যে প্রতিজ্ঞার সামনে দেবতারাও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। পূর্বের পর্বে আমরা দেখেছিলাম—
মহারাজ শান্তনু সত্যবতীকে ভালোবেসেছিলেন।
কিন্তু সত্যবতীর পিতা একটি শর্ত দিয়েছিলেন, সত্যবতীর গর্ভজাত সন্তানই হবে হস্তিনাপুরের ভবিষ্যৎ রাজা।
পিতার সুখের জন্য দেবব্রত স্বেচ্ছায় সিংহাসনের অধিকার ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু তাতেও সন্তুষ্ট হননি জেলেপ্রধান।তিনি আরও একটি প্রশ্ন করেছিলেন— "রাজপুত্র, আপনার সন্তানদের কী হবে?"
প্রশ্নটি শুনে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
দেবব্রত বুঝতে পারলেন, শুধু সিংহাসন ত্যাগ করলেই হবে না।
যতদিন তাঁর বংশধর থাকবে, ততদিন ভবিষ্যতে সিংহাসন নিয়ে বিরোধের সম্ভাবনা থাকবে।
অর্থাৎ পিতার সুখ নিশ্চিত করতে হলে তাঁকে আরও বড় কিছু ত্যাগ করতে হবে।অনেক বড়, নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের সংসার, নিজের বংশধারা।
দেবব্রত আকাশের দিকে তাকালেন। তারপর সমবেত জনতার সামনে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলেন—
"আমি আজ প্রতিজ্ঞা করছি, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি বিবাহ করব না। আমি কখনও সন্তান উৎপাদন করব না। আজীবন ব্রহ্মচর্য পালন করব এবং কুরুবংশের সিংহাসনের প্রতি আমার কোনো দাবি কখনও থাকবে না।"
মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে নেমে এলো নিস্তব্ধতা। মানুষ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। একজন যুবরাজ। যার সামনে ছিল সমগ্র পৃথিবীর ঐশ্বর্য।
যার হাতে ছিল ভবিষ্যতের সিংহাসন। যে চাইলে শত রাজকন্যার মধ্যে যেকোনো একজনকে বিবাহ করতে পারত, সে কিনা স্বেচ্ছায় আজীবন ব্রহ্মচর্যের শপথ নিল!
কথিত আছে, তখন আকাশ থেকে দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন।ঋষি-মুনিরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন। তাঁরা বললেন—
"ভীষ্ম!"
অর্থাৎ—ভীষণ, ভয়ংকর, দুর্লঙ্ঘ্য প্রতিজ্ঞা।
সেই দিন থেকেই দেবব্রত পরিচিত হলেন—ভীষ্ম নামে।
জেলেপ্রধান স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এমন ত্যাগের পর আর আপত্তি করার সাহস তাঁর রইল না। তিনি সত্যবতীর বিবাহে সম্মতি দিলেন। যখন শান্তনু এই ঘটনার কথা জানলেন, তখন তাঁর হৃদয় আনন্দ ও বেদনায় একসঙ্গে ভরে উঠল।
তিনি বুঝলেন, পুত্র তাঁর জন্য এমন একটি ত্যাগ করেছে, যা কোনো পিতা কখনও শোধ করতে পারবেন না। তখন শান্তনু ভীষ্মকে একটি বিরল বর প্রদান করলেন।৷ তিনি বললেন—
"পুত্র, তোমার মতো ত্যাগী মানুষ পৃথিবীতে বিরল।
আমি তোমাকে বর দিচ্ছি, মৃত্যু তোমার ইচ্ছার অধীন থাকবে।
তুমি যখন চাইবে, তখনই মৃত্যুবরণ করবে। তার আগে মৃত্যু তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না।"
এই বরই পরিচিত হলো—ইচ্ছামৃত্যুর বর নামে।
সেই দিন থেকে ভীষ্ম হয়ে উঠলেন কুরুবংশের সবচেয়ে শক্তিশালী অভিভাবক। তিনি নিজে কখনও রাজা হননি।
কিন্তু বহু রাজাকে সিংহাসনে বসিয়েছেন। নিজে কখনও সংসার করেননি। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কুরুবংশকে রক্ষা করেছেন। নিজে কখনও পিতা হননি।
কিন্তু সমগ্র কুরুবংশের পিতৃতুল্য অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি এখানেই লুকিয়ে আছে।
ভীষ্ম যে প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন, তা ছিল মহৎ। তাঁর উদ্দেশ্যও ছিল পবিত্র। কিন্তু কখনও কখনও সবচেয়ে মহৎ সিদ্ধান্তও অপ্রত্যাশিত পরিণতি ডেকে আনে।
কারণ ভীষ্মের এই প্রতিজ্ঞার ফলেই একদিন কুরুবংশ উত্তরাধিকার সংকটে পড়বে।
সেই সংকট থেকেই জন্ম নেবে এমন সব ঘটনা, যা শেষ পর্যন্ত কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাবে।
সব প্রতিজ্ঞা কি ধর্ম?
ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা নিঃসন্দেহে মহৎ ছিল। তিনি পিতার সুখের জন্য নিজের সিংহাসন, বিবাহ, সন্তান, সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু মহাভারতের পরবর্তী ঘটনাগুলো দেখলে প্রশ্ন জাগে, একটি মহৎ প্রতিজ্ঞা কি সব পরিস্থিতিতে আঁকড়ে ধরে রাখা উচিত?
কুরুসভায় দ্রৌপদীর অপমানের সময় ভীষ্ম উপস্থিত ছিলেন। তিনি অন্যায় বুঝেছিলেন, কিন্তু সিংহাসনের প্রতি আনুগত্য, রাজধর্ম ও নিজের অঙ্গীকারের বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। এখানেই মহাভারত একটি গভীর প্রশ্ন তোলে—
যখন একটি শপথ ন্যায় ও সত্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন কোনটি বড়—শপথ, না ধর্ম?
ভীষ্মের জীবনের ট্র্যাজেডি এই নয় যে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ট্র্যাজেডি হলো, তিনি কখনও প্রশ্ন করেননি—প্রতিজ্ঞাটি এখনও ধর্মের সেবা করছে, নাকি ধর্মের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে?
কিন্তু ভীষ্মের জীবনের ট্র্যাজেডি এখানেই শেষ নয়। খুব শীঘ্রই তাঁর জীবনে প্রবেশ করতে চলেছেন এক রাজকন্যা।
যিনি তাঁকে ভালোবাসতেন না। কিন্তু তাঁর কারণেই জীবনভর প্রতিশোধের আগুনে জ্বলেছেন। সেই নারীর হলেন কাশীরাজের কন্যা— অম্বা।
আর তাঁর প্রতিশোধই একদিন হয়ে উঠবে ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ। এক নারীর প্রতিশোধ, যা মৃত্যুর দ্বার পর্যন্ত তাড়া করেছিল ভীষ্মকে।
কীভাবে অপমানিত এক রাজকন্যা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন ভীষ্মের বিনাশের। যাকে পৃথিবীতে কেউ পরাজিত করতে পারেনি সেই ভীষ্মকে বিনাশ করার শক্তি কিভাবে লাভ করেছিলেন একজন নারী!!
একজন নারী প্রতিশোধ পরায়ন হলে কতটুকু কঠিন ও শক্তিশালী হতে পারে সেই উদাহরণ হলেন অম্বা।
আর কীভাবে সেই প্রতিজ্ঞা, ভীষ্মের বিনাশ, বহু বছর পরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে সত্যি হয়েছিল?
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!