প্রথম পাতাভ্রমণস্বপ্নের পথে অরন্যবাসে

ভ্রমণ

স্বপ্নের পথে অরন্যবাসে

স্বপ্নের পথে অরন্যবাসে

অরণ্যবাস রিসোর্টে পরিবারের সঙ্গে একদিন

সেদিন আমি ও আমার পরিবার মিলে বেরিয়ে পড়লাম গাজীপুরের অরণ্যবাস রিসোর্টের উদ্দেশে। অনেক দিন পর সবাই একসঙ্গে কোথাও ঘুরতে যাচ্ছি, তাই সকাল থেকেই সবার মধ্যে ছিল অন্যরকম আনন্দ। ছোটদের উৎসাহ ছিল সবচেয়ে বেশি। কেউ ব্যস্ত ছিল প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছাতে, কেউ আবার ভাবছিল রিসোর্টে গিয়ে কী কী করা হবে। তাদের আনন্দ দেখে আমাদেরও মন ভালো হয়ে যাচ্ছিল।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা থেকে গাজীপুর পর্যন্ত পথ বেশ ভালোভাবেই পাড়ি দিলাম। গাড়ির ভেতরে চলছিল গল্প, হাসি-ঠাট্টা আর নানা পরিকল্পনা। কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে রাস্তার দৃশ্য দেখছিল, আবার কেউ মোবাইলে ছবি তুলছিল। মনে হচ্ছিল, ভ্রমণটা শুরু হওয়ার আগেই আনন্দের একটা বড় অংশ আমরা পেয়ে গেছি।

কিন্তু গাজীপুর শহর পেরিয়ে অরণ্যবাস রিসোর্টের দিকে এগোতেই পরিস্থিতি বদলে গেল। রাস্তা ধীরে ধীরে ভাঙাচোরা হতে শুরু করল। কোথাও বড় বড় গর্ত, কোথাও উঠে যাওয়া পিচ, আবার কোথাও ধুলোমাখা এবড়োখেবড়ো পথ। গাড়ি একটু এগোলেই এমন ঝাঁকুনি দিচ্ছিল যে আমাদের হাসি-ঠাট্টার মাঝেও হঠাৎ সবাই চুপ হয়ে যাচ্ছিল।

মা বারবার বলছিলেন, “আর কত দূর? রাস্তাটা তো শেষই হচ্ছে না!” বাবা মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালানোর পথ দেখছিলেন আর গর্ত এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কখনো তিনি মজা করে বলছিলেন, “এটা তো রিসোর্টে যাওয়ার রাস্তা নয়, অ্যাডভেঞ্চারে যাওয়ার রাস্তা!” তাঁর কথা শুনে আমরা আবার হেসে উঠছিলাম।

ছোটরা প্রথমে জানালার বাইরে তাকিয়ে আনন্দ করলেও কিছুক্ষণ পর তাদের মুখেও বিরক্তি ফুটে উঠল। কেউ বলছিল, “আমরা কি এখনও পৌঁছাইনি?” আবার কেউ গন্তব্যে গিয়ে কী করবে, সেই পরিকল্পনা করতে করতে পথের কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করছিল। পরিবারের একজনের বিরক্তি আরেকজনের মজার কথায় কিছুটা কমে যাচ্ছিল। এভাবেই হাসি, অভিযোগ আর গল্পের মধ্য দিয়ে আমরা এগিয়ে চলছিলাম।

অবশেষে অনেক ঝাঁকুনি, ধুলোমাটি আর ভাঙাচোরা রাস্তা পেরিয়ে আমরা পৌঁছালাম অরণ্যবাস রিসোর্টে।

রিসোর্টে প্রথম স্বাগত

গাড়ি থেকে নামতেই যেন আমাদের সব ক্লান্তি কিছুটা কমে গেল। রিসোর্টের কর্মীরা হাসিমুখে আমাদের স্বাগত জানালেন। হাতে তুলে দিলেন স্বাগত ড্রিংস। ঠান্ডা পানীয়ের গ্লাস হাতে নিয়ে আমরা সবাই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেলাম। এতক্ষণকার পথের কষ্টের পর এই ছোট্ট আপ্যায়নটুকুও আমাদের কাছে বেশ আনন্দের মনে হলো।

এরপর রিসোর্টের ভেতরে ঢুকে আমরা প্রথমে একটি রুমে গেলাম। সবাই ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। ছোটরা অবশ্য বেশিক্ষণ রুমে থাকতে চাইল না। তারা বাইরে গিয়ে চারপাশ দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমরাও ভাবলাম, এত সুন্দর জায়গায় এসে শুধু রুমে বসে থাকলে তো চলবে না!

