প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসশেষ ফোনকল পর্ব ৩ — শেষ সাক্ষী

গল্প ও উপন্যাস

শেষ ফোনকল পর্ব ৩ — শেষ সাক্ষী

শেষ ফোনকল পর্ব ৩ — শেষ সাক্ষী

শেষ ফোনকল

পর্ব ৩ — শেষ সাক্ষী

রাত ১০টা ৪৩ মিনিট।

পুরোনো রেলওয়ে গুদামটি শহরের একেবারে প্রান্তে।

বিজ্ঞাপন

চারপাশে কুয়াশা।

দূরে রেললাইনের ওপর মাঝে মাঝে ট্রেনের আলো দেখা যাচ্ছে। তারপর হুইসেল বাজিয়ে অন্ধকার কেটে চলে যাচ্ছে ট্রেন।

গোয়েন্দ আরিফ রহমা গাড়ি থেকে নামলেন।

তার ডান হাতে টর্চ।

বাম হাতে সার্ভিস পিস্তল।

কিন্তু তার মাথার ভেতর শুধু একটি প্রশ্ন ঘুরছে—যে মানুষটি তাকে এখানে ডেকেছে, সে কে?

রায়হান নয়।

সামিউল নয়।

তাহলে কে?

আর সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়—

লোকটি কীভাবে জানল যে তিন বছর আগে রায়হানের মামলায় আরিফ এমন কিছু দেখেছিল, যা তার মনে নেই?

আরিফ গুদামের বিশাল লোহার দরজার সামনে দাঁড়ালেন।

দরজাটি অল্প খোলা।

ভেতর থেকে হালকা আলো বের হচ্ছে।

তিনি পিস্তল বের করলেন।

ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুক

১. শেষ সাক্ষাৎ

গুদামের মাঝখানে একটি কাঠের চেয়ার।

চেয়ারে বসে একজন মানুষ।

মুখ ছায়ার মধ্যে।

আরিফ টর্চের আলো ফেললেন।

লোকটি ধীরে মাথা তুলল।

তার মুখ দেখে আরিফ থমকে গেলো কাদের।

সামিউল করিমের বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী।

আরিফ পিস্তল তাক করলেন।

— হাত ওপরে।

কাদের ধীরে হাত তুলল।

তারপর মৃদু হাসল।

— আপনি অবশেষে এসেছেন।

— আমাকে এখানে ডেকেছিলে তুমি?

— না।

— তাহলে কে?

কাদের কিছু বলল না।

আরিফ এগিয়ে গেলেন।

— তিন বছর আগে রায়হানের সঙ্গে কী হয়েছিল?

কাদের এবার নিচু গলায় বলল,

— আপনি সত্যিই কিছু মনে করতে পারছেন না?

— কী?

— সেই রাতের কথা।

আরিফের মাথায় হঠাৎ প্রচণ্ড চাপ অনুভূত হলো।

এক মুহূর্তের জন্য চোখের সামনে ভেসে উঠল—

একটি অন্ধকার ঘর।

একজন মানুষ মাটিতে পড়ে আছে।

রক্ত।

একটি কালো গাড়ি।

আর একজন চিৎকার“আরিফ, পেছনে তাকাবেন না!”

তিনি চোখ বন্ধ করলেন।

দৃশ্যটা মিলিয়ে গেল।

কাদের বলল,

— মনে পড়ছে?

আরিফ চোখ খুললেন।

— তুমি কী করেছিলে আমার সঙ্গে?

— আমি কিছু করিনি।

— তাহলে কে?

কাদের বলল,

ডাক্তার।

আরিফ থমকে গেলেন।

— কোন ডাক্তার?

কাদের উত্তর দেওয়ার আগেই গুদামের পেছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল—

আমি।

আরিফ ঘুরে দাঁড়ালেন।

অন্ধকার থেকে একজন বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন।

সাদা চুল।

চশমা।

ধূসর কোট।

আরিফ তাকে চিনতে পারলেন ডা. মাহবুব হাসান।

রায়হান কবিরের তিন বছর আগের ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার।

আরিফের পিস্তল আরও শক্ত হয়ে উঠল।

— আপনি?

ডাক্তার শান্তভাবে বললেন,

— হ্যাঁ।

— রায়হানের ময়নাতদন্ত আপনি করেছিলেন।

— করেছিলাম।

— তাহলে বলুন—

আরিফ এক পা এগিয়ে গেল সেদিন লাশটা কার ছিল?

