মানুষগুলো ধীরে ধীরে কেমন যেনো আস্ত বো/কা/চো/* হয়ে উঠছে । কথাটা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারে সনাতন ।
সনাতনের বাড়ি পশ্চিম ভারতে। আজ পূর্ব ভারতে এসছে , তাও কয়েক বছর হলো । প্রথমে এসেছিল বাবা মা আর দুই দিদির হাত ধরে ,এখন ও ওকা।
বাবা মারা গেছে মন্দিরের পাশের কারখানায়, ইঞ্জিনের চাকার তলায় পিষে , তাও আজ প্রায় বছর তেরো । এরপর মরল দুই দিদি । একটাকে পাওয়া গেছিল নদীর পাশের ঝোপটায় , উলঙ্গ অবস্থাতে। আরেকজনকে বনের মধ্যে । কেউ বা কারা ওকে খেয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গেছিল বনের ধারটায়।
এরপর মাও আর বেশিদিন বাঁচেনি, এক সকালে উঠে ঘরের দরজায় ঝুলতে দেখা গেছিল মায়ের বিবস্ত্র শরীরটাকে।
পুলিশ এসে তদন্ত করে পাশের বাড়ির আব্দুল চাচাকে ধরে নিয়ে গেলো । সনাতন সবটাই দেখলো । গত রাখিপূর্নিমায় মায়ের তাকে রাখি পরানো থেকে, সেদিন পুলিশের সেই হাতে দড়ি পরিয়ে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সবটাই ।
এরপর আর থাকতে পারেনি ও ওই বাড়িটাতে,ছুটে বেড়িয়ে এসেছিল ঘর থেকে।
সেই থেকে ও পথেই থাকে । কখনো ভিক্ষা করে ,আবার কখনো কাজ পেলে সেটা করে । কোনোটাতেই ওর লাজ নেই ।যেদিন কিছু পায় না, সেদিন ফুটপাতের এঁটোকাটা তুলে খায়।
কেউ কেউ দেখে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
কেউ গাল দেয়।
কেউ আবার দু-একটা পয়সা ছুড়ে মারে ওর দিকে।
সনাতন সবটাই নেয়।
পয়সা।
গালি।
এঁটোকাটা।
সব।
একদিন সনাতন বড় হয় । বয়স বাড়ে। মুখে চুল দাড়ি গজায় । সাথে গজায় প্রেম।
সনাতনের প্রথম ভালোবাসা। নতুনপাড়ার ঝাঁ চকচকে গলির আট নম্বর ঘরটার মালকিন নুরজাহানকে ।
নুর জাহানের বয়স সাতাশ । সনাতনের তেইশ।
নুর জাহানের আসল নাম জয়িতা দাস । নামটা এখন আর কেউ মনে রাখে না। হয়তো নুরজাহান নিজেও না।
খুব ছোটবেলায় এসেছিল সে এই গলিতে। ‘এসেছিল’ মানে , জয়িতাকে নিয়ে আসা হয়েছিল। ওর মামা ওকে বিক্রি করে রেখে গিয়েছিল এখানে।
তারপর?
তারপর আর কেউ তাকে নিতে আসেনি।
কেউ দরজায় দাঁড়িয়ে বলেনি, ‘চল, বাড়ি যাই।’
তাই সে রয়ে গেছে গলিটাতে।
এখন মাঝেমধ্যে খদ্দের বেড়িয়ে যেতেই নুরজাহান বাইরে এসে কিছু সময় তাকিয়ে থাকে রাস্তার ওপারটাতে ।
ওখানে একটা ধুলো ছেঁড়া জামা পড়া ছেলেকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে ওরদিকে । ছেলেটা কেমন যেনো একটু পাগলাটে গোছের । প্যান্টে চেন নেই সাথে বোতামও ,মাজার লাল দড়িটা দিয়ে সেটাকে শরীরের সাথে বেঁধে রাখা শক্ত করে ।
ছেলেটা আজকাল প্রায়ই আসে গলিটার মুখে । কিন্তু ওকে দেখে মনে হয় না যে ও কোনো ঘরে ঢোকে । শুধু চেয়ে থাকে ওর ঘরের দরজাটার দিকে । হাতে ধরে রাখে দুটো দশ টাকার নোট । ও টাকায় এখানে কাউকে পাওয়া যায় না । গলির শেষের বুড়ি আফিমাকেও না ।
বেশ লাগে ছেলেটাকে দেখতে ,কেমন বোকা বোকা ঢুলু ঢুলু চোখ। নুরজাহানের মায়া হয় , ছেলেটা যেনো কোনো ছোট্টো বাচ্চার মতো ওর কাছ থেকে কিছু চাইছে ।
কিন্তু কী চাইছে ? নুরজাহান বোঝে না । তারপরেই ছেলেটার চোখ লক্ষ্য করে নিজের ফর্সা বুকটাকে একটু ঢেকে নেয় ও ।
খোলা খাবারে মাছি পরেছে । নুরজাহানের বেশ আমোদ লাগে । সাথে তলপেট খানা একটু চিরিক দিয়ে ওঠে ।
“কী নাম তোমার ?.....কী হল কী ওইভাবে তাকিয়ে রয়েছো কেনো ? কী জিজ্ঞেস করলাম ? নাম…কী…তোমার?”
