কাঞ্চনজঙ্ঘার খোঁজে: তেঁতুলিয়ার পথে এক সোনালি সকাল
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে আসছে, কিন্তু ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনালে তখনো মানুষের আনাগোনা। কাঁধে ছোট ব্যাকপ্যাক, হাতে ক্যামেরা আর বুকভরা উত্তেজনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীলয় রহমান। বয়স সাতাশ। বহুদিনের একটা স্বপ্ন পূরণ করতে আজ সে ছুটছে দেশের একেবারে উত্তরের প্রান্তে—পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। উদ্দেশ্য একটাই, বাংলাদেশের মাটি থেকে হিমালয়ের বিশাল পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘাকে নিজের চোখে দেখা।
কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি নীলয় বহুবার দেখেছে। কখনো বইয়ের পাতায়, কখনো ইন্টারনেটে, কখনো আবার ভ্রমণপিপাসু মানুষের ক্যামেরায় ধরা পড়া অসাধারণ সব দৃশ্যে। কিন্তু ছবিতে দেখা আর বাস্তবে সামনে দাঁড়িয়ে সেই বিশাল পর্বতমালাকে দেখার মধ্যে যে কতটা পার্থক্য, তা অনুভব করার সুযোগ এখনো তার হয়নি। কয়েক দিন ধরেই আবহাওয়া পরিষ্কার হওয়ার খবর রাখছিল সে। অবশেষে আকাশ অনুকূলে থাকার সম্ভাবনা দেখে আর অপেক্ষা করতে পারেনি।
বাস ছাড়তেই জানালার পাশে নিজের জায়গায় বসে পড়ল নীলয়। শহরের আলো পেছনে পড়ে রইল। ধীরে ধীরে বাস এগিয়ে চলল উত্তরের পথে। রাত যত গভীর হলো, রাস্তার পাশের দোকানপাট আর জনবসতি ততই ফিকে হয়ে এল। মাঝেমধ্যে বাস থামছে, যাত্রীরা চা খাচ্ছেন, কেউ একটু হাঁটাহাঁটি করছেন। নীলয়ের চোখে অবশ্য ঘুম নেই। মনের মধ্যে বারবার ভেসে উঠছে বরফে ঢাকা পাহাড়ের ছবি।
দীর্ঘ যাত্রার পর ভোরের দিকে যখন পঞ্চগড়ের কাছাকাছি পৌঁছাল বাস, তখন চারপাশে অন্য রকম এক পরিবেশ। বাতাসে হালকা শীতের ছোঁয়া, আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে এসে নীলয়ের মনে হলো, এই যাত্রার আনন্দ যেন গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই শুরু হয়ে গেছে।
তেঁতুলিয়ায় পৌঁছে প্রথমেই সে গেল ডাকবাংলো-সংলগ্ন মহানন্দা নদীর পাড়ে। জায়গাটির সৌন্দর্য চোখে পড়ার মতো। নদীর ওপারে ভারতীয় ভূখণ্ড, চারপাশে খোলা আকাশ, আর পাড়জুড়ে ছোট ছোট দলে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। কারও হাতে দূরবীন, কারও হাতে মুঠোফোন, কেউ আবার ক্যামেরার লেন্স ঠিক করছেন। সবার চোখ উত্তরের দিকে।
নীলয়ও নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল।
প্রথমে কিছুই স্পষ্ট বোঝা গেল না। দূরের আকাশে হালকা কুয়াশা আর মেঘের আস্তরণ। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন—আজ নাকি পাহাড় দেখা যাচ্ছে। কেউ বললেন, একটু ধৈর্য ধরতে হবে। কেউ আবার দূরের অস্পষ্ট সাদা রেখার দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছিলেন।
নীলয় ক্যামেরা বের করে জুম বাড়াল। তারপর হঠাৎই তার চোখ আটকে গেল উত্তরের দিগন্তে।
দূর আকাশের গায়ে যেন সাদা রঙে আঁকা এক বিশাল পর্বতমালা। মেঘের আড়াল ভেদ করে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। প্রথমে দৃশ্যটা বিশ্বাস করতে একটু সময় লাগল। যে পাহাড় এত দিন কেবল ছবির ভেতর ছিল, সেই পাহাড়ই আজ বাংলাদেশের মাটি থেকে তার চোখের সামনে!