ডাক্তার কোনো উত্তর দিলেন না।

কয়েক সেকেন্ড পর তিনি বললেন—

— রায়হানের নয২. আসল লাশ

গুদামের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

আরিফ ধীরে বললেন,

— তাহলে তিন বছর ধরে সবাইকে মিথ্যা বলা হয়েছে?

ডাক্তার মাথা নেড়ে বললেন,

— শুধু আপনাকে নয়। পুরো তদন্ত ব্যবস্থাকে।

— কেন?

— কারণ রায়হান এমন একটা তথ্য আবিষ্কার করেছিল, যা প্রকাশ পেলে অনেক বড় মানুষ ধ্বংস হয়ে যেত।

— কারা?

ডাক্তার তাকালেন কাদেরের দিকে।

তারপর বললেন—

— সামিউল করিম একা ছিল না।

আরিফ বললেন,

— আমি সেটা জানি।

— না। আপনি পুরোটা জানেন না।

ডাক্তার একটি পুরোনো ফাইল বের করলেন।

ফাইলের ওপর CASE 17/09/2023

— রায়হান তার কোম্পানির আর্থিক জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছিল। কিন্তু সেই টাকা শুধু সামিউলের কোম্পানি থেকে সরানো হয়নি।

— কোথায় গিয়েছিল?

— কয়েকটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানে।

— মালিক?

ডাক্তার চুপ।

আরিফ বললেন,

— নাম বলুন।

ডাক্তার ধীরে একটি কাগজ বের করলেন।

আরিফ কাগজটি হাতে নিলেন।

তারপর পড়তে পড়তে তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।

কারণ তাল সামিউল করিম।

মেহরিন করিম।

রায়হান কবির।

আর শেষে—আরিফ রহমান।

আরিফ কাগজটা ছুড়ে ফেললেন।

— এটা মিথ্যা।

ডাক্তার বললেন,

— আপনার নামে টাকা লেনদেন হয়নি।

— তাহলে আমার নাম কেন?

— কারণ রায়হান আপনাকে ব্যবহার করেছিল।

— কীভাবে?

ডাক্তার বললেন,

— সে জানত, তার কিছু হলে আপনি সত্যিটা বের করবেন।

আরিফের মাথায় আবার ব্যথা শুরু হলো।

হঠাৎ আরেকটি স্মৃতি ফিরে এল।

তিন বছর আগে।

রাত।

রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি।

রায়হান তার সামনে।

রায়হান বলছে—

“আমি যদি কাল মারা যাই, কাউকে বিশ্বাস করবেন না।”

আরিফ জিজ্ঞেস করছেন—

“কাকে?”

রায়হানযে মানুষটা আপনার পাশে দাঁড়িয়ে আছ

আরিফ হঠাৎ চোখ খুললেন।

তার পাশে তখন কে ছিল?

তিনি মনে করতে পারছেন না।

৩. মুছে ফেলা স্মৃতি

ডা. মাহবুব বললেন,

— আপনাকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়নি।

— তাহলে?

— আপনাকে একটি ওষুধ দেওয়া হয়েছিল।

— কী ওষুধ?

— শক্তিশালী সেডেটিভ।

— স্মৃতি মুছে যায়?

— পুরোপুরি নয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের স্মৃতি অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে।

আরিফ তাকিয়ে রইলেন।

— কেন?

ডাক্তার বললেন,

— কারণ আপনি সবকিছু দেখেছিলেন।

— কী দেখেছিলাম?

ডাক্তার উত্তর দেওয়ার আগেই গুদামের বাইরে একটি গাড়ির শব্দ হলো।

সবাই চুপ।

হেডলাইটের আলো দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকল।

কাদের ফিসফিস করে বলল,

— তারা এসে গেছে।

আরিফ পিস্তল তুলে ধরলেন।

— কারা?

কাযারা সামিউলকে হত্যা করেছে।

৪. সামিউলের আসল খুনি

গুদামের দরজা ধীরে খুলল।

একজন নারী ভেতরে ঢুকলেন।

কালো পোশাক।

হাতে ছাতা।

মুখে কোনো ভয় নেই।

আরিফ টর্চের আলো ফেললেন।মেহরিন করিম।

আরিফ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

— আপনি?

মেহরিন শান্তভাবে বললেন,

— হ্যাঁ।

— সামিউলকে আপনি হত্যা করেছেন?

