প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসমানুষ কেন সৃষ্টির সেরা জীব?

গল্প ও উপন্যাস

মানুষ কেন সৃষ্টির সেরা জীব?

মানুষ কেন সৃষ্টির সেরা জীব?

মানুষ মহাবিশ্বের তুলনায় কতটা ক্ষুদ্র—এ কথা বোঝার জন্য আমাদের কেবল রাতের আকাশের দিকে তাকালেই চলে। অসংখ্য নক্ষত্র, কোটি কোটি গ্যালাক্সি, অগণিত গ্রহ-উপগ্রহ এবং বিলিয়ন বিলিয়ন বছরের মহাজাগতিক ইতিহাসের সামনে একজন মানুষের জীবনকাল ও শারীরিক অস্তিত্ব প্রায় কিছুই নয়। আধুনিক বিজ্ঞানের হিসাব অনুযায়ী মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। অথচ একজন মানুষের জীবনকাল তার তুলনায় কয়েক দশক মাত্র। মহাবিশ্বের আয়তনের তুলনায় মানুষের শরীর প্রায় অদৃশ্য একটি বিন্দু। কিন্তু এই ক্ষুদ্র মানুষটির মধ্যেই এমন এক বিস্ময়কর ক্ষমতা রয়েছে, যার মাধ্যমে সে এই বিশাল মহাবিশ্বকে নিয়ে চিন্তা করতে পারে, তার অতীত অনুসন্ধান করতে পারে, তার নিয়ম আবিষ্কার করতে পারে এবং সবচেয়ে বড় কথা—প্রশ্ন করতে পারে, “এই মহাবিশ্ব কেন আছে?” এখানেই মানুষের অনন্যতা।


বিজ্ঞাপন

রুমীর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে—“You are not a drop in the ocean. You are the entire ocean in a drop.” অর্থাৎ, তুমি সমুদ্রের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র জলবিন্দু নও; বরং একটি জলবিন্দুর মধ্যে যেন সমগ্র সমুদ্রের উপস্থিতি। উক্তিটির অন্তর্নিহিত ভাবনাটি মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে গভীর একটি দার্শনিক উপলব্ধি তৈরি করে। 


মানুষ আয়তনে ক্ষুদ্র, কিন্তু তার চেতনার পরিসর অসীমের দিকে প্রসারিত হতে পারে। 

একজন মানুষ তার চোখ দিয়ে কয়েক কিলোমিটার দূরের কোনো বস্তু দেখতে পারে, কিন্তু তার মস্তিষ্ক দিয়ে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সি সম্পর্কে চিন্তা করতে পারে। 

সে নিজের শরীরের ভেতরের পরমাণু দেখতে পারে না, অথচ পরমাণুর অস্তিত্ব সম্পর্কে তত্ত্ব নির্মাণ করতে পারে। 

সে নিজের জীবদ্দশায় মহাবিশ্বের সামান্যতম অংশও প্রত্যক্ষ করতে পারে না, অথচ মহাবিশ্বের উৎপত্তি, বয়স, গঠন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তত্ত্ব দাঁড় করাতে পারে। অর্থাৎ, মানুষ মহাবিশ্বের একটি ক্ষুদ্র অংশ হয়েও নিজের চিন্তার মধ্যে সমগ্র মহাবিশ্বকে ধারণ করতে পারে।


মহাবিশ্ব বস্তু দিয়ে গঠিত তথা হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, কার্বন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, লোহা এবং অসংখ্য মৌল ও যৌগ মিলে গড়ে উঠেছে নক্ষত্র, গ্রহ, ধূলিকণা, পানি, পাথর, মাটি এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের দেহও। বস্তুগত দিক থেকে মানুষ মহাবিশ্বের বাইরে কোনো উপাদান দিয়ে তৈরি নয়। মানুষের শরীরও সেই একই মহাজাগতিক পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত, যেগুলো নক্ষত্র ও গ্রহের গঠনেও পাওয়া যায়।


কিন্তু একই পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত একটি পাথর নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারে না। একটি নক্ষত্র জানে না যে সে একটি নক্ষত্র, একটি গ্রহ জানে না যে সে মহাকাশে ঘুরছে। কিন্তু মানুষ পারে। মানুষ শুধু অস্তিত্বশীল নয়—সে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন। সে নিজের দিকে ফিরে তাকাতে পারে এবং জিজ্ঞেস করতে পারে, “আমি কে?”