" স..নাতন "
“সনাতন !? এ কিরকম নাম ? কে দিয়েছে ?"
“মা"
“তোমার মা জানে ,তুমি এরকম নোংরা জায়গায় আসো?" কথাটা বলেই নুরজাহান বুঝতে পারে ও একটু ভুল করে ফেলেছে । ছেলেটার বোধহয় মা নেই । থাকলে এইরকম চেহারা থাকতো না ছেলেটার। নুরজাহান জিজ্ঞাসাই করে ফেলে
“তোমার মা নেই ?"
সনাতন মাথা নাড়ে ।
“কোথায় থাকো ?"
“ওই…ই বাস স্টপটায়।"
“এখানে কী কর প্রতিদিন?"
সনাতন জবাব না দিয়ে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকে নুরজাহানের গলার তিলটার দিকে । কী মিষ্টি তিলটা । সকালে চায়ের দোকানে তাকে বাস কন্ডাক্টর ভগবান ঘোষ একরকম বিস্কুট খেতে দেয় ,তাতে অনেকসময় ওপরে কালো জিরা দেওয়া থাকে এই তিলটাও যেন পুরো সেরকম । সনাতনের বড্ড লোভ হলো তিলটা দেখে ।
নুর একটা হাত দিয়ে তিলটা ঢেকে দিতেই ওর জ্ঞান ফিরল ।
কী যে হয়েছে ওর আজকাল সনাতন বুঝতে পারে না । মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলেই ওর কেমন জানি বড্ড তেষ্টা পায় । গলা শুকিয়ে যায় খুব । তলপেটটা চুইচুই করে ওঠে । না এইবার এদিকে আসা ওকে কমাতেই হবে ।
" এই কী হলো ? কোথায় যাচ্ছো?”
"বাড়ি ।”
" বাড়ি !? এই যে বললে তুমি বাস স্টপে ঘুমাও ।”
"সেখানেই “
" কেনো ? আমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগছে না বুঝি ?”
“লাগছে।"
“তাহলে ,চলে যাচ্ছো কেনো?"
"এমনি।”
ধুসসস! ছেলেটা ভীষণ রকম বোকা। একটু তারকাটাও আছে বোধ হয় ।
“আচ্ছা , তুমি প্রতিদিন এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকো কেনো আমার ঘরের সামনে ? ….”
সনাতন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে , কথা বলতে পারে না ও …. । ওকে ওইভাবে চুপ করে থাকতে দেখে নুর একটু নিচু হয়ে তাকালো ওর দিকে ,তারপর বললো
“শুতে চাও আমার সাথে?"
সনাতনের কান দুটো লাল হয়ে ওঠে । ও মাথা নাড়ে ।
"তাহলে এই কুড়ি টাকা কীসের ?”
"আমার সাথে চা খেতে যাবে একদিন ?....দুরে না ওই যে , চায়ের দোকানটা আছে ওখানে ।"
সনাতন কথাটা বলেই কেমন জানি গুটিয়ে যায় ।
নুরও প্রথমে খানিকটা থতমত খেয়ে ওঠে , তারপর বুঝতে পেরে হেসে ওঠে ।
“হা হা হা । ডেটে নিয়ে যেতে চাইছো নাকি ?"
সনাতন মাথা নাড়ে। মাথাটা এখনো মাটির দিকে ।
“বেশ । কবে যাবো বলো …"
“শনিবার?"
