প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসমাতলার মায়াজাল

গল্প ও উপন্যাস

মাতলার মায়াজাল

মাতলার মায়াজাল

সুন্দরবনকে দূর থেকে দেখলে মনে হয়, এ যেন শুধু জল আর সবুজের এক বিশাল দেশ। নদীর দুই পারে গাছের সারি, কেওড়া-গরানের জটিল শিকড়, কোথাও সুন্দরী গাছের মাথা ছুঁয়ে থাকা আকাশ—সব মিলিয়ে এক অপার শান্তি। কিন্তু সেই শান্তির ভিতরেই কোথায় যেন একটা অদৃশ্য ভয় লুকিয়ে থাকে। সুন্দরবনে গেলে এই কথাটা খুব সহজেই বোঝা যায়।


বিজ্ঞাপন

গত বছর সুন্দরবনে গিয়েছিলাম। দিনের বেলা নৌকা যখন সরু খাঁড়ির ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল, তখন চারপাশের দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সমস্ত শব্দ যেন এই অরণ্যের কাছে এসে ধীরে ধীরে থেমে যায়। কাদামাটির গন্ধ, ভেজা পাতার গন্ধ, দূরে কোথাও নাম-না-জানা পাখির ডাক—তার মাঝখানে কালচে জল নিঃশব্দে বয়ে চলেছে। জোয়ার এলে সেই জল আবার অন্য রূপ নেয়। যে চর কিছুক্ষণ আগে চোখের সামনে ছিল, সেটি ধীরে ধীরে জলের নিচে ডুবে যায়। যে সরু খাঁড়িটাকে মনে হয়েছিল একেবারে সোজা, একটু পরেই দেখা যায় সেটি কোথায় যেন বাঁক নিয়ে অরণ্যের গভীরে ঢুকে গেছে।


সুন্দরবনে তখন আমার সঙ্গে যে মাঝিটি ছিল, সে ছিল বয়স্ক এক মানুষ। বয়স কত হবে ঠিক বলতে পারব না। রোদে পোড়া মুখ, মাথায় সাদা কাপড়, আর চোখদুটো আশ্চর্য রকমের স্থির। বহু বছর ধরে নাকি এই নদীপথে মানুষ পারাপার করিয়েছে। বহু রকমের অভিজ্ঞতা তাঁর। পুরো রাস্তাটায় সেই বৃদ্ধ মাঝির সাথে নানান রকমের গল্প চলছিল। কোন কোন খাঁড়ি তে উনি মাছ ধরেছেন, কত বার বাঘ দেখতে পেয়েছেন- সেই সব গল্প। 

দেখতে দেখতে শীতের হালকা রোদের আভাস টুকুও পশ্চিম আকাশের গা থেকে মুছে গেলো। দুপাশের ঘন বন অন্ধকারের মধ্যে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে লাগলো।


সন্ধ্যার পর নৌকা যখন ফিরছিল, তখন নদীর উপর হঠাৎ কুয়াশা নামতে শুরু করল। আর ঠিক সেই সময় বুঝলাম না কেন বৃদ্ধ মাঝিটি হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করে দিলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী হল?” সে কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে থেকে বললো, “এই নদীতে রাত হলে বেশি কথা কইতে নাই।” তারপর একটু থেমে বললো, “মাতলা নদীর একটা কাহিনি আছে। অনেক পুরনো কাহিনি। আমার বাপের মুখে শুনছি, তারও আগে যারা ছিল, তারাও নাকি জানত।” আমার মনে কৌতূহল জেগে উঠল। আমি অনেকটা জোর করেই গল্পটা শুনতে চাইলাম। বৃদ্ধ মাঝিটি তখন ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল। আর আজ তোমাদের সেই গল্পটাই বলছি—তার মুখে, তার ভাষায়।


