আমরা সবাই সারা জীবন একটা ভুল করি - ভালো সময়ে ভিড় গুনি, খারাপ সময়ে মানুষ চিনি না।
আধ্যাত্মিকতা বলে, ভালো সময়ে ঈশ্বর তোমাকে জীবনটা উপভোগ করতে দেন, আর খারাপ সময়ে তিনি তোমাকে সত্যিটা দেখতে দেন।
ভালো সময়টা হলো আলোর মতো, সবকিছু সুন্দর লাগে। খারাপ সময়টা হলো অন্ধকার ঘরে টর্চ জ্বালানোর মতো - তখনই বোঝা যায় ঘরের কোণায় কোথায় কী পড়ে আছে।
যখন তোমার হাতে টাকা আছে, ক্ষমতা আছে, হাসি আছে - তখন সবাই তোমার পাশে। সবাই তোমাকে ভালোবাসে। কিন্তু তারা কি তোমাকে ভালোবাসে, নাকি তোমার ভালো সময়টাকে ভালোবাসে?
খারাপ সময় হলো সেই ফিল্টার, সেই চালুনি - যা নকলকে ঝরিয়ে দেয়, আসলকে রেখে দেয়। ঈশ্বর কখনো কখনো তোমার জীবন থেকে সবকিছু কেড়ে নেন, তোমাকে শাস্তি দিতে নয়, তোমাকে দেখাতে - কে তোমার, আর কে তোমার সময়ের।
এই সময়টা অভিশাপ নয়, এটা আশীর্বাদ। কারণ মুখোশ পরে থাকা মানুষদের সাথে সারা জীবন থাকার চেয়ে, একবার খারাপ সময় এসে তাদের চিনিয়ে দেওয়া অনেক ভালো।
পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে।
"এক, মুখ - যারা যেমন ভেতরে, তেমনই বাইরে।" এরা কম কথা বলে, কিন্তু যখন বলে সত্যি বলে। তুমি ভালো থাকলেও এরা তোমার ভুল ধরিয়ে দেবে, খারাপ থাকলেও তোমার হাত ছাড়বে না। এদের সংখ্যা খুব কম। হয়তো ১০০ জনে ২-৩ জন।
"দুই, মুখোশ - যারা ভেতরে এক, বাইরে আরেক।" এরা তোমার সামনে মিষ্টি, পেছনে বিষ। তোমার সাফল্যে এরা হাততালি দেয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে হিংসা করে। তোমার দুঃখে এরা "আহা" বলে, কিন্তু ভেতরে খুশি হয়। এরা তোমার বন্ধু নয়, এরা তোমার অবস্থার বন্ধু।
সমস্যা হলো, ভালো সময়ে দুজনকেই একই রকম লাগে। দুজনেই হাসে, দুজনেই পাশে বসে। তফাৎটা বোঝা যায় না।
তফাৎটা বোঝা যায় যখন তোমার পকেট খালি হয়, যখন তোমার নামে বদনাম হয়, যখন তুমি বিছানায় পড়ে যাও, যখন তোমার কোনো কাজে কেউ আসবে না জেনেও তুমি কাউকে ডাকো।
তখন দেখবে, মুখোশগুলো এক এক করে খুলে পড়ছে। যাদের তুমি নিজের ভেবেছিলে, তারা ব্যস্ত হয়ে গেছে। ফোন ধরছে না, মেসেজ সিন করে রেখে দিচ্ছে।
আর তখনই, একদম কোণায়, যে মানুষটাকে তুমি কোনোদিন গুরুত্বই দাওনি, সে চুপচাপ এসে তোমার পাশে বসবে। কিছু বলবে না, শুধু বলবে - "চিন্তা করিস না, আমি আছি।"
ওটাই মুখ। বাকি সব মুখোশ ছিল।
খারাপ সময়কে ভয় পেও না, ধন্যবাদ দাও:----
আমরা খারাপ সময়কে ঘৃণা করি। বলি, কেন আমার সাথেই এমন হলো?
কিন্তু বাস্তবতা হলো, খারাপ সময় না এলে তুমি কোনোদিন বড় হতে পারতে না।
খারাপ সময় তোমাকে তিনটে জিনিস শেখায়, যা ভালো সময় কোনোদিন শেখাতে পারে না ----
১. মানুষ চিনতে শেখায়:--- কে আপন, কে পর, কে বন্ধু, কে শুধু পরিচিত - এটা শুধু খারাপ সময়ই চেনায়। এটা তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
২. নিজেকে চিনতে শেখায়:--- ভালো সময়ে আমরা নিজেকে ভুলে যাই। খারাপ সময়ে আমরা বুঝি, আমার ভেতরে কতটা শক্তি আছে। তুমি ভেবেছিলে তুমি ভেঙে যাবে, কিন্তু তুমি ভাঙোনি। তুমি টিকে গেছো। এই আবিষ্কারটা অমূল্য।
৩. জীবনের দাম শেখায়:--- রোদ কতটা দামি, তা ছায়ায় না গেলে বোঝা যায় না। সুখ কতটা দামি, তা দুঃখ না পেলে বোঝা যায় না।
তাই খারাপ সময় এলে কাঁদো, কিন্তু ভেঙে পড়ো না। রাগ করো, কিন্তু অভিশাপ দিও না।
বরং মনে মনে বলো - "ধন্যবাদ। তুমি এসে আমার চোখ খুলে দিলে। তুমি এসে আমার জীবনের ভিড় কমিয়ে দিলে। তুমি না এলে আমি কোনোদিন জানতেই পারতাম না, কারা আমার মুখ, আর কারা শুধু মুখোশ।"
শেষ কথা এটাই বলার যে :----
জীবনে মুখোশের দরকার আছে। সবাই তোমার আপন হবে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মুখোশকে মুখ ভেবে ভুল করো না।
আর খারাপ সময়কে ভয় পেও না। খারাপ সময় হলো ধোপার মতো, যে তোমার জীবনের জামা থেকে নকল রঙগুলো ধুয়ে দেয়, আসল রঙটা রেখে দেয়।
আজ যদি তোমার খারাপ সময় চলছে, তাহলে জেনে রেখো - তোমার জীবন এখন পরিষ্কার হচ্ছে। ভিড় কমছে, ভেজাল কমছে।
খারাপ সময় চিরকাল থাকে না, কিন্তু খারাপ সময়ে চেনা মানুষগুলো চিরকাল মনে থাকে।
তাই মুখোশ চলে গেছে বলে কষ্ট পেও না, মুখটা যে এখনো আছে - সেই জন্য কৃতজ্ঞ হও।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!