ফাররুখ নামে এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন একজন ব্যবসায়ীর গোলাম ছিলেন। তিনি এতটাই বিশ্বস্ত আর পরিশ্রমী ছিলেন যে, তাঁর মনিব তাঁর কাজে খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন।
একদিন মনিব তাকে গোলামি থেকে মুক্ত করে দিলেন। শুধু তাই নয়, নতুন জীবন শুরু করার জন্য তাকে ৩০ হাজার দিনারও দিলেন।
মুক্ত হয়ে ফাররুখ মদিনা মুনাওয়ারায় চলে গেলেন। সেখানে তিনি একজন নেককার নারীকে বিয়ে করলেন।
বিয়ের কিছুদিন পর ব্যবসার কাজে তাকে অনেক দূরে যেতে হলো। যাওয়ার সময় তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, “আমি কয়েক মাসের জন্য যাচ্ছি।” এরপর তাঁর কাছে থাকা পুরো ৩০ হাজার দিনার স্ত্রীর হাতে আমানত রেখে তিনি সফরে বের হয়ে গেলেন।
তখন তাঁর স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।
স্বামীকে বিদায় দেওয়ার সময় স্ত্রী শুধু একটি কথা বললেন, “মনে রেখো, আমরা অনেক সময় কোনো ঘটনাকে খারাপ মনে করি। কিন্তু আল্লাহ চাইলে সেই ঘটনার মধ্যেই আমাদের জন্য অনেক বড় কল্যাণ লুকিয়ে থাকতে পারে।”
ফাররুখ চলে যাওয়ার ছয় মাস পর তাঁর ঘরে একটি পুত্রসন্তান জন্ম নিল। মা সন্তানের নাম রাখলেন রবিয়া।
ফাররুখ বলেছিলেন কয়েক মাস পর ফিরে আসবেন। কিন্তু মাসের পর মাস চলে গেল, বছরও পার হয়ে গেল,তিনি আর ফিরলেন না।
একসময় মদিনায় খবর ছড়িয়ে পড়ল, ফাররুখ হয়তো আর বেঁচে নেই।
কিন্তু তাঁর স্ত্রী স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকলেন না। তিনি বুঝতে পারলেন, এখন তাঁর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো তাঁর সন্তানকে মানুষ করা।
স্বামী যে ৩০ হাজার দিনার রেখে গিয়েছিলেন, সেই টাকা তিনি নিজের আরাম-আয়েশে খরচ না করে সন্তানের শিক্ষার পেছনে খরচ করতে শুরু করলেন।
ছোট্ট রবিয়াকে তিনি মদিনার বড় বড় আলেমদের কাছে পাঠাতে লাগলেন। রাবিয়াও এমনভাবে ইলমের পেছনে নিজেকে বিলিয়ে দিলেন যে, অল্প বয়সেই তিনি মদিনার অন্যতম বড় আলেম হয়ে উঠলেন।
মাত্র ৩০ বছর বয়সে তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার এত খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল যে, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁর কাছে ইলম শিখতে আসতে লাগল।
আলেমদের মাঝে তিনি পরিচিত হয়ে গেলেন রবিয়াতুর রায় নামে।
এমনকি পরবর্তীতে বড় বড় আলেমরাও তাঁর কাছ থেকে ইলম গ্রহণ করেছেন।
এদিকে কেটে গেল প্রায় ৩০ বছর।
একদিন বৃদ্ধ বয়সে ফাররুখ মদিনায় ফিরে এলেন।
এত বছর পর নিজের স্ত্রী ও সন্তানের সামনে কীভাবে দাঁড়াবেন - এই চিন্তায় তাঁর মন ভার হয়ে ছিল। তাই বাড়িতে যাওয়ার আগে তিনি মসজিদে নববীতে গেলেন। সেখানে নামাজ পড়ে অনেকক্ষণ আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করলেন।
নামাজ শেষে হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল মসজিদের একটি বড় জলসার দিকে।
একজন তরুণ আলেমকে ঘিরে শত শত মানুষ বসে আছে। সবাই গভীর মনোযোগ দিয়ে তাঁর কাছ থেকে ইলম শিখছে।
ফাররুখ পাশে থাকা একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, “এই আলেম কে?”
লোকটি অবাক হয়ে বলল, “আপনি কি মদিনায় নতুন? তাঁকে চেনেন না? তিনি তো মদিনার বড় আলেম রাবিয়াতুর রায়!”
ফাররুখ আবার জিজ্ঞেস করলেন, “তাঁর বাবার নাম কী?”
উত্তর এলো, “রবিয়া ইবনে ফাররুখ।”
এই কথা শুনে ফাররুখের বুক কেঁপে উঠল।
তাঁর চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।
তিনি বুঝতে পারলেন, এই রবিয়াই তাঁর সন্তান!
যে সন্তানকে তিনি জন্মের সময়ও দেখতে পারেননি, আজ সেই সন্তানই মদিনার বড় বড় আলেমদের শিক্ষক হয়ে বসে আছে।
ফাররুখ বাড়িতে ফিরে দরজায় কড়া নাড়লেন।
এত বছর পর স্ত্রী তাঁকে দেখে কোনো অভিযোগ করলেন না। বরং সাদরে গ্রহণ করলেন।
ফাররুখ লজ্জিত হয়ে বললেন, “আমি আমার রেখে যাওয়া ৩০ হাজার দিনারের হিসাব নিতে আসিনি।”
তখন তাঁর স্ত্রী বললেন, “আপনার ৩০ হাজার দিনার তো আমি খরচ করে ফেলেছি।”
ফাররুখ জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় খরচ করেছেন?”
স্ত্রী বললেন, “মসজিদে নববীতে যে আলেমের সামনে আজ শত শত মানুষ বসে ইলম শিখছে, সেই রবিয়াই আপনার আসল সম্পদ। আপনার রেখে যাওয়া প্রতিটি দিনার আমি তাঁর ইলম ও তরবিয়তের পেছনে খরচ করেছি।”
তারপর তিনি বললেন,
“বলুন তো, সেই ৩০ হাজার দিনার বেশি মূল্যবান, নাকি আজ আপনার এই সন্তান?”
ফাররুখ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।
তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন।
তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি যে সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন, তাঁর স্ত্রী সেটাকে আরও বড় সম্পদে পরিণত করেছেন।
৩০ হাজার দিনার একদিন শেষ হয়ে যেত। কিন্তু একজন নেককার, আলেম সন্তান - এমন সম্পদ, যার উপকার সদকায়ে জারিয়া হিসেবে চলতেই থাকে।
সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু টাকা-পয়সা নয়। সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো দ্বীনি শিক্ষা, সঠিক দীক্ষা এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক।
আমাদের ভাবা উচিত, “আমার সন্তান মানুষ হিসেবে কেমন হবে? তার ইলম কেমন হবে? তার চরিত্র কেমন হবে? সে আল্লাহকে কতটা চিনবে?”
কারণ টাকা-পয়সা সন্তানকে বড়লোক বানাতে পারে, কিন্তু দ্বীনি শিক্ষা তাকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!