এই আত্মসচেতনতা মানুষের অন্যতম বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য। মানুষ শুধু দেখে না, সে দেখার অর্থ বোঝে। সে শুধু শব্দ করে না, সে ভাষা সৃষ্টি করে। সে শুধু স্মৃতি ধারণ করে না, সে অতীতকে ইতিহাসে পরিণত করে। সে শুধু বর্তমান অনুভব করে না, ভবিষ্যৎ কল্পনা করে। সে শুধু কোনো কাজ করে না, কাজটি ন্যায় না অন্যায়—সেটিও বিচার করতে পারে। 


মানুষ নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। ক্ষুধার্ত হয়েও অন্যকে খাবার দিতে পারে, নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও অন্যকে বাঁচাতে পারে, নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে কোনো নৈতিক আদর্শের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে পারে। এখানেই মানুষ কেবল একটি জৈবিক প্রাণী থেকে একটি নৈতিক সত্তায় পরিণত হয়।


ইসলাম মানুষের এই বিশেষ মর্যাদাকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে। 

আল্লাহ বলেন, “আর অবশ্যই আমি আদম-সন্তানকে সম্মানিত করেছি এবং তাদের স্থলে ও সমুদ্রে চলাচলের ব্যবস্থা করেছি এবং তাদেরকে পবিত্র রিজিক দিয়েছি; আর তাদেরকে আমার বহু সৃষ্টির ওপর বিশেষ মর্যাদা দিয়েছি।” — (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭০)


এখানে “সম্মানিত করেছি” এবং “বিশেষ মর্যাদা দিয়েছি”—এই দুটি বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ মানুষের মর্যাদা নিছক মানুষের তৈরি কোনো সামাজিক ধারণা নয়; তার সৃষ্টির মধ্যেই একটি বিশেষ সম্মান নিহিত রয়েছে।


কুরআন মানুষের এই মর্যাদার পেছনে তার জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার দিকটিও সামনে আনে। আল্লাহ আদম (আ.)-কে “সমস্ত নাম” শিক্ষা দিয়েছিলেন—“আর তিনি আদমকে সমস্ত নাম শিক্ষা দিলেন।” — (সূরা আল-বাকারা, ২:৩১)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বিভিন্ন দিক আলোচনা করেছেন। তবে বৃহত্তর অর্থে এটি মানুষের জ্ঞান অর্জন, ধারণা গঠন, ভাষা ও বোধশক্তির বিশেষ ক্ষমতার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মানুষ কোনো বস্তু শুধু দেখে থেমে থাকে না; সে তাকে নাম দেয়, শ্রেণিবদ্ধ করে, পূর্বতথ্যের ভিত্তিতে তার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে, তার সঙ্গে অন্য বস্তুর সম্পর্ক খুঁজে বের করে এবং সেখান থেকে জ্ঞান তৈরি করে। এই ক্ষমতাই তাকে ভাষা, দর্শন, গণিত, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সভ্যতা নির্মাণের পথে নিয়ে গেছে।


আধুনিক বিজ্ঞানও মানুষের cognitive ক্ষমতার এই বিশেষত্বের বহু দিক তুলে ধরেছে। অন্য প্রাণীর মধ্যেও স্মৃতি, সমস্যা সমাধান, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ও পরিকল্পনার ক্ষমতা রয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু মানুষের ভাষা, বিমূর্ত চিন্তা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, জটিল প্রতীকী যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চালন এবং নৈতিক-দার্শনিক প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করার সম্মিলিত ক্ষমতা তাকে অনন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছে। 


মানুষ এমন জ্ঞান তৈরি করতে পারে যা কোনো একজন মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সীমা অতিক্রম করে হাজার হাজার বছর ধরে জমা হতে পারে। একজন মানুষ যে জ্ঞান অর্জন করে, তার পরবর্তী প্রজন্ম তার ওপর দাঁড়িয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারে। এভাবেই মানুষের সভ্যতা ক্রমাগত নিজের ওপর নতুন স্তর নির্মাণ করেছে।


মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নৈতিক স্বাধীনতা। একটি পাথর আল্লাহর অবাধ্য হয় না, কারণ তার কোনো নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। একটি গ্রহ তার কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজের ইচ্ছায় অন্য কোনো কক্ষপথ বেছে নেয় না। কিন্তু মানুষ জানে যে কোনো কাজ অন্যায়, তারপরও সে চাইলে সেই কাজ করতে পারে। আবার সে চাইলে নিজের প্রবৃত্তিকে দমন করে সঠিক কাজও করতে পারে। একজন মানুষ বলতে পারে, “আমি পারি, কিন্তু করব না; কারণ এটি অন্যায়।” এই “কিন্তু করব না” বলার ক্ষমতার মধ্যেই মানুষের নৈতিক মর্যাদা নিহিত। আল্লাহ মানুষকে এই ক্ষমতা দিয়ে সম্মানীত করেছেন। (অবশ্য এই ক্ষমতা তথা কঠিন দায়িত্ব নিয়ে মানুষ বোকামি করেছে বলেই কুরআনে এসেছে)


কুরআন মানুষকে পৃথিবীতে “খলিফা” বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সত্তা হিসেবে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা স্থাপন করতে যাচ্ছি।” — (সূরা আল-বাকারা, ২:৩০)

 এর অর্থ মানুষ আল্লাহর অংশ বা আল্লাহর সমকক্ষ—এমন নয়। বরং মানুষ পৃথিবীতে দায়িত্ব, পরীক্ষা এবং নৈতিক কর্তব্যের অধিকারী তথা আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত। তাকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে এবং সেই স্বাধীনতার জন্য জবাবদিহিও নির্ধারণ করা হয়েছে।


এই দায়িত্বের ধারণাটি “আমানাহ”র আয়াতেও গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। আল্লাহ বলেন, “আমি এই আমানত আসমানসমূহ, পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে পেশ করেছিলাম; তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং ভয় পেল; কিন্তু মানুষ তা বহন করল।” — (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৭২) “আমানাহ”র ব্যাখ্যায় মুফাসসিরদের বিভিন্ন মত রয়েছে। এর মধ্যে দায়িত্ব, নৈতিক কর্তব্য এবং আল্লাহর বিধান মেনে চলার দায়িত্ব অন্যতম। এখানে মানুষের মর্যাদার পাশাপাশি তার বিপুল দায়িত্বের কথাও উঠে আসে। মানুষ শুধু সম্মানিত নয়; সে পরীক্ষিতও।


মানুষের মধ্যে রূহ রয়েছে—এই ধারণা ইসলামী মানবতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু রূহ সম্পর্কে কথা বলার সময় আমাদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে হবে। কুরআন স্পষ্টভাবে বলে, “তারা তোমাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, রূহ আমার রবের আদেশের বিষয়; আর তোমাদের খুব সামান্য জ্ঞান দেওয়া হয়েছে।” — (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮৫) 

রূহকে কোনো measurable physical substance হিসেবেও ইসলাম সংজ্ঞায়িত করে না। বরং বলা নিরাপদ যে মানুষের মধ্যে আল্লাহপ্রদত্ত রূহ, আকল, ফিতরাহ, আত্মসচেতনতা এবং নৈতিক দায়িত্বের যে সমন্বয় রয়েছে, সেটিই তাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।


মানুষের মূল্য তার শরীরের উপাদানে নয়; তার চেতনা, অন্তর, নৈতিকতা এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কে নিহিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “আল্লাহ তোমাদের দেহ বা চেহারার দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।” — (সহিহ মুসলিম, ২৫৬৪)

অর্থাৎ বাহ্যিক সৌন্দর্য, শারীরিক শক্তি বা বস্তুগত বৈশিষ্ট্য মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে না। মানুষের আসল মর্যাদা প্রকাশ পায় তার অন্তর ও কর্মে।


