প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসঅম্বার অপমান

গল্প ও উপন্যাস

অম্বার অপমান

অম্বার অপমান

ভীষ্ম প্রতিজ্ঞার পর কুরুবংশ যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। মহারাজ শান্তনু ও সত্যবতীর সংসারে জন্ম নিল দুই পুত্র—


বিজ্ঞাপন

চিত্রাঙ্গদ এবং বিচিত্রবীর্য।

কিন্তু সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। শান্তনুর মৃত্যুর পর চিত্রাঙ্গদ সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন পরাক্রমশালী, কিন্তু অল্প বয়সেই এক যুদ্ধে নিহত হন।


তখন কুরুবংশের আশা হয়ে রইলেন কনিষ্ঠ রাজপুত্র বিচিত্রবীর্য। তাঁকে সিংহাসনে বসানো হলো।


আর ভীষ্ম, নিজের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করে, অভিভাবকের মতো রাজ্য পরিচালনা করতে লাগলেন। কিছু বছর পরে বিচিত্রবীর্য বিবাহযোগ্য বয়সে পৌঁছালেন।


ঠিক সেই সময় কাশীরাজ তাঁর তিন কন্যার জন্য এক বিশাল স্বয়ংবর সভার আয়োজন করলেন। তিন রাজকন্যা ছিলেন—অম্বা, অম্বিকা এবং অম্বালিকা।


আর্যাবর্তের অসংখ্য রাজা, যুবরাজ এবং বীর যোদ্ধা সেখানে উপস্থিত হলেন। ভীষ্ম সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি নিজেই কাশী যাবেন।


কিন্তু পাত্র হিসেবে নয়। কুরুবংশের জন্য বধূ আনতে।


স্বয়ংবর সভা যখন জমে উঠেছে, ঠিক তখনই।বজ্রপাতের মতো প্রবেশ করলেন ভীষ্ম। তাঁর কণ্ঠ গর্জে উঠল—


"কাশীরাজের এই তিন কন্যাকে আমি কুরুবংশের রাজা বিচিত্রবীর্যের জন্য নিয়ে যাচ্ছি। যার আপত্তি আছে, সে অস্ত্র হাতে সামনে আসুক।"


মুহূর্তে সভা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। অসংখ্য রাজা ও যোদ্ধা ভীষ্মকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম ছিলেন অপ্রতিরোধ্য।


একাই সবাইকে পরাজিত করে তিনি তিন রাজকন্যাকে রথে তুলে হস্তিনাপুরের দিকে রওনা দিলেন। কিন্তু এই বিজয়ের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর ভুল।


হস্তিনাপুরে পৌঁছানোর পর জ্যেষ্ঠ রাজকন্যা অম্বা ভীষ্মকে বললেন—


"মহারথী, আপনি জানেন না। আমি ইতিমধ্যেই আমার হৃদয় শাল্বরাজকে সমর্পণ করেছি। আজকের স্বয়ংবর সভায় আমি তাঁকেই বরমালা পরাতে চেয়েছিলাম।"


ভীষ্ম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি জানতেন না এই কথা।

ধর্মের দৃষ্টিতে অম্বাকে জোর করে বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে বিবাহ দেওয়া অন্যায় হবে।


তাই তিনি অম্বাকে সম্মানের সঙ্গে শাল্বরাজের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু ট্র্যাজেডি তখনও শুরু হয়নি। 


শাল্বরাজ অম্বাকে দেখে বললেন—

"তোমাকে ভীষ্ম যুদ্ধে জয় করে নিয়ে গেছেন। এখন আমি কীভাবে তোমাকে গ্রহণ করি? সমগ্র আর্যাবর্ত বলবে, আমি ভীষ্মের পরিত্যক্ত দান গ্রহণ করেছি।"


অম্বা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। যে মানুষকে তিনি ভালোবাসতেন, সেই মানুষই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করল।


অপমানিত অম্বা আবার হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন। তিনি ভীষ্মের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন— "শাল্ব আমাকে গ্রহণ করেনি। এখন আপনিই আমাকে বিবাহ করুন।"


কিন্তু ভীষ্মের উত্তর ছিল নির্মম। "আমি পারব না। আমি আজীবন ব্রহ্মচর্যের প্রতিজ্ঞা করেছি।"


এক মুহূর্তে অম্বার পৃথিবী ভেঙে পড়ল। শাল্বরাজ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভীষ্ম তাঁকে গ্রহণ করতে পারছেন না।

বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে তাঁর বিবাহও হয়নি। 


সেই দিন অম্বার হৃদয়ে জন্ম নিল এমন এক আগুন, যা বহু বছর ধরে নিভবে না।


তিনি বুঝলেন— তাঁর জীবনের সর্বনাশের জন্য একজন মানুষই দায়ী—ভীষ্ম।


অম্বা প্রতিজ্ঞা করলেন "গঙ্গাপুত্র ভীষ্মের বিনাশ না দেখে আমি শান্তি পাব না।"


সেই প্রতিজ্ঞা শুনে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। কারণ একা, আশ্রয়হীন, অপমানিত এক নারী কী-ই বা করতে পারে?


কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো—

অপমানিত মানুষের সংকল্পকে ছোট করে দেখা।


অম্বার প্রতিশোধস্পৃহা তাঁকে কোথায় নিয়ে যাবে? কেন তিনি পরশুরামের দ্বারস্থ হবেন?


কীভাবে এক নারীর অভিশাপ ও প্রতিজ্ঞা একদিন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে ভীষ্মের পতনের কারণ হবে?


মহাভারতের অম্বার কাহিনী পড়লে অধিকাংশ মানুষ প্রথমেই ভীষ্মকে দায়ী করেন। আবার অনেকে বলেন, ভীষ্ম তো নিজের প্রতিজ্ঞা ভাঙতে পারেননি। তাহলে তাঁর দোষ কোথায়?


প্রথমে ভীষ্মের দিকটা দেখি। ভীষ্ম কাশীরাজের সভা থেকে অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকাকে বিচিত্রবীর্যের জন্য নিয়ে এসেছিলেন।এটি ছিল ক্ষত্রিয়দের স্বীকৃত বিবাহের একটি রূপ, যা সেই যুগে সম্পূর্ণ অজানা ছিল না। কিন্তু সমস্যা হলো—


অম্বা ইতিমধ্যেই শাল্বরাজকে নিজের স্বামী হিসেবে মনে মনে বেছে নিয়েছিলেন। এই তথ্য ভীষ্ম জানতেন না।জানার পর তিনি অম্বাকে সম্মানের সঙ্গে শাল্বরাজের কাছেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে অম্বার জীবন নষ্ট করার উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না।


এবার শাল্বরাজের দিকে তাকাই। তিনি অম্বাকে ভালোবাসতেন। অম্বাও তাঁকে ভালোবাসতেন। তবু তিনি অম্বাকে গ্রহণ করলেন না। কেন?


কারণ সমাজ কী বলবে। অর্থাৎ একজন মানুষের ভালোবাসার চেয়ে তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল লোকলজ্জা।


এখানেই অম্বার ট্র্যাজেডি। তিনি তেমন কোনো অপরাধ করেননি। কিন্তু তাঁকে এমনভাবে বিচার করা হলো যেন অপরাধ তাঁরই।আবার মনে হয় অম্বা একথা আগেই বলতে পারতো?


এই অম্বার কাহিনীতে ভিলেন খুঁজতে গেলে হয়তো আমরা ভুল করব।এখানে একজন নয়, অনেকেই দায়ী।

ভীষ্মের সিদ্ধান্ত

শাল্বরাজের দুর্বলতা

সামাজিক প্রথা


সব মিলিয়েই অম্বার জীবনের ট্র্যাজেডি তৈরি হয়েছিল।

তিনি প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু প্রতিশোধ কি তাঁকে শান্তি দিতে পেরেছিল?


অপমানের আগুন কি ন্যায়বিচার এনে দিতে পারে?

নাকি সেই আগুন শেষ পর্যন্ত নিজেকেও পুড়িয়ে ফেলে?


অম্বা তার প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবার ছুটে যাবেন এমন একজনের কাছে, যার নাম শুনলেই কাঁপত সমগ্র ক্ষত্রিয় জগৎ।


তিনি— ভগবান পরশুরাম।


পরবর্তী পর্ব:

অম্বার প্রতিশোধ: পরশুরাম বনাম ভীষ্ম যুদ্ধ


এক অপমানিত নারীর আহ্বানে মুখোমুখি হবেন যুগের দুই শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। গুরু ও শিষ্যের যুদ্ধ।


চলবে...

০ মন্তব্য · ৬২ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!