“উমমম। না শনিবার হবে না ,ওইদিন খদ্দেরদের একটু বেশি ভিড় থাকে । "
কথাটা বলেই নুর বুঝতে পারে ও ভুল করে ফেলেছে । ছেলেটা যে কষ্ট পেয়েছে তা ওর চেহারা দেখেই বোঝা গেলো ।
“তবে কাল আমি ফাঁকা আছি । চাইলে কাল চা খাওয়া যেতেই পারে । কিন্তু ওই দোকানটায় নয় । ওখানে আমার খদ্দেররা থাকে ….তুমি বরং স্টেশনের পিছনের দোকানটায় পাঁচটার সময় চলে এসো । কেমন?”
সনাতন মাথা নাড়ার আগেই ।নুরকে সোহেলী এসে ডাক দেয়
" এই বিজয় দা এসছে তোর ঘরে । অপেক্ষা করছে । জলদি যা । আজ অনেক রেগে আছে ।মনে হয় দলের মধ্যে ঝামেলা চলছে। একটু সমঝে চলিস বুঝলি ?"
বিজয় ওর রেগুলার কাস্টমার। সামনের বস্তিতেই থাকে । শহরের এক নাম্বার গুন্ডা দলের ম্যানেজার টাইপের কিছু একটা । প্রচন্ড ছিটের আর রাগী।
নুর একবার সনাতনের দিকে তাকিয়ে দেখে ছেলেটা কেমন জানি কুঁকড়ে গেছে কথাটা শুনে । নুরের বড্ড মায়া জাগে ওর উপরে , তারপর একটা হাসি দিয়ে ও উঠে আসে সেখান থেকে।
পরদিন বিকেল পাঁচটার একটু আগেই সনাতন আসে । আজ ও অনেক কষ্টে চেয়ে চিন্তে আরো দশটাকা জোগাড় করেছে নুরের জন্য।
নুর আসলো বিকেল সাড়ে পাঁচটার একটু পরে । চোখের বামদিকে একটা কালচে দাগ । কেউ যেনো প্রচন্ড আক্রোশে ঘুসি মেরেছে ওর চোখটাকে লক্ষ্য করে । নুর কিন্তু কিছুই বলল না সেই ব্যাপারে। বরং কিছুই হয় নি এমনভাবে বেশ খানিকক্ষণ কথা বলল ওর সাথে । ওর বিষয়ে অনেক কিছুই জিজ্ঞাসা করে জানলো তারপর যাওয়ার পথে হাত ধরে হাঁটলো বেশ খানিকটা পথ।
সনাতন ভেবেছিল আজ একটা চুমু খাবে নুরকে
অনেকদিন ধরেই ভাবছে।
আজ মনে হয়েছিল পারবে।
কিন্তু পারলো না ।
আজকাল ওরা প্রায়ই দেখা করে। তবে নুরের অফ টাইম থাকলে তবেই । বাকি দিন গুলোতে সনাতন কাজ করে।
আজকাল ও স্টপেজের চায়ের দোকানেই কাজে লেগেছে । দিন প্রতি দশ টাকা পায়। সাথে এক বেলার খাওয়া দাওয়া ফ্রি ।
নুর এখন মাঝেসাঝে ওকে ঘরে নিয়ে বসায়। নুরের ঘরটা ছোটো । ভিতরে একটা চৌকি পাতা ,তাতে একটা প্লাস্টিক চড়ানো । ঘরের একদিকে একটা ছোটো স্টোভ বসানো । ওটাতেই রান্না করে নুর । পিঁড়িতে বসে সনাতন নুরের রান্না করা দেখে ।ওকে চৌকিতে বসতে মানা করেছে নুর ।
এতে ওর অবশ্য বিশেষ কিছু যায় আসে না । পিঁড়িতে বসেই অনেক গল্প হয় ওদের মধ্যে । সনাতনের চোখ মাঝে সাঝে পিছলে যায় নুরের ঘামে ভেজা ফর্সা পেটটার উপরে । অনেক লোভ হয় তখন ওর । কিন্তু সনাতন কিছু করে না ।
নুর সামনে থেকে সবটাই বুঝতে পারে , সনাতনের দৃষ্টি, উত্তেজনা,লোভ সবটাই । কিন্তু কাপড়টা সামলায় না ও । উত্তেজনার চোরা স্রোতে ওর কাপড়টা ভিজে ওঠে ।
সনাতন আজ বড্ড খুশি। দোকানের মালিক তাকে আজ বখশিশ দিয়েছে। পুরো পঞ্চাশ টাকা বকশিস। সব মিলিয়ে ওর পকেটে আজ জমলো একশো কুড়ি টাকা। সনাতন মনে মনে আরেকবার যোগটা করে নেয় । হ্যাঁ ঠিকই গুনেছে পুরো একশো কুড়ি ।