মেহরিন কোনো উত্তর দিলেন না।

আরিফ আবার বললেন,

— বলুন।

মেহরিন ধীরে ছাতাটা বন্ধ করলেন।

হ্যাঁ।

আরিফের চোখে বিস্ময়।

— কেন?

মেহরিন বললেন,

— কারণ সামিউল আমার ভাইকে হত্যা করেছিল।

— রায়হানকে?

— না।

আরিফ থমকে গেলেন।

— তাহলে?

মেহরিন বললেন,

— সামিউল আমার ভাইকে হত্যা করেনি।

— তাহলে রায়হান বেঁচে ছিল?

— ছিল।

— কোথায়?

মেহরিনের চোখে পানি এসে গেল।

— আমার ভাই তিন বছর আগে মারা যায়নি।

আরিফ ধীরে বললেন,

— তাহলে কে মারা গিয়েছিল?

মেহরিন বলল “আমার আরেক ভাই।”

নীরবতা।

আরিফ বুঝতে পারছিলেন না।

মেহরিন বললেন,

— আমাদের যমজ ভাই ছিল।

— যমজ?

— হ্যাঁ। রায়হান আর রাশেদ।

আরিফের মাথায় যেন বজ্রপাত হলো।

মেহরিন বললেন,

— রাশেদকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু তার মুখ রায়হানের সঙ্গে এতটাই মিল ছিল যে সামিউল পুরো পরিকল্পনা করে লাশটাকে রায়হান হিসেবে চালিয়ে দেয়।

আরিফ ফিসফিস করে বললেন,

— আর আপনি?

— আমি জানতাম।

— তাহলে পুলিশকে বলেননি কেন?

মেহরিন চোখ বন্ধ করলেন।

— কারণ আমি তখন সামিউলকে ভয়৫. রায়হান কোথায়আরিফ বললেন,

— রায়হান এখন কোথায়?

মেহরিন উত্তর দেওয়ার আগেই পেছন থেকে একটি কণ্ঠ এল—এখানে।

আরিফ ঘুরে দাঁড়ালেন।

গুদামের অন্ধকার অংশ থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এল।

লম্বা।

দাড়ি।

মুখে বয়সের ছাপ।

কিন্তু চোখ—

সেই চোখ আরিফ ছবিতে দেখেছেন।

অসংখ্যবার রায়হান কবির।

আরিফ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলেন না।

রায়হান বলল,

— আমাকে দেখে অবাক হয়েছেন?

আরিফ ধীরে পিস্তল নামালেন।

— তুমি বেঁচে আছ?

রায়হান হেসে বলল,

— তিন বছর ধরে।

— তাহলে সামিউলকে কে ভয় দেখাচ্ছিল?

— আমি।

— ফোন?

— আমি।

— “UNKNOWN NUMBER”?

— আমার।

— রায়হানের পুরোনো সিম?

— সেটাও আমার কাছে ছিল।

আরিফ বললেন,

— কিন্তু সামিউলের মৃত্যু?

রায়হান মেহরিনের দিকে তাকাল।

— ও করেছে।

মেহরিন মাথা নিচু

৬. কিন্তু একটা প্রশ্ন বাকি

আরিফ বললেন,

— তাহলে সবকিছু পরিষ্কার।

রায়হান মাথা নেড়ে বলল,

— না।

আরিফ তাকালেন।

— এখনও একটা প্রশ্নের উত্তর আপনি জানেন না।

— কোন প্রশ্ন?

রায়হান বলল,সামিউলকে শেষ পর্যন্ত কে ফাঁদে ফেলেছিল?

আরিফ চুপ।

রায়হান বলল,

— আমি শুধু তাকে ভয় দেখিয়েছি। ভিডিও পাঠিয়েছি। পুরোনো ফাইলের কথা মনে করিয়ে দিয়েছি।

— কিন্তু তাকে হত্যা করার সুযোগ?

— মেহরিনের ছিল।

মেহরিন বললেন,

— আমি তাকে বিষ দিয়েছি।

আরিফ বললেন,

— কীভাবে?

— পানির বোতলে।

আরিফের চোখে পর্ব ১-এর সেই দৃশ্য ভেসে উঠল।

স্টাডির দরজা ভেতর থেকে লক।

পানির বোতল।

কালো সুতো।

দরজার নিচের ছায়া।

হঠাৎ সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল।

— আপনি ঘরে ঢোকেননি।

মেহরিন মাথা নেড়ে বললেন,

— না।

— আপনি বাইরে দাঁড়িয়ে বোতলের ঢাকনা খুলেছিলেন?

