প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসআল্লাহর কুদরত

গল্প ও উপন্যাস

আল্লাহর কুদরত

আল্লাহর কুদরত

🌿 আল্লাহর কুদরত ও অলৌকিক নিদর্শন: হযরত মারইয়াম (আ.) ও নবী ঈসা (আ.)-এর বিস্ময়কর কাহিনী ✨


বিজ্ঞাপন

### ১. ইবাদতের নির্জন কক্ষ ও আল্লাহর বিশেষ রিজিক


হযরত মারইয়াম (আ.) ছিলেন আল্লাহর এক নির্বাচিত ও পবিত্র বান্দী। শৈশব থেকেই তিনি নিজেকে মহান আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত করেছিলেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্র প্রকোষ্ঠে তাঁর দিন কাটত নামাজ, জিকির ও আল্লাহর স্মরণে।


তাঁর কাছে যখনই কেউ প্রবেশ করত, তখনই এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখতে পেত। তাঁর কাছে এমন রিজিক উপস্থিত থাকত, যা সাধারণ সময়ে পাওয়া যেত না। হযরত যাকারিয়া (আ.) যখন এই বিষয়টি দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেন, “হে মারইয়াম! কোথা থেকে এ রিজিক তোমার কাছে আসে?”


তিনি বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিতেন, “এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে।”


এই ঘটনা মানুষকে মনে করিয়ে দিত—আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা, রিজিক দান করেন।


### ২. জিবরাইল (আ.)-এর আগমন ও এক অলৌকিক সুসংবাদ


একদিন মারইয়াম (আ.) নির্জনে ইবাদতে মগ্ন ছিলেন। হঠাৎ তাঁর সামনে একজন মানুষের আকৃতিতে উপস্থিত হলেন হযরত জিবরাইল (আ.)। অপরিচিত একজন পুরুষকে দেখে তিনি ভীত হয়ে পড়লেন এবং আল্লাহর আশ্রয় চাইলেন।


তখন জিবরাইল (আ.) তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন, “আমি তো তোমার রবের পক্ষ থেকে প্রেরিত একজন দূত। আমি তোমাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিতে এসেছি।”


মারইয়াম (আ.) বিস্ময়ে বললেন, “আমার সন্তান হবে কীভাবে? কোনো মানুষ তো আমাকে স্পর্শ করেনি, আর আমি কোনো অসৎ নারীও নই!”


জিবরাইল (আ.) বললেন, “এটি তোমার রবের জন্য সহজ। তিনি যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন শুধু বলেন, ‘হও’, আর তা হয়ে যায়।”


এভাবেই আল্লাহর অসীম কুদরতে কোনো মানব পিতার স্পর্শ ছাড়াই মারইয়াম (আ.) গর্ভধারণ করলেন। এটি ছিল মানবজাতির জন্য এক অনন্য নিদর্শন।


### ৩. খেজুর গাছের ছায়ায় জন্ম ও শিশুর অলৌকিক বক্তব্য


গর্ভধারণের সময় পূর্ণ হলে মারইয়াম (আ.) লোকালয় থেকে দূরে এক নির্জন স্থানে চলে গেলেন। সেখানে প্রসববেদনা তাঁকে একটি খেজুর গাছের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল।


সেই কঠিন মুহূর্তে তিনি গভীর কষ্ট ও দুঃখে বললেন, “হায়! এর আগে যদি আমি মরে যেতাম এবং সম্পূর্ণ বিস্মৃত হতাম!”


কিন্তু আল্লাহ তাঁকে একা ছেড়ে দেননি। তাঁর নিচে একটি ঝরনা প্রবাহিত হলো এবং তাঁকে খেজুর গাছের কাণ্ড নাড়াতে বলা হলো, যাতে পাকা খেজুর তাঁর ওপর পড়ে। আল্লাহর রহমতে সেখানেই জন্ম নিলেন নবী ঈসা (আ.)।


শিশুকে কোলে নিয়ে মারইয়াম (আ.) যখন নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে এলেন, তখন লোকেরা নানা অপবাদ দিতে শুরু করল। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে তিনি কোনো জবাব না দিয়ে শিশুর দিকে ইশারা করলেন।


লোকেরা অবাক হয়ে বলল, “আমরা কীভাবে একটি নবজাতকের সঙ্গে কথা বলব?”


