জলে গিয়াছিলাম সই। অনেক বাক্যব্যয়ের পর আমাকে নিয়ে যাওয়া হল।
ভোরে রওনা হয়ে চামড়াঘাট থেকে যখন স্টিলের নৌকায় চড়ে বসলাম, তখন অন্যান্য ঘাটের মতই লাগছিল। নৌকা যখন ঘুরল, বিস্ময়ে আমার চক্ষু তখন চড়কগাছ। চারদিকে থইথই পানি, রূপালি স্যাটিনের কাপড়ের মত বিছানো আদ্যপান্ত। যেন যাত্রা করছি অসীমের দিকে। ইঞ্জিনের ঘটঘট শব্দ আর চারদিকের চরাচরের স্তব্ধ নির্জনতা। সময় যেন স্থির হয়ে গেছে। অথই বিস্তৃত জলরাশির মধ্যে দিগবিদিকজ্ঞানশূন্য সবাই। খুঁজে চলেছে এর শেষটা। টাওয়ারের উপর এরিয়াল মার্কার বলগুলো দেখে পোকেমন বল বলে কতক্ষণ চেঁচিয়েছি। বারবার ঢেউয়ের ছন্দ দেখে একটি কবিতাই মনে"জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,ওরে উথলি উঠেছে বারি,
ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি পানির মাঝে কোন বিষন্নতার সুর বাজে কী? তাহলে কেন বারবার ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করছিল?
এক ঘণ্টার মত সময় পার হওয়ার পর যখন মিঠামইন পৌঁছলাম, তখন গনগনে সূর্য মাথার উপর। গার্ডিয়ানরা রিকশা ঠিক করার পর ইটনার দিকে যাত্রা। উত্তপ্ত কড়াইয়ের মাঝে চলেছি যেন। চারদিকে পানি, পানির মাঝে অসাধারণ রাস্তা, নেই বড় গাড়িঘোড়ার আধিপত্য। পানির মাঝে ছোট ছোট দ্বীপের মতন ঘর। কখনোবা এই বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোর দেখা মেলাও দুষ্কর। একটি মেয়ে গোসল করছিল। এলোচুলে গোলাপি প্রিন্টের শাড়ি বসন, একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে চেয়ে চলেছি। শ্রাবণ মেঘের দিনের গন্ধ পাচ্ছিলাম কেমন একটা। সেই ভাটির "একটা ছিলো সোনার কন্যা
মেঘ বরণ কেশ
ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কন্যার দেশ
দুই চোখে তার আহারে কি মায়ানদীর জলে পরলো কন্যার ছায়া।রূপার প্রলেপ দেয়া প্রান্তরে যেতে যেতে হঠাত হঠাত ব্রিজ পড়ছিল, সবাই রিকশা থামিয়ে থামিয়ে ছবি তুলে নিচ্ছিল। আমাদের সামনের আঙ্কেল টানা আধ ঘণ্টা এই পানির দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করেছিলেন। পরপর একই ছবির পুনরাবৃত্তি। কাস্তুল বাজারে মহিষের দুধের তৈরি(!) রসমালাই খেয়ে আবার ঐ একই হাওড়ের দিকে যাত্রা। কোত্থেকে কোথায় গিয়েছি কিছু বলতে পারব না। দিশেহারা নাবিকের মত ভ্রমণ। পংগপালের মত ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে সোয়ালো। মাঝে মাঝে ধইনচার ক্ষুদ্রাঞ্চল। এত বক আর হাঁস জীবনে একসাথে দেখিনি বলছি। চোখ ঝলসানো চকচকে পানির মাঝখানে তপ্ত মধ্যাহ্নে যখন ছাই থেকে কয়লা হয়ে গিয়েছি, তখন দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য গেলাম। কী অদ্ভুত রেস্তোরার নাম, "পাঁচফোড়ন", "কাঁচা লঙ্কা"। বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলতে গেলে এগুলোতে খাবারের জন্য সিরিয়াল দিতে হয় এমন উপচে পড়া ভিড়। তবে খাবার ছিল সেই অনাড়ম্বরই।
এরপর আবার অটোতে করে অষ্টগ্রামের দিকে যাত্রা। আবারো সেই জেলেদের মাছ ধরা, ছোট বাচচাদের সাঁতার কাটা দেখে ওদের দিকে হাত নাড়ছিলাম, ওরাও হাই দিচ্ছিল। চারদিকের পানি যেন দিগন্তে গিয়ে মিশেছে। নীল আকাশ আর পেঁজা তুলোর প্রতিচ্ছবি স্বচ্ছ পানির ওপর, নীলাম্বরী শরীরের একটা অংশে দুলে যাওয়া শুধু। সূর্যাস্তের সময় আকাশের ক্যানভাস গাড় নীল, বেগুনি আর কমলা সূর্যের অস্তমান দৃশ্য, গায়ে কাঁটা দেয়ার মত সুন্দর। পড়ন্ত বিকেলের শেষের দিকে সবার যেন ফিরে যাওয়ার কী তাড়া। ভয় ছিল? মস্ত জলার মাঝে রাস্ত"So, I say a little prayer
And hope my dreams will take me there
Where the skies are blue
To see you once again, my love
Overseas, from coast to coast
To find a place I love the most
Where the fields are green
To see you once again
My love"
সময়ের সল্পতার জন্য পানিতে পা ডুবিয়ে আসতেও পারিনি। জীবনের সব লেনদেন শেষে ফেরার সময় গোধূলির আশ্চর্য সৌন্দর্যে বিমোহিত হওয়ার পালা। রাত নেমে এসেছে ততক্ষণে। সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বলে সবাই মন্ত্রণা দিয়ে গেলেন, নৌকা ডুবে গেলে ভেসে থাকার চেষ্টা করতে, আতঙ্কিত না হতে। মাথার উপর তারাভরা আকাশ, ভয়, দুঃখ, আনন্দ আর নিঃসঙ্গতার সংসর্গে মেশান অনুবিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে চোখের চশমাটা খুলে হাতে নিলাম, অতঃপর, সব ঝাপসা।তবে, হাওড় থেকে আসার সময় এই কাব্যিক ভাব আমার একদম ছিল না। বাসা থেকে মাত্র আধ ঘণ্টা দূরে থাকা অবস্থায় এমন মাথা ঘোরানো আর অস্বস্তিতে নিজের উপর কিল-ঘুষি মারতে শুরু করেছি। গাড়িতে দম বন্ধ হয়ে আসছিল, এসির বাতাসে লাগে ঠাণ্ডা আর এসি অফ করলে এমন গরম- ভয়াবহ। মোশন সিকনেস তার খেল দেখিয়ে দিল।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!