মুহূর্তের জন্য নীলয় চুপ করে রইল। চারপাশের মানুষের কথা, ক্যামেরার ক্লিক, নদীর ওপার থেকে ভেসে আসা অস্পষ্ট শব্দ—সবকিছু যেন দূরে সরে গেল। সে শুধু তাকিয়ে রইল সেই বিশাল শ্বেতশুভ্র পর্বতশৃঙ্গের দিকে।
কিছুক্ষণ পর নিজের অজান্তেই হাসল নীলয়। ক্যামেরা তুলে একের পর এক ছবি তুলতে শুরু করল। কখনো পাহাড়কে ফ্রেমের মাঝখানে রাখছে, কখনো নদীর পাড় আর সকালের আকাশকে সঙ্গে নিয়ে পুরো দৃশ্যটা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তবু তার মনে হচ্ছিল, ছবিতে যত সুন্দরই আসুক, চোখের সামনে দাঁড়িয়ে দেখার অনুভূতিটা কোনো ক্যামেরায় পুরোপুরি ধরা সম্ভব নয়।
সকালের সূর্য ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিল। আলো বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘার চেহারাও যেন বদলে যেতে লাগল। ভোরের ফিকে সাদা রং ধীরে ধীরে সোনালি আভা ধারণ করল। মনে হচ্ছিল, দূরের বরফে ঢাকা চূড়াগুলোর গায়ে কেউ যেন অদৃশ্য হাতে সোনার প্রলেপ লাগিয়ে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর সেই সোনালি আভা ম্লান হয়ে পাহাড়গুলো আবার শ্বেতশুভ্র রূপে ফিরে এল।
নীলয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন আরেক পর্যটক, সায়মা ইসলাম। স্বামী আর ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে এসেছেন নওগাঁ থেকে। কথা বলতে গিয়ে জানালেন, অনেক দিন ধরেই তাঁর ইচ্ছা ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার। পরিবারের সবাই মিলে কয়েক দিন ধরে পরিকল্পনা করে অবশেষে তেঁতুলিয়ায় এসেছেন।
সায়মা হেসে বললেন, “ছবিতে অনেক সুন্দর লাগে, কিন্তু সামনে থেকে দেখে মনে হচ্ছে, এত দিন আসলে কিছুই দেখিনি। এই দৃশ্য নিজের চোখে না দেখলে বোঝানো যাবে না।”
কথাটা নীলয়ের মনেও গভীরভাবে দাগ কাটল। সত্যিই তো, কিছু সৌন্দর্য আছে, যেগুলোকে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। শুধু ছবি তুলে কিংবা অন্যের বর্ণনা শুনে সেগুলোর পুরোটা অনুভব করা যায় না।
নদীর পাড়ে সময় কাটাতে কাটাতে নীলয় বুঝতে পারল, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে এখানে শুধু তরুণ পর্যটকেরাই আসেননি। কেউ এসেছেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ আবার একাই। দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে এসেছেন এই বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হতে। অনেকেই আগের রাতটা তেঁতুলিয়ায় কাটিয়েছেন, যাতে ভোরের আলোয় পাহাড় দেখার সুযোগ হাতছাড়া না হয়।
স্থানীয় মানুষের জীবনেও এই পাহাড় যেন এক নতুন ব্যস্ততা নিয়ে আসে। পর্যটকের ভিড়ে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো সরগরম হয়ে ওঠে। চায়ের দোকানে বাড়ে আড্ডা, রিকশা-ভ্যান আর ইজিবাইকের চালকেরা পান বাড়তি যাত্রীর দেখা। কেউ পর্যটকদের বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন, কেউ আবার চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখার গল্প করছেন।