ঠিক তখনই আল্লাহর কুদরতে শিশু ঈসা (আ.) কথা বলে উঠলেন:


> “নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন।”


এই অলৌকিক বক্তব্য মারইয়াম (আ.)-এর পবিত্রতার এক মহান প্রমাণ হয়ে দাঁড়াল।


### ৪. মরুভূমিতে এক পুরনো খুলি ও দুনিয়ার অহংকারের পরিণতি


হযরত ঈসা (আ.) ছিলেন আল্লাহর মহান নবী। আল্লাহ তাঁকে বহু মুজেজা দান করেছিলেন। লোকমুখে প্রচলিত একটি শিক্ষামূলক বর্ণনায় বলা হয়, একদিন তিনি তাঁর হাওয়ারীদের সঙ্গে মরুভূমির পথে চলছিলেন।


পথে তাঁরা একটি পুরনো মানুষের খুলি দেখতে পেলেন। ঈসা (আ.) আল্লাহর অনুমতিতে সেই খুলিকে কথা বলার নির্দেশ দিলেন। তখন খুলিটি নিজের পরিচয় দিতে শুরু করল।


সে জানাল, একসময় সে ছিল এক শক্তিশালী ও ধনবান রাজা। তার ছিল বিশাল রাজত্ব, অঢেল সম্পদ এবং অসংখ্য মানুষের আনুগত্য। কিন্তু ক্ষমতার অহংকারে সে নিজের স্রষ্টাকে ভুলে গিয়েছিল।


একদিন মৃত্যুর ফেরেশতা তার কাছে এলেন। মুহূর্তের মধ্যেই তার রাজত্ব, সম্পদ ও সম্মান সব শেষ হয়ে গেল। আজ সে পড়ে আছে মাটির নিচে, আর তার অতীতের গৌরবের কোনো চিহ্ন নেই।


খুলিটি আক্ষেপ করে বলল:


> “দুনিয়ার যে রাজত্ব নিয়ে আমি অহংকার করতাম, আজ তা আমার কোনো কাজে আসছে না। আমি যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম, তবে আজ আমার পরিণতি অন্যরকম হতো।”


এই কথা শুনে ঈসা (আ.)-এর শিষ্যরা গভীরভাবে চিন্তিত হয়ে পড়লেন।


### ৫. তওবা, পুনর্জীবন ও জীবনের প্রকৃত সফলতা


প্রচলিত বর্ণনায় আরও বলা হয়, এই ঘটনার পর হযরত ঈসা (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, যেন ওই ব্যক্তি নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং তওবার সুযোগ পায়।


আল্লাহর হুকুমে সেই মৃত ব্যক্তি পুনরায় জীবিত হয়ে উঠল। জীবিত হওয়ার পর সে নিজের অতীতের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হলো এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইল। এরপর সে দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে বাকি জীবন আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।


এই ঘটনা হাওয়ারীদের মনে গভীর শিক্ষা সৃষ্টি করল—দুনিয়ার জীবন যতই দীর্ঘ হোক, মৃত্যুর পর মানুষের সঙ্গে থাকে কেবল তার আমল।


### 💡 কাহিনীর মূল শিক্ষা


পবিত্রতার মর্যাদা: হযরত মারইয়াম (আ.)-এর জীবন শেখায়, আল্লাহর ওপর ভরসা ও চরিত্রের পবিত্রতা মানুষকে সম্মানিত করে।


আল্লাহর অসীম ক্ষমতা: ঈসা (আ.)-এর অলৌকিক জন্ম ও তাঁর হাতে সংঘটিত মুজেজাগুলো আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন।


দুনিয়ার মোহ ক্ষণস্থায়ী: রাজত্ব, সম্পদ ও ক্ষমতা মৃত্যুর পর কোনো কাজে আসে না।


তওবার দরজা খোলা: মানুষ যত বড় ভুলই করুক, আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা উচিত।


প্রকৃত সফলতা: দুনিয়ার সম্মান নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখেরাতের সফলতাই মানুষের জীবনের আসল অর্জন।


আল্লাহ আমাদের সবাইকে হযরত মারইয়াম (আ.)-এর পবিত্রতা, ঈসা (আ.)-এর আনুগত্য এবং দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

০ মন্তব্য · ৩৪ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!