“ঘটনাটা বেশ কয়েক বছর আগের। ঝড়খালি অঞ্চলের তিনজন জেলে ছিল—সনাতন, তার ভাগ্নে পঙ্কজ আর রহমত। সনাতন ছিল সবচেয়ে বয়স্ক। নদী আর জঙ্গল চিনত হাতের রেখার মতো। কোন খাঁড়িতে কখন জোয়ার ঢোকে, কোথায় কুমির থাকে, কোন জায়গায় বাঘ নামতে পারে—এসব তার মুখস্থ ছিল। পঙ্কজ ছিল তার ভাগ্নে। বয়সে তরুণ, কিন্তু মামার সঙ্গে বহুবার সুন্দরবনে গেছে। আর রহমত ছিল সবচেয়ে কমবয়সি। জলে তার হাত ভালো ছিল, জাল ফেলতে পারত চমৎকার। সেইবার তারা তিনজন একটা ছোট কাঠের নৌকা নিয়ে মাছ আর কাঁকড়া ধরতে বেরিয়েছিল। দিনটা ছিল কার্তিক মাসের অমাবস্যা। কার্তিকের শেষ দিকের সেই রাতগুলোতে সুন্দরবনের বাতাসে একটা আলাদা শীত থাকে। দিনের গরম তখন অনেকটাই কমে আসে। সন্ধ্যার পর নদীর উপর হালকা কুয়াশা নামে। আর অমাবস্যায় তো কথাই নেই। চাঁদ থাকে না। আকাশ থাকে কালো। বনের ভিতর থেকে তখন শুধু অদৃশ্য প্রাণীদের শব্দ আসে। সেই রাতে তিনজন একটা নির্জন খাঁড়িতে নৌকা বেঁধেছিল। দিনের আলো থাকতে তারা মাছ ধরেছিল। সন্ধ্যার পরও কিছুক্ষণ জাল ফেলেছিল। তারপর ধীরে ধীরে চারদিক শান্ত হয়ে এলে সনাতন সবাইকে বলেছিল—‘এবার চুপ করে বস।’


সুন্দরবনের জেলেদের একটা নিয়ম আছে। গভীর রাতে যখন চারদিক একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে যায়, তখন নৌকার আলো নিভিয়ে দিতে হয়। খুব দরকার না হলে কেউ কথা বলে না। কারণ এই বনে আলো আর শব্দেরও বিপদ আছে। জঙ্গলের ধারে বাঘ ওত পেতে থাকতে পারে। নদীর কালো জলে কুমির ভেসে থাকতে পারে। আর রাতের সুন্দরবনে কোথা থেকে কী ভেসে আসবে—তা কেউ জানে না। সনাতন এসব জানত। তাই সে নৌকার আলো নিভিয়ে দিয়েছিল। তিনজন তখন অন্ধকারের মধ্যে বসে ছিল। চারদিকে শুধু নদী। আর বন। মাঝে মাঝে দূরে কোথাও একটা রাতপাখি ডেকে উঠছিল। তারপর আবার সব চুপ। এমন চুপ যে নিজেদের শ্বাসের শব্দও কানে আসছিল। রাত তখন কত হবে ঠিক জানি না। তবে সনাতন পরে বলেছিল, আনুমানিক দুটো।


হঠাৎ রহমত বলল—‘মামা...’ সনাতন উত্তর দিল না। রহমত আবার বলল—‘কিছু একটা শব্দ হচ্ছে।’ সনাতন কান খাড়া করল। প্রথমে সে কিছু শুনতে পেল না। তারপর—ছলাৎ... একটু পরে আবার—ছলাৎ... জলের উপর যেন কোনো ছোট নৌকার গা ঘেঁষে জল কেটে যাওয়ার শব্দ। সনাতন মাথা তুলে তাকাল। কুয়াশা তখন নদীর উপর ঘন হয়ে এসেছে। সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর দেখতে পেল—কুয়াশার ভিতর থেকে একটা নৌকা আসছে। ছোট্ট একটা ডিঙি। এত পুরনো যে মনে হচ্ছিল, যেকোনো মুহূর্তে তার কাঠ ভেঙে নদীর মধ্যে ডুবে যাবে। কিন্তু আশ্চর্যের কথা জানো কী? নৌকাটায় কোনো দাঁড় নেই। কোনো লগি নেই। তবু নৌকাটা স্রোতের উল্টো দিকে আসছিল। সনাতনের বুকের ভিতর তখনই কেমন করে উঠেছিল।

