প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসশান্তনু ও সত্যবতী

গল্প ও উপন্যাস

শান্তনু ও সত্যবতী

শান্তনু ও সত্যবতী

দেবব্রত তখন হস্তিনাপুরের যুবরাজ। শাস্ত্র, অস্ত্র, নীতি, বীরত্ব সব দিক থেকেই তিনি ছিলেন অনন্য। সমগ্র আর্যাবর্ত জানত, একদিন তিনিই কুরুবংশের পরবর্তী সম্রাট হবেন।

মহারাজ শান্তনুও নিশ্চিন্ত ছিলেন। কুরুবংশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ। কিন্তু ভাগ্য তখন নিঃশব্দে আরেকটি অধ্যায় লিখছিল।

বিজ্ঞাপন

একদিন মহারাজ শান্তনু যমুনার তীর ধরে ভ্রমণ করছিলেন। হঠাৎ তিনি এক অপূর্ব সুগন্ধ অনুভব করলেন। সেই সুগন্ধ যেন বাতাস ভেদ করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিস্মিত শান্তনু সেই সুগন্ধের উৎস খুঁজতে লাগলেন।অবশেষে তিনি দেখতে পেলেন এক তরুণীকে। সে একটি নৌকা চালাচ্ছিল। সাধারণ পোশাক। সাধারণ জীবন। কিন্তু তার সৌন্দর্য এবং ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ।

তার নাম—সত্যবতী।

কিন্তু সত্যবতীর জীবনও ছিল রহস্যে ভরা। জন্মের সময় তার শরীর থেকে মাছের গন্ধ বের হতো। তাই মানুষ তাকে ডাকত— মৎস্যগন্ধা।

একদিন মহর্ষি পরাশর তাঁর নৌকায় যাত্রা করেন।সত্যবতীর সেবা ও চরিত্রে সন্তুষ্ট হয়ে ঋষি তাঁকে একটি বর দেন। সেই বরেই মাছের গন্ধ রূপান্তরিত হয় এক অপূর্ব সুগন্ধে।

সত্যবতীকে দেখেই শান্তনুর হৃদয় হারিয়ে গেল। গঙ্গার বিদায়ের পর বহু বছর কেটে গেছে। এই প্রথম তিনি আবার প্রেমে পড়লেন। তিনি সত্যবতীর পিতার কাছে বিবাহের প্রস্তাব পাঠালেন।

সত্যবতীর পিতা ছিলেন জেলেদের প্রধান। তিনি রাজার প্রস্তাবে সম্মানিত হলেন। কিন্তু একটি শর্ত রাখলেন।

তিনি বললেন—

"মহারাজ, আমার কন্যা আপনার রানি হোক, এতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু তার গর্ভে যে সন্তান জন্মাবে, সিংহাসনের অধিকার তাকে দিতে হবে।"

শান্তনু স্তব্ধ হয়ে গেলেন।কারণ হস্তিনাপুরের যুবরাজ তো ইতিমধ্যেই নির্ধারিত। দেবব্রত।

তিনি শুধু যুবরাজই নন, সমগ্র রাজ্যের গর্ব। শুধু প্রেমের জন্য তিনি কীভাবে দেবব্রতের অধিকার কেড়ে নেবেন?

ভারাক্রান্ত হৃদয়ে শান্তনু প্রাসাদে ফিরে এলেন। তিনি কাউকে কিছু বললেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর মুখের হাসি হারিয়ে গেল। রাজকার্যে মন বসল না। তিনি নীরব হয়ে পড়লেন।

একদিন দেবব্রত লক্ষ্য করলেন, তাঁর পিতা রাজা শান্তনু আগের মতো নেই।

যে রাজা সবসময় প্রফুল্ল থাকতেন, তিনি এখন চুপচাপ থাকেন। রাজকার্যে মন নেই, শিকারে যান না, কারও সঙ্গে তেমন কথা বলেন না। দিন দিন তাঁর শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে, মুখ মলিন হয়ে উঠছে। এতে দেবব্রত খুব উদ্বিগ্ন হলেন।

তিনি পিতার কাছে গিয়ে বললেন—

“পিতা, আপনার তো কোনো অভাব নেই। সমগ্র রাজ্য আপনার অধীনে, প্রজারা সুখে আছে, শত্রুরা পরাজিত।

তবুও আপনাকে সবসময় চিন্তিত ও দুঃখী দেখছি কেন?

আপনি আমাকে আগের মতো স্নেহও করছেন না। আপনার মুখে হাসি নেই, মনে শান্তি নেই। যদি কোনো দুঃখ বা সমস্যা থেকে থাকে, আমাকে বলুন। আমি তার সমাধান করার চেষ্টা করব।”

পুত্রের কথা শুনে শান্তনু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তিনি বললেন—

“বৎস, তুমি আমার একমাত্র পুত্র। তুমি বীর, বিদ্বান এবং অস্ত্রশাস্ত্রে অতুলনীয়। কিন্তু পৃথিবীতে কিছুই চিরস্থায়ী নয়।

আমার ভয় হয়, যদি কোনোদিন তোমার কোনো অনিষ্ট ঘটে, তাহলে আমাদের বংশের আর কেউ থাকবে না। কুরুবংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

