ইটের ওপর ইট, আর যান্ত্রিকতার এই চাদরে ঢাকা ব্যস্ত ঢাকা শহরের বুকেই যে এত বড় এক ইতিহাসের খনি লুকিয়ে আছে, তা আহসান মঞ্জিলের সদর দরজায় না দাঁড়ালে হয়তো মন থেকে ওভাবে উপলব্ধি করা যেত না। অনেক দিন ধরেই ইচ্ছা ছিল পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এই ‘গোলাপি প্রাসাদ’ নিজের চোখে দেখার, অবশেষে আজ সেই সুযোগ হয়েছে।
প্রথম দর্শন ও রাজকীয় প্রবেশ:
পুরান ঢাকার জ্যাম আর ব্যস্ত সদরঘাট পার হয়ে যখন আহসান মঞ্জিলের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে পা রাখলাম, মুহূর্তেই যেন চারপাশের কোলাহল গায়েব হয়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল মখমলের মতো সবুজ ঘাসে ঢাকা এক বিশাল লন, আর তার ঠিক পেছনেই সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে বুড়িগঙ্গার ইতিহাসের সাক্ষী—আহসান মঞ্জিল। দূর থেকে এর নিখুঁত গোলাপি রঙ আর রোদের আলোয় ঝলমল করতে থাকা বিশাল গম্বুজটি দেখে এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছিল।
সেই বিখ্যাত সিঁড়ি আর রংমহল:
প্রাসাদের দক্ষিণ দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর মুখোমুখি যে বিশাল রাজকীয় সিঁড়িটি নেমে এসেছে, তার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে কিছুটা সময় নবাবী আমলের কেউ একজন মনে হচ্ছিল! সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই চোখে পড়ল এর অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী। ভেতরে প্রবেশ করতেই যেন টাইম মেশিনে চড়ে কয়েকশ বছর পেছনে চলে গেলাম। আহসান মঞ্জিলের এই অংশটিকে বলা হয় ‘রংমহল’।
জাদুঘরের গ্যালারিতে নবাবী ইতিহাস:
- বর্তমানে এটি একটি জাতীয় জাদুঘর, যার ২৩টি গ্যালারিতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ঢাকার নবাবদের রাজকীয় জীবনের নানা স্মৃতি
- নবাবদের ব্যবহৃত সেই বিশাল ডাইনিং টেবিল, বড় বড় আয়না আর সোফা সেট সংবলিত বৈঠকখানা বা ড্রয়িং রুম।
- তাঁদের শিকার করা বাঘের মাথা, রাজকীয় তরবারি, ঢাল এবং হাতির দাঁতের নান্দনিক কারুকাজ
- সবচেয়ে ভালো লেগেছে তৎকালীন ঢাকার কিছু দুর্লভ সাদাকালো আলোকচিত্র, যা দেখে ওখানের ইতিহাসকে খুব কাছ থেকে ছোঁয়া
বুড়িগঙ্গার হাওয়া আর শেষ বিকেল
প্রাসাদের ভেতরটা ঘুরে দেখার পর বিকেলের দিকে চলে এলাম বাইরের বারান্দায়। সেখান থেকে সামনের বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা ও লঞ্চ চলাচলের দৃশ্য এবং নদী থেকে আসা মৃদু ঠাণ্ডা বাতাস মনকে এক নিমেষেই শান্ত করে দেয়। একসময় এই নদীতে কত বজরা নৌকা চলত, নবাবরা এই বারান্দায় বসেই হয়তো ঢাকার কত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন—এসব ভাবতে ভাবতেই সূর্যটা আস্তে আস্তে ডুবতে লাগলো।
ফিরে আসা:
নবাবী আমলের আভিজাত্য, ঐতিহ্য আর এক টুকরো সোনালী ইতিহাস মনের মণিকোঠায় জমা করে যখন সন্ধ্যার মুখে আহসান মঞ্জিল থেকে বিদায় নিচ্ছিলাম, তখন কেবলই মনে হচ্ছিল—ব্যস্ত এই ঢাকা শহরের আড়ালে আমাদের ইতিহাস সত্যিই কতটা সমৃদ্ধ আর সুন্দর!
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!