এখানে ইসলামী মানবতত্ত্বের একটি অসাধারণ ভারসাম্য দেখা যায়। ইসলাম একদিকে মানুষকে সম্মানিত করেছে, অন্যদিকে তার দুর্বলতার কথাও বলেছে। মানুষ জ্ঞানী, কিন্তু তার জ্ঞান সীমিত। মানুষ শক্তিশালী, কিন্তু দুর্বলও। মানুষ নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, আবার জুলুমও করতে পারে। মানুষ পৃথিবীকে উন্নত করতে পারে, আবার পৃথিবীকে ধ্বংসও করতে পারে। তাই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কোনো automatic guarantee নয়; এটি একটি সম্ভাবনা, একটি মর্যাদা এবং একই সঙ্গে একটি পরীক্ষা।


কুরআন বলে, “নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছি।” — (সূরা আত-তীন, ৯৫:৪) মানুষের শারীরিক গঠন, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এবং সৃষ্টিগত ভারসাম্য—সব মিলিয়ে তার বিশেষত্ব প্রকাশ পায়। কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্ব কেবল শরীরের নয়। মানুষ একই সঙ্গে দেহ, নফস, আকল, রূহ, ফিতরাহ, নৈতিক দায়িত্ব এবং আখিরাতের জবাবদিহির অধিকারী।


তাহলে কি পুরো মহাবিশ্ব কেবল মানুষের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে? কুরআনের একটি আয়াত এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন, “তিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে—সবই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন।” — (সূরা আল-জাসিয়া, ৪৫:১৩)

এর অর্থ এই নয় যে মহাবিশ্বের প্রতিটি নক্ষত্রের একমাত্র উদ্দেশ্য মানুষের বস্তুগত ব্যবহার। বরং আসমান-জমিনের অসংখ্য সৃষ্টি মানুষের উপকারে নিয়োজিত এবং একই সঙ্গে এগুলো মানুষের জন্য আল্লাহর নিদর্শন। আয়াতটির শেষে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” অর্থাৎ মহাবিশ্ব মানুষের শুধু ব্যবহারের জন্য নয়, তার চিন্তা, উপলব্ধি এবং ঈমানের জন্যও।


সূর্য মানুষকে আলো ও শক্তি দেয়। পানি জীবনধারণের ভিত্তি। মাটি খাদ্য উৎপন্ন করে। সমুদ্র খাদ্য ও যাতায়াতের পথ তৈরি করে। বায়ুমণ্ডল জীবনকে রক্ষা করে। চাঁদ ও সূর্যের গতিবিধি সময়ের হিসাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। এমনকি মহাবিশ্বের বিশালতাও মানুষের জন্য একটি শিক্ষা। মানুষ যখন কোটি কোটি নক্ষত্রের দিকে তাকায়, তখন সে একই সঙ্গে নিজের ক্ষুদ্রতা এবং স্রষ্টার মহত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারে।

মনে হতে পারে পুরো মহাবিশ্ব যেন আয়োজন করে এই ক্ষুদ্র পৃথিবী নামক গ্রহের আরও ক্ষুদ্র মানুষগুলোর সেবায় নিয়োজিত। মনেহয় একটি বিশাল এলাকাজুড়ে থাকা মেশিন যার আসল প্রোডাক্ট খুবই ছোট একটি জায়গাতে আছে। মানে পুরো মহাবিশ্বের ম্যাকানিজমটাই মানুষের জন্য।


তবে এখানে বিজ্ঞান ও ধর্মের বক্তব্য তথা র‍্যাশনাল বক্তব্যের সীমা আলাদা করা জরুরি। বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ করে বলতে পারে যে পৃথিবীতে জীবনধারণের জন্য অত্যন্ত বিশেষ কিছু শর্ত রয়েছে। বিজ্ঞান মহাবিশ্বের বয়স, নক্ষত্রের সৃষ্টি, গ্রহের গঠন, রাসায়নিক উপাদান এবং জীবনের বিকাশ সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে। কিন্তু “এই মহাবিশ্বের উদ্দেশ্য কী?”—এই প্রশ্নটি কেবল empirical science দিয়ে সম্পূর্ণভাবে সমাধান করা যায় না। এটি metaphysical প্রশ্ন। বিজ্ঞান মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে তা ব্যাখ্যা করতে পারে; কিন্তু কেন মহাবিশ্বের অস্তিত্ব, তার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কী—এসব প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানের পদ্ধতির বাইরে চলে যায়।