— হ্যাঁ।

— কালো সুতো দিয়ে?

— হ্যাঁ।

— তারপর সুতো টেনে বোতলের ঢাকনা খুলেছিলেন?

মেহরিন বললেন,

— সামিউল তখন দরজার কাছে এসেছিল। আমি তাকে বলেছিলাম, বাইরে কেউ আছে।

— সে দরজা খুলতে এগিয়ে আসে।

— হ্যাঁ।

— আর তখনই আপনি সুতো টেনে বোতলটা খুলে দেন?

মেহরিন মাথা নেড়ে বললেন,

— তারপর সে পানি খায়।

আরিফ ধীরে বললেন,

— কিন্তু এতে সামিউলের মৃত্যু নিশ্চিত ছিল না।

মেহরিন বললেন,

— আমি জানতাম।

— তাহলে?

মেহরিন বললেন,

— সামিউলকে আমি শুধু বিষ দিইনি।

তিনি ব্যাগ থেকে একটি ছোট কাচের শিশি বের করলেন।

— তার কফিতে ঘুমের ওষুধ দিয়েছিলাম।

আরিফ বললেন,

— কিন্তু কফিতে বিষ ছিল না।

— বিষ ছিল পানিতে।

সবকিছু মিলতে শুরু করল।

কফি—

ঘুমের ওষুধ।

পানি—

বিষ।

দরজা—

ভেতর থেকে লক।

খুনি—

বাইরে।

আর কালো সুতো—

পুরো পরিকল্পনার মূল

৭. কিন্তু রায়হান?আরিফ রায়হানের দিকে তাকালেন।

— তুমি তিন বছর কোথায় ছিলে?

রায়হান বলল,

— লুকিয়ে।

— কার কাছ থেকে?

— সামিউল এবং তার সহযোগীদের কাছ থেকে।

— তাহলে এতদিন পর ফিরে এলে কেন?

রায়হান বলল,

— কারণ শেষ মানুষটাকেও থামাতে হয়েছে।

আরিফ জিজ্ঞেস করলেন,

— শেষ মানুষ?

রায়হান উত্তর দেওয়ার আগেই গুদামের আলো নিভে গেল।

সবাই চমকে উঠল।

একটি শব্দ ধাম!

কেউ মাটিতে পড়ে গেল।

আলো ফিরে আসার পর দেখা গেল—

ডা. মাহবুব মাটিতে পড়ে আছেন।

আর তার পাশে রক্তাক্ত একটি ছুরি।

আরিফ ছুটে গেলেন।

ডাক্তার তখনও জীবিত।

তিনি কষ্ট করে বললেন—

রায়হান... তোমার ভাইকে সামিউল হত্যা করেনি।

আরিফ তাকালেন রায়হানের দিকে।

রায়হানের মুখ ফ্যাকাশে।

ডাক্তার বললেন—

— রাশেদকে...

তিনি শ্বাস নিতে কষ্ট করলেন।তুমি নিজেই হত্যা করেছিলে।

গুদাম নিস্তব্ধ।

মেহরিন চিৎকার করে উঠলেন—

— না!

রায়হান এক পা পিছিয়ে গেল।

— ডাক্তার...

ডাক্তার বললেন,

— সত্যিটা বলার সময় এসেছ

৮. আসল রাত

তিন বছর আগে।

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩।

রায়হান তার কোম্পানির গোপন হিসাব খুঁজে পেয়েছিল।

কিন্তু সে জানত না—

রাশেদও একই হিসাব খুঁজছিল।

দুই ভাইয়ের মধ্যে তর্ক হয়।

রাশেদ সামিউলের সঙ্গে কাজ করছিল।

রায়হান তাকে বিশ্বাসঘাতক মনে করে।

সেই রাতে দুজনের মধ্যে মারামারি হয়।

রাশেদ পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পায়।

রায়হান ভেবেছিল—

সে মারা গেছে।

ঠিক তখন সামিউল আসে।

সে রায়হানকে বলে—

“তুমি যদি বাঁচতে চাও, তাহলে এখনই অদৃশ্য হয়ে যাও।”

তারপর তারা রাশেদের মৃতদেহকে রায়হান হিসেবে সাজিয়ে দেয়।

কিন্তু রাশেদ তখনও পুরোপুরি মারা যায়নি।

ময়নাতদন্তের সময় ডা.লাশটি রায়হানের নয়।

তিনি সত্যিটা জানতেন।

আর আরিফ ঘটনাস্থলে গিয়ে কিছু একটা দেখে ফেলেছিলেন।

সামিউল তাই আরিফকেও সরিয়ে দিতে চেয়েছিল।

তাকে সেডেটিভ দেওয়া হয়।

ঘটনার পর তার স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যায়।

আর রায়হান পালিয়ে যায়।

কিন্তু তিন বছর পর—

৯. শেষ সত্য

আরিফ রায়হানের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— তাহলে তুমি তোমার নিজের ভাইকে হত্যা করোনি, কিন্তু তার মৃত্যুর জন্য দায়ী তুমি?