নৌকার মাঝখানে একজন বুড়ো মানুষ বসে ছিল। গায়ে ছেঁড়া ফতুয়া। মাথায় কাপড় বাঁধা। সে একমনে জাল ফেলছে। আবার তুলছে। জল থেকে জাল উঠছে, কিন্তু তার মধ্যে মাছ আছে কি না—দূর থেকে বোঝা যাচ্ছিল না। 


নৌকাটা আরও কাছে এল। সনাতন তখন পঙ্কজ আর রহমতকে খুব আস্তে বলল—‘কেউ কথা কইস না।’ বুড়ো মানুষটা যেন কথাটা শুনতে পেল। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার মুখটা কুয়াশায় ঢাকা। চোখ-মুখ কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। তারপর সে ডাকল—‘ওরে রহমত...’ রহমত হঠাৎ উঠে বসে পড়ল। সনাতন তার দিকে তাকাল। বুড়ো আবার ডাকল—‘ওরে পঙ্কজ...’ পঙ্কজের হাত থেকে জালের দড়ি ছুটে গেল। বুড়োর গলাটা খুব চেনা। এমন চেনা, যেন বহুদিনের আপন কেউ অন্ধকারের ওপার থেকে ডাকছে।

তারপর বুড়ো বলল—‘এদিকে আয় রে...’ কথাটা খুব আস্তে বলেছিল। কিন্তু নদীর উপর সেই গলা যেন অদ্ভুতভাবে পরিষ্কার শোনা গেল। ‘এই খাঁড়িতে মাছ নাই রে। সব মাছ ভেতরের বড় গাঙে চলে গেছে।’ একটু থেমে আবার বলল—‘আমার নৌকার পেছনে পেছনে আয়। তোদের জাল মাছে ভরে দেব।’ রহমত তখন উঠে দাঁড়িয়েছে। পঙ্কজ দাঁড় হাতে নিয়েছে। সনাতন বলল—‘কোথায় যাস?’ কেউ উত্তর দিল না। দুজনের চোখ তখন সেই বুড়োর নৌকার দিকে। যেন তারা আর নিজেদের মধ্যে নেই। যেন কেউ তাদের মনের ভিতর থেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পঙ্কজ নোঙরের দড়ি খুলতে গেল। রহমত দাঁড় হাতে নিল।

আর সেই সময় সনাতনের মনে পড়ল পুরনো কথা। সুন্দরবনের বয়স্ক জেলেরা বলে—রাতে বনের ভিতর থেকে যদি কেউ আপন মানুষের গলায় ডাকে, সেই ডাকে সাড়া দিতে নেই। কারণ সবসময় যে মানুষ ডাকে, তা নয়। সনাতন আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। তার কোমরের কাছে একটা ছোট পাত্রে মন্ত্রপূত জল রাখা ছিল। বনে যাওয়ার আগে গুনিনের কাছ থেকে সে জল নিয়েছিল। সে বনবিবির নাম নিল। তারপর মন্ত্র পড়ে সেই জল রহমত আর পঙ্কজের মুখে ছিটিয়ে দিল। দুজন যেন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠল। রহমত হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—‘আমি... কোথায় যাচ্ছিলাম?’ পঙ্কজ কিছু বলতে পারল না। সনাতন তখন পাত্রের বাকি জলটা সেই রহস্যময় নৌকার দিকে ছুড়ে দিল।


আর তারপর—যা হল, তা দেখে তিনজনেরই বুকের রক্ত যেন জমে গেল। এক মুহূর্ত আগেও যেখানে নৌকাটা ছিল—সেখানে কিছুই নেই। কোনো ডিঙি নেই। কোনো বুড়ো নেই। শুধু কুয়াশা। আর নদী। কিন্তু তখনই পঙ্কজ চিৎকার করে উঠল—‘মামা!’ সনাতন তাকিয়ে দেখল—তাদের নিজেদের নৌকা কখন যে স্রোতের টানে খাঁড়ির আরও ভিতরে চলে এসেছে, তারা কেউ টেরই পায়নি। নৌকার একেবারে সামনে তখন ম্যানগ্রোভের কালো জঙ্গল। কাদার উপর জট পাকিয়ে আছে গাছের শিকড়। আর সেই শিকড়ের পাশে—যেখানে একটু আগেও তারা বুড়ো জেলেটার নৌকা দেখেছিল—সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা বাঘ। বিশাল এক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার।