মহাবিশ্বের সূক্ষ্ম ভারসাম্য, physical constants এবং জীবনের উপযোগী জটিলতার বিষয়টি আধুনিক cosmology ও philosophy of physics-এ “fine-tuning” নামে আলোচিত হয়। এখানে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। একজন বিশ্বাসী মানুষ এই সূক্ষ্ম সামঞ্জস্যের মধ্যে সৃষ্টিকর্তার হিকমাহ দেখতে পারেন। কিন্তু এটিকে সরাসরি “বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে মহাবিশ্ব মানুষের জন্য সৃষ্টি হয়েছে”—এভাবে বলা সঠিক হবে না। কারণ, এটা বিজ্ঞানের ক্ষেত্র নয়। বরং বলা যায়, মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ও তার জীবন-সম্ভব কাঠামো নিজেই গভীর দার্শনিক প্রশ্ন তৈরি করে, যার একটি শক্তিশালী উত্তর ইসলাম প্রদান করে।


ইসলামের সেই উত্তর হলো—মানুষের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য মহাবিশ্বের মালিক হওয়া নয়; মহাবিশ্বের মালিককে চিনে তাঁর বান্দা হওয়া। আল্লাহ বলেন, “আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য।” — (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬) 


মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত অর্থ তার ক্ষমতা বা জ্ঞানের অহংকার নয়। বরং তার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা হলো নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে সেই অসীম স্রষ্টাকে চিনতে পারা।


এই জায়গায় মানুষ ও মহাবিশ্বের সম্পর্কটি আরও গভীর হয়ে ওঠে। মানুষ মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় বস্তু নয়, সবচেয়ে শক্তিশালী বস্তু নয়, সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বস্তু নয়। একটি নক্ষত্র মানুষের চেয়ে অগণিত গুণ বড়। একটি গ্যালাক্সি মানুষের তুলনায় অকল্পনীয়ভাবে বিশাল। কিন্তু নক্ষত্র জানে না সে কত বড়, গ্যালাক্সি জানে না তার অস্তিত্বের অর্থ কী। 


মানুষ জানে যে সে ক্ষুদ্র। সে নিজের ক্ষুদ্রতা নিয়ে চিন্তা করতে পারে। সে অসীমতার ধারণা করতে পারে। সে মৃত্যুর কথা ভাবতে পারে। সে ন্যায়-অন্যায় বিচার করতে পারে। সে নিজের স্রষ্টাকে খুঁজতে পারে।

একটি নক্ষত্র কোটি কোটি বছর ধরে জ্বলতে পারে, কিন্তু সে জানে না যে সে জ্বলছে। একটি গ্যালাক্সি কোটি কোটি নক্ষত্র ধারণ করতে পারে, কিন্তু সে জানে না যে সে একটি গ্যালাক্সি। একটি পাথর হাজার বছর পড়ে থাকতে পারে, কিন্তু সে জানে না যে সে অস্তিত্বশীল। আর একজন মানুষ কয়েক দশকের ক্ষুদ্র জীবনে আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করতে পারে—“আমি কোথা থেকে এলাম? কেন এলাম? কোথায় যাব? এই অসীম মহাবিশ্বের অর্থ কী? আমার স্রষ্টা কে?”

এখানেই মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব।


মানুষ মহাবিশ্বের আকারের দিক থেকে প্রায় কিছুই নয়; কিন্তু অর্থের দিক থেকে সে এক অসাধারণ সত্তা। তার শরীর মাটি ও মহাজাগতিক মৌলের সমন্বয়ে গঠিত, কিন্তু তার চেতনা মহাবিশ্বকে চিন্তার মধ্যে ধারণ করতে পারে। সে সৃষ্টির অংশ, অথচ সৃষ্টিকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। সে সীমাবদ্ধ, অথচ অসীমের ধারণা করতে পারে। সে ক্ষণস্থায়ী, অথচ অনন্ত জীবন নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে। সে দুর্বল, অথচ সত্যের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারে।