তুমি একশো পুত্রের সমান, তবু শাস্ত্রে বলা হয়েছে—যার মাত্র একজন পুত্র, তাকেও প্রায় অপুত্রক বলা যায়।

এই চিন্তাই আমাকে সবসময় কষ্ট দেয়।

তোমার মঙ্গল কামনায় আমি প্রতিদিন প্রার্থনা করি, কিন্তু মনকে শান্ত করতে পারি না।”

শান্তনু নিজের আসল কারণটি গোপন রাখলেন। তিনি সত্যবতীর কথা সরাসরি বললেন না।

কিন্তু দেবব্রত বুঝতে পারলেন, পিতার এই দুঃখের পেছনে অন্য কোনো কারণও আছে। তাই তিনি রাজ্যের প্রবীণ মন্ত্রী ও বিশ্বস্ত সচিবের কাছে গেলেন। সেখানে তিনি পিতার বিষাদের প্রকৃত কারণ জানতে চাইলেন।

বৃদ্ধ মন্ত্রী তখন সব ঘটনা খুলে বললেন। তিনি জানালেন, গঙ্গার বিদায়ের বহু বছর পরে একদিন যমুনার তীরে রাজা শান্তনু এক অসাধারণ সুন্দরী ধীবরকন্যাকে দেখেছিলেন।

তার নাম সত্যবতী।

তাকে দেখেই রাজা মুগ্ধ হয়ে পড়েন এবং বিবাহ করতে চান। কিন্তু সত্যবতীর পিতা, ধীবররাজ দাসরাজ, একটি কঠিন শর্ত দিয়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন—

“আমার কন্যার গর্ভে যে পুত্র জন্মাবে, সেই পুত্রই হস্তিনাপুরের ভবিষ্যৎ রাজা হতে হবে।”

এই শর্ত শুনে শান্তনু রাজি হতে পারেননি। কারণ তখন যুবরাজ হিসেবে দেবব্রত ইতিমধ্যেই ঘোষিত হয়েছেন।

নিজের প্রিয় পুত্রের অধিকার কেড়ে নিয়ে তিনি সত্যবতীকে বিয়ে করতে চাননি। তাই তিনি দুঃখ বুকে চেপে প্রাসাদে ফিরে এসেছিলেন।

কিন্তু সত্যবতীকে ভুলতেও পারছিলেন না। এই অপ্রকাশিত বেদনাই ধীরে ধীরে তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।

সব কথা শুনে দেবব্রত আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না।কয়েকজন ক্ষত্রিয় ও রাজপুরুষকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সরাসরি ধীবররাজের গৃহে উপস্থিত হলেন।

দাসরাজ যুবরাজ দেবব্রতকে দেখে যথাযোগ্য সম্মান করলেন, আসন দিলেন এবং তাঁর আগমনের কারণ জানতে চাইলেন।

কিন্তু তিনি জানতেন না, এই সাক্ষাৎকারই ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে চলেছে।

কারণ, পিতার সুখের জন্য দেবব্রত এখন এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন, যা পৃথিবীকে বিস্মিত করবে এবং চিরকালের জন্য তাঁকে ‘ভীষ্ম’ নামে অমর করে রাখবে।

পিতার সুখের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর নিজের অস্তিত্ব। তাঁর যুবরাজের অধিকার। তাঁর ভবিষ্যৎ সিংহাসন।

তারপর তিনি ধীরবরাজকে বললেন—

"আমি কুরুবংশের যুবরাজ দেবব্রত। আমি আজ ঘোষণা করছি, হস্তিনাপুরের সিংহাসনের ওপর আমার সমস্ত অধিকার ত্যাগ করলাম।

সত্যবতীর গর্ভজাত সন্তানই হবে ভবিষ্যতের রাজা।"

জেলেপ্রধান বিস্মিত হয়ে গেলেন। কিন্তু তাঁর মনে এখনও একটি সংশয় রয়ে গেল।

তিনি বললেন—

"রাজপুত্র, আপনাকে আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু আপনার পুত্ররা? একদিন যদি আপনার সন্তান জন্মায়, তারা কি সিংহাসনের দাবি করবে না?"

প্রশ্নটি শুনে চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দেবব্রত কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। কারণ এই প্রশ্নের উত্তরই বদলে দিতে চলেছে ইতিহাস।

এমন একটি উত্তর, যা শুনে দেবতা, ঋষি, মানুষ—সবাই বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যাবে।

এমন একটি প্রতিজ্ঞা, যার কারণে দেবব্রত আর দেবব্রত থাকবেন না তিনি হয়ে উঠবেন—ভীষ্ম।

যে প্রতিজ্ঞার সামনে দেবতারাও বিস্ময়ে বলেছিলেন — "এতো ভীষণ!"

কী সেই প্রতিজ্ঞা, যা এক যুবরাজের ব্যক্তিগত জীবনকে চিরতরে শূন্য করে দিল?

আর সেই প্রতিজ্ঞাই কি একদিন কুরুবংশের পতনের বীজ বপন করেছিল?

মহাভারতের যুদ্ধ এক প্রজন্মের সিদ্ধান্তের ফলাফল ছিলো না, কয়েক প্রজন্মের সিদ্ধান্তের ছিলো আর এই প্রতিজ্ঞাই কি যুদ্ধের প্রথম বীজ বপন ছিলো?

০ মন্তব্য · ৫৫ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!