নীলয়ও নদীর পাড় থেকে উঠে কাছের একটি চায়ের দোকানে গেল। ছোট্ট দোকানটিতে গরম চায়ের ধোঁয়া উঠছে। এক কাপ চা হাতে নিয়ে সে আবারও উত্তরের আকাশের দিকে তাকাল। দূরের পাহাড় তখনো দৃশ্যমান, যদিও আলো আর আবহাওয়ার পরিবর্তনে তার রূপ কিছুটা বদলে গেছে।
দোকানের একজন স্থানীয় মানুষ জানালেন, সাধারণত অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের শেষ ভাগ পর্যন্ত আকাশ পরিষ্কার থাকলে তেঁতুলিয়া ও পঞ্চগড়ের বিভিন্ন জায়গা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যেতে পারে। তবে প্রতিদিন একই রকম দৃশ্য পাওয়া যায় না। মেঘ, কুয়াশা আর আবহাওয়ার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
নীলয় মনে মনে ভাবল, এই অনিশ্চয়তাই হয়তো ভ্রমণটাকে আরও বিশেষ করে তুলেছে। পাহাড় এখানে প্রতিদিন সবার সামনে ধরা দেয় না। কখনো সে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকে, কখনো আবার হঠাৎ করেই নিজেকে মেলে ধরে। তাকে দেখতে হলে অপেক্ষা করতে হয়, প্রকৃতির মর্জিকে সম্মান করতে হয়।
সকালের ব্যস্ততা একটু কমে এলে নীলয় নদীর পাড় ধরে হাঁটতে লাগল। একদিকে মহানন্দার শান্ত জল, অন্যদিকে দূরের পাহাড়ের রেখা। মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো, দেশের উত্তর প্রান্তে এসে সে যেন পরিচিত বাংলাদেশেরই এক নতুন রূপ আবিষ্কার করেছে। এখানে শহরের তাড়া নেই, যানজটের বিরক্তি নেই। আছে খোলা আকাশ, শীতল বাতাস আর দিগন্তজোড়া প্রকৃতি।
কাঞ্চনজঙ্ঘাকে ঘিরে তার এত দিনের কৌতূহল আজ এক অন্য অনুভূতিতে পরিণত হয়েছে। পাহাড় শুধু উঁচু বরফের চূড়া নয়; দূরত্বের ওপার থেকেও যে সৌন্দর্য মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলতে পারে, তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।
ফেরার আগে নীলয় শেষবারের মতো ক্যামেরা হাতে নিল। এবার আর শুধু পাহাড়ের ছবি তুলল না। ফ্রেমে রাখল মহানন্দার পাড়, সকালের আলো, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন পর্যটক আর আকাশের গায়ে ভেসে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘাকে। ছবিটা তুলে সে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর নিজের মনেই বলল, “কিছু জায়গায় শুধু ছবি তুলতে যাওয়া হয় না, নিজের ভেতরে কিছু স্মৃতি নিয়ে ফিরতেও যাওয়া হয়।”
সেদিন তেঁতুলিয়া থেকে নীলয় ফিরেছিল কয়েক শ ছবি আর ছোট্ট একটি ব্যাকপ্যাক নিয়ে। কিন্তু তার সঙ্গে ফিরেছিল আরও অনেক কিছু—ভোরের শীতল বাতাসের স্মৃতি, মহানন্দার পাড়ে কাটানো সোনালি সকাল, অচেনা মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া আনন্দ আর প্রথমবার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অবিস্মরণীয় অনুভূতি।
পৃথিবীর সব সৌন্দর্য হয়তো কাছে গিয়ে ছুঁয়ে দেখতে হয় না। কিছু সৌন্দর্য দূরে দাঁড়িয়েও মানুষের মন ছুঁয়ে যায়। তেঁতুলিয়ার আকাশে মাথা তুলে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা নীলয়কে সেই কথাটাই যেন নতুন করে শিখিয়ে দিল।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!