তাই মানুষকে সৃষ্টির সেরা বলা হলে তার অর্থ এই নয় যে মানুষ আকারে সবচেয়ে বড়, শক্তিতে সবচেয়ে প্রবল কিংবা বস্তুগতভাবে সবচেয়ে জটিল। বরং তার অর্থ হলো—আল্লাহ মানুষকে এমন এক সম্মানিত অবস্থান দিয়েছেন যেখানে জ্ঞান, বিবেক, আত্মসচেতনতা, নৈতিক স্বাধীনতা, রূহ, ফিতরাহ এবং দায়িত্ব একত্রিত হয়েছে। তাকে পৃথিবীতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সৃষ্টিজগতের বহু কিছু তার জন্য নিয়োজিত করা হয়েছে, তাকে সত্য চিনবার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং তার সামনে ভালো-মন্দের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে।


তবে এই মর্যাদার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো—মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শেষ পর্যন্ত তার নিজের জন্য নয়; তার স্রষ্টার দিকে ফিরে যাওয়ার জন্য। মানুষ যত বড় বিজ্ঞানী হোক, যত বড় দার্শনিক হোক, যত শক্তিশালী রাষ্ট্রই গড়ে তুলুক, যত দূর মহাকাশে পৌঁছাক—তার অস্তিত্বের চূড়ান্ত প্রশ্ন থেকে সে পালাতে পারে না।


তাকে একদিন নিজের দিকে ফিরে তাকাতে হবে এবং জিজ্ঞেস করতে হবে—আমি যে জ্ঞান পেয়েছি, তা আমাকে কার কাছে নিয়ে গেল? আমি যে স্বাধীনতা পেয়েছি, তা কী কাজে ব্যবহার করেছি? যে পৃথিবী আমার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল, তার সঙ্গে আমি কী করেছি? আর যে রূহ, বিবেক ও বুদ্ধি আমাকে দেওয়া হয়েছিল, তার প্রতি আমি কতটা বিশ্বস্ত ছিলাম?


সুতরাং মানুষ সৃষ্টির সেরা হওয়ার সবচেয়ে গভীর অর্থ হলো—সে সৃষ্টির মধ্যে এমন এক ক্ষুদ্র অথচ মহামূল্যবান সত্তা, যে সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে স্রষ্টাকে চিনতে পারে। মহাবিশ্ব তার চারপাশে বিস্তৃত, কিন্তু তার চেতনার মধ্যে মহাবিশ্বের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন জাগে। তার শরীর ক্ষুদ্র, জীবন ক্ষণস্থায়ী, জ্ঞান সীমিত; তবু তার সামনে অনন্ত সত্যের দরজা খোলা। সে চাইলে নিজের ক্ষুদ্রতাকে অহংকারে পরিণত করতে পারে, আবার চাইলে সেই ক্ষুদ্রতাকে উপলব্ধি করে অসীম স্রষ্টার সামনে সিজদায় নত হতে পারে।


আর সম্ভবত মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সেখানেই—সে মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়; সে সেই মহাবিশ্বের স্রষ্টার বান্দা। কিন্তু সেই বান্দার মধ্যেই এমন এক বোধ, বুদ্ধি ও আত্মা রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে সে সমগ্র সৃষ্টিজগতের দিকে তাকিয়ে বলতে পারে—

আমি ক্ষুদ্র, কিন্তু আমাকে এমন এক সত্তা বানানো হয়েছে যে অসীমকে চিনতে পারে। আমি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আমাকে অনন্তের সন্ধান করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আমি মাটির তৈরি, কিন্তু আমার সামনে আমার স্রষ্টাকে চেনার পথ খুলে দেওয়া হয়েছে।

এই অর্থেই মানুষ কেবল মহাবিশ্বের একটি অংশ নয়—সে মহাবিশ্বের দিকে তাকানো এক সচেতন চোখ, প্রশ্ন করা এক বিবেক এবং স্রষ্টার দিকে ফিরে যাওয়ার জন্য পরীক্ষিত এক আমানতদার সত্তা।

০ মন্তব্য · ৬৫ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!