আজ শনিবার। নুর বলেছিল শনিবার দিনটায় ওর ঘরে খদ্দেরের খুব ভিড় থাকে, তাই দেখা হবে না। কিন্তু আজ সনাতন যাবে । আজ নুরের কাছে ও যাবেই । এই একশো কুড়ি টাকা দিয়ে ও আজ রাতের জন্য কিনে নেবে নুরকে। খদ্দেরদের আজ আর ও ঢুকতে দেবে না ওদের ঘরে ।
হ্যাঁ আজ ঘরটা শুধু ওদের । একান্তই ওদের । আজ ও ঘুমাবে নুরের সাথে । নুরের নরম ফর্সা বুকটায় হাত বোলাতে বোলাতে রাত কাটাবে ও নুরের সাথে । আজ ও আর নুর শুধু । শুধু ওরা দুজন ।আর কেউ না ।
নতুনপাড়ার আট নম্বর গলিটা আজ কেমন যেন থমথমে
সনাতন যখন গলির মুখে পৌঁছাল, সেখানে আজ একটু বেশিই ভিড় চোখে পড়ল ওর । একটা পুলিশের গাড়িও দাঁড়িয়ে আছে মুখটাতে। পুলিশের গাড়িটা দেখেই বুকটা ধক করে ওঠে সনাতনের।
পুলিশের গাড়ি কী করছে গলিটাতে। সনাতন জানে মাঝে মধ্যে এখানে রেড পরে পুলিশের। কিন্তু সে রেড পরলেও তো মাসের শুরুর দিকে । আজকে মাসের তেইশ । এখন তো কোনোভাবেই রেড মারার কথা নয় পুলিশের । ও পাগলের মতো ভিড় ঠেলে গিয়ে দাঁড়াল আট নম্বর ঘরটার সামনে ।
দরজাটা হাঁ করে খোলা। ঘরের মাঝখানে সেই ছোট্ট চৌকিটার উপর উলঙ্গ অবস্থায় পড়ে আছে নুরের নিথর শরীরটা। ওর সেই সুন্দর গলার তিলটার ঠিক নিচেই একটা গভীর কালচে-নীল দাগ, যেন কেউ বুনো জানোয়ারের মতো দাঁত বসিয়ে ছিঁড়ে নিতে চেয়েছে ওর চামড়াটাকে । সারা শরীরটা কালশিটে আর রক্তে মাখামাখি। চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে বাইরে।
ভিড়ের মধ্যে থেকে একটা ফিসফিসানি কানে আসে সনাতনের, "বিজয়টা আজ বড্ড নেশা করেছিল…..পশুটার মারের চোটে মেয়েটা ….."
আর কিছু শুনতে পেলো না সনাতন। ওকে যেন কেউ পাখার সাথে উল্টো বেঁধে সুইচ অন করে দিয়েছে সেটার ,আর তাতেই ওর চারপাশের পৃথিবীটা এমন বনবন বনবন করে ঘুরতে শুরু করে দিয়েছে।
চোখের সামনে নুরের মৃতদেহটা ধীরে ধীরে যেন মিশে যেতে লাগলো ওর ছোটোদিদির সেই বনের মধ্যে খুবলে নেওয়া শরীরটার সাথে । কখনো আবার মনে হচ্ছে ওর মা , ওর মাই ঝুলছে নুরের ঘরের কড়িকাঠ থেকে।
পুলিশ একটা কালো প্লাস্টিকে মুড়িয়ে নুরের শরীরটা ভ্যানে তুলে নিয়ে চলে গেলো মর্গে । সেখানেই ওর শরীরের শেষ হিসাবটা হবে কাটা ছেঁড়া করে
ভিড়টা আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে এল। সনাতন শুধু একা দাঁড়িয়ে থাকলো সেই খোলা দরজাটার সামনে। ওর হাতের মুঠোয় ধরা একশো কুড়ি টাকাটা ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। ওটা এখন ওর কাছে কাগজ ছাড়া আর কিছু না। সনাতন ধীরে ধীরে হাঁটা লাগাল বাস স্টপের দিকে। ওর আর চা খাওয়া হলো না। নুরের ঘামে ভেজা পেটে মুখ লুকোনো হলো না। সনাতন বুঝতে পারল,মানুষগুলো ধীরে ধীরে কেমন যেনো আস্ত বো/কা/চো/* হয়ে উঠছে ।ও-ও তাদেরই দলে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!