একেবারে স্থির। নড়ছে না। শুধু তার চোখ দুটো জ্বলছে। অন্ধকারের ভিতর দুটো আগুনের মতো। তিনজন কেউ কথা বলছিল না। বাঘটাও তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, সে যেন অপেক্ষা করছিল। আর যদি সনাতন সেই জল না ছিটাত—তাহলে হয়তো তিনজনের নৌকা আরও একটু ভিতরে যেত। আর তারপর... কী হত, তা আর কেউ কোনোদিন জানতে পারত না।


হঠাৎ বাঘটা মাথা তুলল। তারপর এমন একটা গর্জন করল—মনে হল পুরো বন কেঁপে উঠল। মাতলা নদীর জল পর্যন্ত যেন সেই শব্দে কেঁপে উঠল। রহমত চোখ বন্ধ করে ফেলল। পঙ্কজ সনাতনের হাত আঁকড়ে ধরল। আর পরের মুহূর্তেই—বাঘটা এক লাফে অন্ধকার ম্যানগ্রোভের ভিতর ঢুকে গেল। তারপর আবার সব চুপ। শুধু নদীর জল। ছলাৎ... ছলাৎ... যেন কিছুই হয়নি।


সেই রাতের পর তারা আর ওই খাঁড়িতে কোনোদিন মাছ ধরতে যায়নি। কিন্তু ঘটনাটা সেখানেই শেষ হয়নি। আমাদের জেলেপাড়ায় পুরনো একটা কথা আছে। বহু বছর আগে নাকি মাতলা নদীতে এক বুড়ো জেলে বাঘের আক্রমণে মারা গিয়েছিল। তারপর থেকে অমাবস্যার গভীর রাতে মাঝে মাঝে নাকি নদীর উপর একটা পুরনো ডিঙি দেখা যায়। দাঁড় নেই। তবু নৌকা চলে। আর নৌকার মধ্যে বসে থাকা সেই বুড়ো জেলে জাল ফেলে। তারপর কাউকে না কাউকে নাম ধরে ডাকে। কখনও রহমত। কখনও পঙ্কজ। কখনও অন্য কারও নাম।

সে ডাকে একটা অদ্ভুত টান থাকে। আপন মানুষের গলার মতো। তাই ভুল হয়। লোকজন বলে, ওটা নাকি সেই মৃত জেলের আত্মা। আবার কেউ বলে, ওটা বাঘের মায়া। বাঘ নাকি মানুষকে নিজের কাছে টেনে নেওয়ার জন্য এমন মায়া দেখায়। কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যে—তা আমি জানি না। কিন্তু একটা কথা জানি। সুন্দরবনের নদীতে রাতের বেলা যদি কোনো নৌকা দেখতে পাও, আর সেই নৌকা যদি স্রোতের উল্টো দিকে চলে—তার কাছে যেও না। আর যদি কুয়াশার ভিতর থেকে কেউ তোমার নাম ধরে ডাকে—কোনো উত্তর দিও না।

কারণ সুন্দরবনে সব ডাক মানুষের ডাক নয়। কিছু ডাক নদীর। কিছু ডাক বনের। আর কিছু ডাক... ফিরে আসার পথ বন্ধ করে দেয়।


সেদিন সনাতন, পঙ্কজ আর রহমত বেঁচে ফিরেছিল। হয়তো তারা ভাগ্যবান ছিল। হয়তো বনবিবির কৃপা ছিল তাদের উপর। কিন্তু সুন্দরবনের অরণ্য আর নদী সবাইকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না। ওই ঘটনার পরেও নাকি সেই খাঁড়ির আশেপাশে বহুবার অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। রাতের অন্ধকারে মাছ ধরতে গিয়ে অনেক জেলে আর কোনোদিন ফিরে আসেনি। কারও নৌকা পাওয়া গেছে—মানুষ পাওয়া যায়নি। কারও জাল ভেসে উঠেছে নদীর জলে, কারও দাঁড় কাদার চরে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কিন্তু সেই মানুষগুলোর শেষ পরিণতি কী হয়েছিল, তারা কোথায় হারিয়ে গেল—তার উত্তর আজও কেউ জানে না। কেউ তাদের মৃত্যুর আসল কারণ জানতে পারেনি। বাঘের পেটে গিয়েছিল? জোয়ারের কালো জলে তলিয়ে গিয়েছিল? নাকি সেই অন্ধকারের মধ্যে কোনো এক অদৃশ্য ডাক অনুসরণ করে তারা নিজেরাই চলে গিয়েছিল বনের আরও গভীরে? তার উত্তর মাতলা কোনোদিন দেয়নি।