রায়হানের চোখে পানি।

— আমি তাকে মারতে চাইনি।

— কিন্তু তুমি ভেবেছিলে সে মারা গেছে।

— হ্যাঁ।

— তারপরও তুমি পালিয়ে গেলে।

রায়হান মাথা নিচু করল।

— আমি ভয় পেয়েছিলাম।

আরিফ বললেন,

— আর তিন বছর পর তুমি প্রতিশোধ নিতে ফিরে এলে।

রায়হান চুপ।

মেহরিন কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

— রায়হান শুধু সত্যিটা প্রকাশ করতে চেয়েছিল।

আরিফ বললেন,

— সত্যি প্রকাশ করার জন্য সামিউলকে ভয় দেখানো যেত। কিন্তু হত্যা?

মেহরিন মাথা নিচু করলেন।

— আমি করেছি।

আরিফ তার দিকে তাকালেন।

তারপর হাতকড়া বের করলেন।

মেহরিন নিজের হাত এগিয়ে দিলেন।

— আমাকে গ্রেপ্তার করুন।

আরিফ হাতকড়া পরিয়ে দিলেন।

রায়হানও নিজের হাত এগিয়ে দিল।

— আমাকেও।

আরিফ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

— তোমার অপরাধ আলাদা।

রায়হ১০. শেষ ফোনকল

ভোর ৪টা।

পুলিশের গাড়ি গুদাম থেকে বেরিয়ে গেল।

মেহরিন ও রায়হানকে নিয়ে আলাদা গাড়ি।

ডা. মাহবুবকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

আরিফ একা দাঁড়িয়ে রইলেন রেললাইনের পাশে।

তার ফোনে আবার একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।

তিনি রিসিভ করলেন।

কেউ কথা বলল না।

শুধু ট্রেনের শব্দ।

টিক...

টিক...

টিক...

তারপর একটি রেকর্ড করা কণ্ঠ ভেসে এল।

সামিউল করিমের কণ্ঠ।

“আরিফ...”

আরিফ স্থির হয়ে গেলেন।

“যদি তুমি এই ফোনটা শোনো, তার মানে আমি মারা গেছি।”

একটু বিরতি।

“কিন্তু আমার মৃত্যুর জন্য মেহরিন দায়ী নয়।”

আরিফের চোখ বড় হয়ে গেল।

রেকর্ডিং চলতে থাকল।

“আমি জানতাম মেহরিন আমাকে হত্যা করতে চাইবে। তাই তাকে আমি ইচ্ছা করেই সুযোগ দিয়েছি।”

“কারণ আমি জানতাম, সত্যিটা একদিন বের হবেই।”

তারপ“কিন্তু যে মানুষটা রায়হানকে লুকিয়ে রেখেছিল... তাকে এখনো তুমি ধরতে পারোনি।”

রেকর্ডিং শেষ।

আরিফ ধীরে ফোন নামালেন।

তার মনে হলো—

গল্প শেষ হয়নি।

তিনি দ্রুত রায়হানের গাড়ির দিকে ছুটলেন।

কিন্তু গাড়ি ইতিমধ্যে চলে গেছে।

আরিফ পুলিশ কন্ট্রোলে ফোন করলেন।

— গাড়িটা থামাও।

ওপাশ থেকে উত্তর এল—

— স্যার, কোন গাড়ি?

— রায়হান আর মেহরিনকে যে গাড়িতে নেওয়া হয়েছে।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর—

— স্যার.ওই নামে কোনো পুলিশ গাড়ি বের হয়নি।

আরিফের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

— কী বলছ?

— মেহরিন আর রায়হানকে অন্য একটা গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

— কার গাড়ি?

— সেটা পুলিশ গাড়ি ছিল না।

— নম্বর?

