সারাদিন কেটেছে কাজে।
একটার পর একটা কাজ করেছেন।
কোনো ফাঁক ছিল না।
তবু রাতে যখন সবকিছু একটু থেমে যায়, ভেতরে কেমন একটা অস্বস্তি জেগে ওঠে।
তখন আবার ফোনটা হাতে নেন।
আরেকটা ভিডিও দেখেন।
আরেকটা কাজ খুঁজে নেন।
কারণ চুপ করে বসে থাকলেই মনে হয়, ভেতর থেকে কিছু একটা উঠে আসতে চায়।
আর সেটার মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করে না।
এখানেই একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
সব ব্যস্ততা এক রকম নয়।
কিছু ব্যস্ততা আসে দায়িত্ব থেকে। কাজ আছে, সংসার আছে, পড়াশোনা আছে—এসবের জন্য ব্যস্ত থাকা স্বাভাবিক।
কিন্তু কখনো কখনো আমরা ব্যস্ত থাকি অন্য একটা কারণে।
নিজের ভেতরের কিছু অনুভূতি থেকে দূরে থাকার জন্য।
মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় experiential avoidance।
সহজ ভাষায়, অস্বস্তিকর চিন্তা, অনুভূতি বা স্মৃতির মুখোমুখি না হয়ে কোনোভাবে সেগুলো থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা।
ধরুন, আপনার ভেতরে দুশ্চিন্তা, একাকিত্ব, অভিমান বা শূন্যতা কাজ করছে।
আপনি কাজে ডুবে গেলেন।
অল্প সময়ের জন্য অস্বস্তিটা কমে গেল।
তখন মস্তিষ্ক একটা শিক্ষা পেয়ে যায়—
“ব্যস্ত থাকলে এটা অনুভব করতে হয় না।”
পরেরবার একই অস্বস্তি এলে তাই আপনি আরও দ্রুত ফোন ধরেন, কাজ শুরু করেন, কারও সঙ্গে কথা বলেন কিংবা নিজেকে অন্য কোনো কিছুর মধ্যে ব্যস্ত করে ফেলেন।
এতে কিছুক্ষণের জন্য ভালো লাগতে পারে।
কিন্তু অনুভূতিটা আসলে সমাধান হয় না।
শুধু আপনার মনোযোগ অন্যদিকে সরে যায়।
তাই কাজ শেষ হলে, রাতে বিছানায় গেলে, ছুটির দিনে বা একা বসলে সেই অস্বস্তিটা আবার ফিরে আসতে পারে।
এ কারণেই কখনো কখনো সারাদিন খুব ব্যস্ত থাকার পরও রাতে মনে হয়—
“কেন যেন শান্তি পাচ্ছি না।”
আর এখানে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ক্লান্তি আর মানসিক ভার এক জিনিস নয়।
শরীর ক্লান্ত হলে বিশ্রাম দরকার।
কিন্তু মনের ভেতরে কোনো কথা জমে থাকলে, শুধু বিশ্রাম নিলেই সবসময় সেটা চলে যায় না।
কখনো সেটাকে বুঝতে হয়।
নাম দিতে হয়।
কখনো লিখে ফেলতে হয়।
কখনো কারও কাছে বলতে হয়।
যেমন—
“আমার আসলে খুব একা লাগছে।”
“আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পাচ্ছি।”
“ওই কথাটা আমাকে কষ্ট দিয়েছে।”
“আমি অনেকদিন ধরে নিজেকে সামলে রাখছি।”
অনুভূতিটাকে নির্দিষ্ট করে নাম দিতে পারাটাও গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনুভূতিকে ভাষায় এনে নির্দিষ্ট করে নাম দেওয়া আবেগের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
কারণ তখন আপনি শুধু অনুভূতিটা ভোগ করছেন না—আপনি সেটাকে লক্ষ্য করছেন এবং বোঝার চেষ্টা করছেন।
আর নিজের ভেতরের দিকে তাকানোর জন্য সবসময় অনেক সময়ও দরকার নেই।
প্রতিদিন পাঁচ মিনিট ফোনটা পাশে রেখে চুপচাপ বসে থাকা দিয়েও শুরু করা যায়।
শুরুতে অস্বস্তি লাগতে পারে।
মনে হবে, কিছু একটা করা দরকার।
ফোনটা দেখতে ইচ্ছে করবে।
কাজের কথা মনে পড়বে।
সেটা অস্বাভাবিক নয়।
ধীরে ধীরে মনকে শেখাতে হয়—
“আমি অস্বস্তি অনুভব করলেও তার থেকে সঙ্গে সঙ্গে পালাতে হবে না।”
ইসলামেও রাতের নীরব সময়ের একটা বিশেষ গুরুত্ব আছে।
আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয় রাতের বেলা জেগে ইবাদত করা আত্মসংযমের জন্য বেশি কার্যকর এবং স্পষ্টভাবে কথা বলার জন্য বেশি উপযোগী।”
— সূরা আল-মুযযাম্মিল, ৭৩:৬
রাতের এই নীরব সময় তাই নিজের ভেতরের অস্থিরতা থেকে পালানোর বদলে একটু থামার, আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার এবং নিজের অবস্থাটা বোঝারও একটা সুযোগ হতে পারে।
তাই আজ একটু থামুন।
সবকিছু ঠিক করার জন্য নয়।
শুধু নিজের ভেতরে কী চলছে, সেটা শোনার জন্য।
নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—
“আমি কি সত্যিই ব্যস্ত,
নাকি কিছু একটা থেকে দূরে থাকছি?”
উত্তরটা অস্বস্তিকর হতে পারে।
কিন্তু নিজের সত্যিকারের অবস্থাটা বুঝতে পারা—সেখান থেকেই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!