প্রকৃতির মাঝে কিছু সুন্দর সময়

ফ্রেশ হয়ে আমরা রিসোর্টের ভেতরে ঘুরতে বের হলাম। চারপাশের পরিবেশ ছিল বেশ সুন্দর ও মনোরম। সেখানে ছিল একটি পুকুর, বিশাল সবুজ মাঠ আর ঘন গাছপালায় ঘেরা বন। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে এমন নিরিবিলি পরিবেশে এসে সবার মন ভালো হয়ে গেল।

পুকুরের পানিতে রোদের ঝিলিক, মাঠের সবুজ ঘাস আর বনের গাছপালার ছায়া—সব মিলিয়ে জায়গাটির মধ্যে ছিল এক ধরনের শান্তি। কেউ ছবি তুলছিল, কেউ পরিবারের সঙ্গে গল্প করছিল, আবার কেউ ছোটদের সঙ্গে মাঠে হাঁটছিল। ছোটরা কখনো এদিক-ওদিক ছুটছিল, কখনো আবার সবাইকে ডেকে বলছিল, “এখানে আসো, ছবি তুলি!”

পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে হাসতে দেখে মনে হচ্ছিল, এই ভ্রমণের আসল আনন্দ কোনো দামি আয়োজনের মধ্যে নয়; বরং প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে এমন সহজ-সুন্দর সময় কাটানোর মধ্যেই।

সুইমিং পুলে দুপুরের আনন্দ

কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করার পর আমরা দুপুরের দিকে সুইমিং পুলে গেলাম। পানিতে নামার আগেই ছোটদের মধ্যে শুরু হয়ে গেল আনন্দ আর উত্তেজনা। কেউ সাঁতারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কেউ আবার অন্যদের পানিতে নামার জন্য ডাকছিল।

পুলে নামার পর যেন সবাই আবার ছোট হয়ে গেলাম। পানিতে সাঁতার কাটা, একে অপরের সঙ্গে মজা করা, হাসাহাসি—সব মিলিয়ে সময়টা বেশ আনন্দে কেটে গেল। পরিবারের সবাই নিজেদের মতো করে আনন্দ করছিল, আর সেই আনন্দে একে অপরকে আরও কাছে পাওয়া যাচ্ছিল।

পথের কষ্ট, ক্লান্তি, শহরের ব্যস্ততা—সবকিছু যেন পানির সঙ্গে ধুয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর যখন পুল থেকে উঠলাম, তখন শরীর ক্লান্ত হলেও মন ছিল ভীষণ ভালো।

দুপুরের খাবার ও শেষ বিকেলের আনন্দ

সাঁতার কাটার পর ক্ষুধাও বেশ বেড়ে গিয়েছিল। তাই সবাই মিলে দুপুরের খাবার খেতে গেলাম। সারাদিনের ঘোরাঘুরি আর সাঁতারের পর খাবারটা যেন আরও সুস্বাদু মনে হলো। পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা আর দিনের নানা মুহূর্ত নিয়ে হাসাহাসি—এটাও ছিল ভ্রমণের অন্যতম সুন্দর অংশ।

খাওয়া শেষ করে আমরা আরও কিছুক্ষণ রিসোর্টে আনন্দ করলাম। কেউ ছবি তুলল, কেউ চারপাশে হাঁটল, আবার কেউ পরিবারের সঙ্গে বসে গল্প করল। ছোটরা তখনও ক্লান্ত হয়নি; তারা যেন আরও কিছুক্ষণ এই আনন্দের মধ্যে থাকতে চায়।

কিন্তু সময় তো আর থেমে থাকে না। একসময় ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় হয়ে গেল।

ঢাকার পথে ফেরার সময়

রিসোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় সবার মনেই ছিল এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি। একদিকে সারাদিনের আনন্দ, অন্যদিকে এত সুন্দর জায়গা ছেড়ে ফিরে যাওয়ার হালকা মন খারাপ। ছোটরা হয়তো মনে মনে ভাবছিল, আরেকটু থাকলে ভালো হতো।

গাড়িতে ওঠার পর সবাই দিনের গল্প করতে লাগল। কে কী মজা করেছে, কে কতক্ষণ সাঁতার কেটেছে, রিসোর্টের কোন জায়গাটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে—এসব নিয়ে চলতে থাকল আলোচনা। পথের ক্লান্তি থাকলেও সবার মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি।

ঢাকার পথে ফিরতে ফিরতে মনে হচ্ছিল, সকালে যে ভাঙাচোরা রাস্তা আমাদের এত কষ্ট দিয়েছিল, সেই পথটাই যেন এখন আর তেমন খারাপ লাগছে না। কারণ গন্তব্য থেকে আমরা সঙ্গে করে নিয়ে ফিরছিলাম একগুচ্ছ সুন্দর স্মৃতি।

অরণ্যবাস রিসোর্টে কাটানো সেই দিনটি আমাদের পরিবারের কাছে হয়ে রইল আনন্দ, প্রকৃতি আর একসঙ্গে সময় কাটানোর একটি সুন্দর স্মৃতি। আর মনে হলো, পরিবারের সবাইকে নিয়ে এমন একটি দিন কাটানোর জন্য মাঝে মাঝে একটু পথের কষ্টও মেনে নেওয়া যায়।

০ মন্তব্য · ৮ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!