ওপাশ থেকে নম্বর বলা হলো।

আরিফ নম্বরটা শুনে স্থির হয়ে গেলেন।

এই নম্বরটি তিসামিউল করিমের পুরোনো কালো গাড়ি।

যে গাড়িটা তিন বছর আগে রায়হানের মৃত্যুর রাতে ঘটনাস্থলে ছিল।

আরিফ ফিসফিস করে বললেন—

— তাহলে...

তিনি আকাশের দিকে তাকালেন।সামিউল মারা যাওয়ার আগেই সবকিছু পরিকল্পনা করে গিয়েছিল

১১. শেষ প্রমাণ

সকাল ৬টা ১২।

আরিফ সামিউলের বাড়িতে ফিরে এলেন।

স্টাডি রুম সিল করা।

তিনি ডেস্কের কাছে গেলেন।

ল্যাপটপ খুললেন।

একটি নতুন ফোল্ডার।

নাম—“FOR ARIF — AFTER MY DEATH”

আরিফ ফোল্ডারটি খুললেন।

ভেতরে মাত্র একটি ভিডিও।

ভিডিও চালু হলো।

সামিউল করিম ক্যামেরার সামনে বসে।

কিন্তু এবার তার মুখে ভয় নেই।

সে বলল—

“আরিফ, তুমি যদি এখানে এসে পৌঁছাও, তাহলে তুমি অনেকটা সত্যি জেনে গেছ।”

“কিন্তু শেষ সত্যিটা এখনও তোমার অজানা।”

“রায়হান তিন বছর আগে মারা যায়নি।”

“আর আমি আজ মারা গেলেও গল্প এখানেই শেষ হবে না।”

সামিউল একটু হাসল।

তারপর বলল—

“কারণ রায়হানের গোপন হিসাবের আসল মালিক আমি নই।”

আরিফ সামনে ঝুঁকলেন।

সামিউল বলল “মালিক এমন একজন, যাকে তুমি খুব ভালোভাবে চেনো।”

ভিডিও বন্ধ।

স্ক্রিন কালো।

তারপর একটি নাম ভেসে উঠল।

আরিফের মুখ শুকিয়ে গেল।

কারণ নামটি—আরিফ রহমান।

ভিডিওর নিচে লেখা—

“তোমার নিজের কেস ফাইল আবার পড়ো।”

আরিফ দ্রুত পুরোনো কেস ফাইল খুললেন।

তিন বছর আগের তদন্ত রিপোর্ট।

শেষ পাতায় তার নিজের স্বাক্ষর।

কিন্তু নিচে একটি অতিরিক্ত লাইন“ঘটনাস্থলে পাওয়া তৃতীয় ব্যক্তির পরিচয় অজ্ঞাত।”

আরিফ হঠাৎ বুঝতে পারলেন—

তৃতীয় ব্যক্তি কে ছিল, সেটাই আসল রহস্য।

তিনি পুরোনো ছবি বের করলেন।

ছবিতে—

রায়হানের লাশ।

সামিউল।

আর তরুণ আরিফ।

কিন্তু ছবির একেবারে কোণে—

অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ।

আরিফ ছবিটা জুম করলেন।

তারপর স্থির হয়ে গেলেন।

লোকটির মুখ দেখা যাচ্ছে।

তিনি সেই মুখ চিনতেন।

অত্যন্ত ভালোভাবে চিনতেন।

কারণ লোকটিতিন বছর আগে মারা যাওয়া রায়হানের বাবা।

কিন্তু কেস ফাইলে লেখা ছিলরায়হানের বাবা মারা গেছেন ২০১৯ সালে।

আরিফ ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

তার ফোন আবার বেজে উঠল।

UNKNOWN NUMBER।

তিনি রিসিভ করলেন।

ওপাশে বৃদ্ধ কণ্ঠ—

— গোয়েন্দা সাহেব...

আরিফ বললেন,

— আপনি কে?

কণ্ঠটি হেসে বলল আপনি যাকে মৃত ভাবছেন, তাদের তালিকাটা অনেক লম্বা।

কল কেটে গেল।

আরিফ জানালার বাইরে তাকালেন।

সকাল হয়ে গেছে।

সূর্য উঠছে।

কিন্তু তার মনে হলো—

এই শহরের অন্ধকারটা এখনও কাটেনি।

কারণ শেষ ফোনকলটি আসলে শেষ ফোনকল ছিল না।

এটা ছিল—

আরেকটি হত্যার শুরু।


সমাপ্ত

০ মন্তব্য · ৯৯ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!