প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসহযরত খিজির (আ.)

গল্প ও উপন্যাস

হযরত খিজির (আ.)

হযরত খিজির (আ.)

এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে রবের কাছে ফরিয়াদ করতেন, যেন জীবনে অন্তত একবার হযরত খিজির (আ.)-এর সাথে তার সাক্ষাৎ হয়।


বিজ্ঞাপন

অনেক অপেক্ষার পর একদিন সত্যিই তার দোয়া কবুল হয়ে গেল। খিজির (আ.)-কে সামনে পেয়ে লোকটি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল। সে সঙ্গে সঙ্গে বলে বসল,


"হুজুর! আপনি আল্লাহর কাছে আমার জন্য একটা দোয়া করে দিন। আমি অগাধ সম্পদের মালিক হতে চাই, যেন দুনিয়াতে আমার আর কোনো অভাব বা দুশ্চিন্তা না থাকে। আমি একদম শান্তিতে বাঁচতে চাই!"


খিজির (আ.) মুচকি হেসে বললেন, "ভাই, এই দুনিয়াটা তো দুশ্চিন্তামুক্ত থাকার জায়গা নয়। মানুষের বাইরের চাকচিক্য দেখে ধোঁকা খেয়ো না।"


কিন্তু লোকটি নাছোড়বান্দা। সে বারবার একই জিদ করতে লাগল। তখন খিজির (আ.) তাকে একটি শর্ত দিলেন।


তিনি বললেন, "ঠিক আছে, তোমাকে তিন দিনের সময় দিলাম। তুমি গোটা শহর ঘুরে এমন একজন মানুষ খুঁজে বের করো, যার মনে কোনো দুঃখ নেই, যে পুরোপুরি শান্তিতে আছে। তাকে এনে দেখালে, আমি তোমার জন্য ঠিক তার মতো হওয়ার দোয়া করে দেব।"


লোকটি মহা উৎসাহে খুঁজতে বের হলো। কিন্তু অবাক হয়ে দেখল, যার অনেক টাকা, তার রাতে ঘুম নেই; যার শরীর সুস্থ, তার ঘরে অশান্তি; যার ক্ষমতা আছে, তার মনে অজানা ভয়। একশভাগ সুখী মানুষ যেন কোথাও নেই!


খুঁজতে খুঁজতে সে এক বিখ্যাত রত্ন ব্যবসায়ীর (জহুরি) খোঁজ পেল। বিশাল রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি, দাস-দাসী গিজগিজ করছে, অপরূপ সুন্দরী স্ত্রী আর ফুটফুটে সন্তানদের নিয়ে তার হাসিখুশি সংসার। 


বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, এর চেয়ে সুখী মানুষ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই!


লোকটি ভাবল, "পেয়ে গেছি! আমি এই জহুরির মতোই হতে চাইব।"


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সে জহুরির সাথে একা কথা বলতে গেল। কিন্তু লোকটির মুখে সব কথা শোনার পর জহুরির মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।


জহুরি বললেন, "আল্লাহর ওয়াস্তে ভাই! আর যা-ই চাও, অন্তত আমার মতো জীবন কখনও চেয়ো না!"


এরপর জহুরি যে কাহিনী শোনাল, তা শুনে লোকটি স্তব্ধ হয়ে গেল।


জহুরি বলল, "একবার আমার স্ত্রী ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসকরা জানিয়ে দিল, সে আর বাঁচবে না। স্ত্রীকে আমি পাগলের মতো ভালোবাসতাম। সে মৃত্যুর আগে আমাকে বলল,


‘আমি তো মরেই যাব, এরপর তুমি নিশ্চয়ই আরেকটা বিয়ে করবে?’ আমি আবেগের বশবর্তী হয়ে বললাম, ‘কখনোই না!’ কিন্তু সে কিছুতেই বিশ্বাস করছিল না।


তাকে বিশ্বাস করানোর জন্য, আবেগের বশে আমি নিজের পুরুষত্বটাই চিরতরে নষ্ট করে ফেলি, যাতে আর কোনোদিন বিয়ে করতে না পারি!


কিন্তু আল্লাহর কী কুদরত, কিছুদিন পর আমার স্ত্রী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠল। আর আমার অক্ষমতার সুযোগ নিয়ে সে নিজের বাড়ির চাকর-বাকরদের সাথে নোংরা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল।"


জহুরি কাঁদতে কাঁদতে বলল, "আজ তুমি যাদেরকে আমার সন্তান ভেবে আমার সুখের প্রশংসা করছ, এরা আসলে কেউই আমার রক্তের নয়! আমি প্রতিদিন নিজের চোখের সামনে এসব নোংরামি দেখি, কিন্তু সমাজের বুকে মুখ দেখানোর লজ্জায় টুঁ শব্দটিও করতে পারি না। আমি প্রতিদিন তিলে তিলে মরছি ভাই!"


এই ভয়ংকর সত্য শুনে লোকটির চোখ খুলে গেল। তিনদিন পর সে হযরত খিজির (আ.)-এর কাছে কাঁদতে কাঁদতে বলল,


"হুজুর, আমার আর কোনো ধন-সম্পদ বা আরামের জীবন চাই না। আপনি শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, তিনি যেন আমার অন্তরে তাঁর খাঁটি মহব্বত আর দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করেন।"


অন্যের হাসিমাখা মুখ আর সুন্দর লাইফস্টাইল দেখে কখনো আফসোস করবেন না। কারণ, প্রতিটি চকচকে জীবনের আড়ালে এমন অনেক নীরব কান্না লুকিয়ে থাকে, যা পৃথিবীর কেউ দেখতে পায় না! যে অবস্থাতেই আছেন, আলহামদুলিল্লাহ বলুন।


তথ্যসূত্র:

 دین و دنیا ،طريق النجاة ص ۲۷۰

(مالداری اور غریبی ص ۱۷) 

حکیم الامت مولانا اشرف علی تھانوی رحمہ اللہ

০ মন্তব্য · ৬৯ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!