করছিলেন।”
“কার জন্য?”
“রামেসিসের জন্য। তিন হাজার বছরের পুরোনো এক মমি প্লেন থেকে নামল।”
পটা হেসে ফেলল।
“তাহলে তো লোকটা জিতেই গেছে! তিন হাজার বছর পরেও রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা।”
জটুদা উঠে জানলার কাছে গেলেন। কয়েক মুহূর্ত অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন।
" হারুক আর জিতুক, তাতে রামেসিসের কী যায় আসে? সে তো আর জানতে পারছে না। "
"তাও ঠিক কথা। তবে জটুদা .... পটার কথাটা শেষ হওয়ার আগেই জটুদা আবার বললেন।
“মমিটায় ছত্রাক ধরে ক্ষয় শুরু হয়েছিল। ফরাসি পরমাণু শক্তি কমিশন বিকিরণ দিয়ে সেটাকে জীবাণুমুক্ত করে। ১৯৭৭ সালের মে মাসে সেটাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।”
পটা একটা বেগুনি মুখে পুরল।
জটুদা বললেন, “লাল কার্পেটটা রাজাই পেয়েছিল। কিন্তু প্লেন থেকে নামানো হয়েছিল এক রোগীকে।”
পটা কিছু বলল না।
“ওই সোয়া সাত টনের মূর্তিখণ্ডটা ইংল্যান্ডে পৌঁছেছিল ১৮১৮ সালে। শোনা যায়, তার আগেই মূর্তিটার আসার খবর শুনে এক ছোকরা কবি, ওটাকে চোখে না দেখেই, কবিতা লিখে ফেলেছিল।”
“না দেখেই?”
“হুঁ। কবিতায় এক রাজা পাথরের গায়ে নিজের গর্ব খোদাই করে রেখে গেছে। শেষে দেখা যায়, সেই গর্বের চারপাশে আর কিছুই পড়ে নেই। শুধু বালি আর বালি।”
“কবিটা কে, জটুদা?”
“শেলি।”
পটা বলল, “তা হলেও নামটা তো টিকে গেল।”
জটুদা জিজ্ঞেস করলেন, “আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে কত মানুষ জন্মেছে?”
“কত?”
“একটা হিসেব বলছে, প্রায় এগারো হাজার সাতশো কোটি। আর এখন বেঁচে আছে আটশো কোটির কিছু বেশি।”
পটা মনে মনে হিসেব কষল।
“সাত শতাংশের কাছাকাছি।”
জটুদা বেগুনির সঙ্গে একমুঠো মুড়ি মুখে পুরলেন। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, তোর ঠাকুরদার বাবার নাম কী ছিল রে?”
পটা কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করল। তারপর নিজের আর জটুদার গ্লাসে স্কচ ঢালল।
কিছুক্ষণ পরে পটা বলল, “গত সপ্তাহে আলমারি গোছাচ্ছিলাম। একটা পুরোনো অ্যালবাম পেলাম। তার মধ্যে হাতে আঁকা একটা পোর্ট্রেট ছিল। গোঁফওয়ালা এক ভদ্রলোক চেয়ারে বসে আছেন।”
পটা থামল।
“নিচের দিকটা নষ্ট হয়ে গেছে, তাই নামটা পড়তে পারিনি।”
জটুদা বেগুনিতে কামড় দিয়ে বললেন, “এক্কেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে রে।”
“ছেলে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, এটা কে?’ বলতে পারলাম না। হয়তো ঠাকুরদার বাবা। হু কেয়ারস।”
জটুদা বিড়বিড় করে বললেন, “হু কেয়ারস।”
পটা বাদামের প্যাকেট খুলতে খুলতে বলল, “জটুদা, তাহলে আমরা বেঁচে থাকি কেন?”
জটুদা রাস্তার জমা জলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কয়েকটা বাচ্চা জলের মধ্যে লাফাচ্ছে। মাঝে মাঝে চিৎকার করছে, হাসছে।
বাচ্চাগুলোর দিক থেকে চোখ না সরিয়েই জটুদা বললেন, “আজ যাদের সমালোচনা আর বিচারকে এত ভয় পাস, তারাও একদিন থাকবে না। তুইও না। তাহলে এত ভয় কিসের?”
“বড়ো হাইফাই দিচ্ছ, দাদা। ভয় লাগছে।”
পটা গ্লাসে চুমুক দিল, তারপর বলল, “আমরা তো লোকে কী বলবে ভেবেই গোটা জীবনটা কাটিয়ে দিই।”
“বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য মানুষের মনে থেকে যাওয়া নয়। জীবনের উদ্দেশ্য, অস্তিত্বটাকে গভীরভাবে অনুভব করতে পারা। মন খুলে হাসতে পারা, কাঁদতে পারা, ভালোবাসতে পারা।”
জটুদা জানলার কাছ থেকে সোফায় ফিরে এলেন। তারপর ভেতরের দিকে হাঁক দিলেন, “আর কয়েকটা গরম গরম হবে?”
পটা তাকিয়ে রইল।
“তুমি না মাইরি।”
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!