আজও কার্তিকের অমাবস্যার রাতে, যখন নদীর উপর কুয়াশা নামে আর চারদিকের বন নিঃশব্দ হয়ে যায়, তখন নাকি ওই খাঁড়ির দিক থেকে কখনও কখনও ভেসে আসে দাঁড় টানার শব্দ—ছলাৎ… ছলাৎ… তারপর একটা বুড়ো গলা… খুব আপন, খুব পরিচিত… কাউকে নাম ধরে ডাকছে। তখন সুন্দরবনের পুরনো জেলেরা নৌকার আলো নিভিয়ে দেয়। কেউ কথা বলে না। কেউ নদীর দিকে তাকায় না। কারণ তারা জানে—যারা সেদিন বেঁচে ফিরেছিল, তারা হয়তো ভাগ্যবান ছিল। কিন্তু সুন্দরবনে সবাই এতটা ভাগ্যবান নয়। আর মাতলার কালো জলের নিচে আজও হয়তো এমন কিছু রহস্য ঘুমিয়ে আছে, যার সত্যিটা কোনো মানুষ কোনোদিন জানতে পারবে না। হয়তো সেই কারণেই সুন্দরবনের মানুষ রাতের নদীকে ভয় পায় না—সম্মান করে। কারণ তারা জানে, বনের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্প শেষ হয়ে যায় না… কখনও কখনও সেই গল্পই ফিরে আসে কুয়াশার ভেতর থেকে—অন্য কারও নাম ধরে ডাকতে।”


বৃদ্ধ মাঝিটি এই পর্যন্ত বলে থেমে গিয়েছিল। তখন সন্ধ্যা আরও ঘন হয়ে এসেছে। নৌকাটা মাতলার বুক চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিল। চারপাশে কুয়াশা। দূরের গাছগুলো ক্রমশ অন্ধকারের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম। তারপর হঠাৎ নদীর ওপার থেকে একটা শব্দ এল।

ছলাৎ...

বৃদ্ধ মাঝিটি সঙ্গে সঙ্গে বৈঠা থামিয়ে দিল। আমি তাকিয়ে দেখলাম। কুয়াশার ভিতর সত্যিই যেন একটা কালো ছায়া নড়ল। আমি কিছু বলার আগেই বৃদ্ধ মাঝিটি খুব নিচু গলায় বলল—“চুপ...” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “নাম ধইরা ডাকলে কিন্তু জবাব দিও না।”

সেই মুহূর্তে কেন জানি না, আমার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল। আর মাতলার কালো জলের দিকে তাকিয়ে মনে হল—কুয়াশার আড়ালে কোথাও একটা পুরনো ডিঙি ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে। তার কোনো দাঁড় নেই। কোনো মাঝি নেই। তবু সে এগিয়ে চলেছে। অন্ধকারের আরও গভীরে।

আর যদি খুব মন দিয়ে শোনা যায়—হয়তো সেই নৌকা থেকেই ভেসে আসছে কারও ফিসফিসে ডাক। খুব পরিচিত একটি গলা। আপনার নিজের নাম ধরে।

সুন্দরবনের মানুষ তাই বলে— রাতের সুন্দরবনকে কখনও বিশ্বাস কোরো না।

কারণ দিনের আলোয় যে বন তোমাকে মুগ্ধ করে, রাত নামলে সেই বনই তোমাকে এমন এক মায়ার মধ্যে ডেকে নিতে পারে—যেখান থেকে ফিরে আসার পথ হয়তো আর কোনোদিন খুঁজে পাবে না।

সেই মায়ার নাম—মাতলার মায়াজাল।


০ মন্তব্য · ৬৬ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!