প্রথম পাতাচিন্তা ও চেতনাআমরা কৃতজ্ঞ নই

চিন্তা ও চেতনা

আমরা কৃতজ্ঞ নই

আমরা কৃতজ্ঞ নই

আমরা কৃতজ্ঞ নই, আমরা আসলে অভিযোগকারী।


বিজ্ঞাপন

একবার ভেবে দেখো তো, তোমার জীবনে কী নেই, তার লিস্টটা কত বড়? আর কী আছে, তার লিস্টটা কত ছোট?


আমাদের মনটা এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যা আছে তাকে আমরা ধরে নিই, take it for granted। আর যা নেই, তা নিয়ে সারাদিন কান্নাকাটি করি।


তোমার হৃদপিণ্ডটা এই মুহূর্তে ধুকপুক করছে, তুমি কি একবারও তাকে ধন্যবাদ দিয়েছো? তোমার ফুসফুসটা বিনা বেতনে সারাদিন তোমার জন্য শ্বাস টানছে, তুমি কি তাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছো? এই যে চোখ দিয়ে তুমি এই লেখাটা পড়ছো, এই আলো, এই আকাশ - এগুলোর জন্য তুমি কবে শেষবার মন থেকে বলেছো - "ধন্যবাদ"?


আমরা ভাবি, অনেক কিছু পেলে তবেই কৃতজ্ঞ হবো। গাড়ি হলে, বাড়ি হলে, টাকা হলে।


ঋষিগণ বলছেন উল্টোটা। কৃতজ্ঞ হলেই তুমি অনেক কিছু পাবে।


আসলে কৃতজ্ঞতা কোনো ভদ্রতা নয়। কৃতজ্ঞতা হলো একটা দৃষ্টি।


অভিযোগের চোখ দিয়ে দেখলে মনে হবে - "ঈশ্বর আমাকে কিছুই দেননি।"

আর কৃতজ্ঞতার চোখ দিয়ে দেখলে মনে হবে - "আমাকে যা দেওয়া হয়েছে, তা ধরে রাখার যোগ্যতাই তো আমার নেই।"


যখন তুমি অভিযোগ করো, তখন তুমি সংকুচিত হয়ে যাও। তোমার ভেতরের দরজা-জানালা বন্ধ হয়ে যায়। তখন ব্রহ্মাণ্ডের কৃপা তোমার সামনে দিয়ে গেলেও তোমার ঘরে ঢুকতে পারে না।


আর যখন তুমি কৃতজ্ঞ হও, তখন তুমি প্রসারিত হও। তোমার হৃদয় খুলে যায়। তখন তুমি গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হও। বৃষ্টি তো সব জায়গাতেই পড়ছে, কিন্তু যে ঘটিটা সোজা করে রাখা, তাতেই জল জমে। কৃতজ্ঞতা হলো সেই ঘটিটা সোজা করা।


উপনিষদ বলছে-- এক মুহূর্ত। সারাজীবন নয়।


কেন? কারণ জীবনটা সারাজীবন দিয়ে বদলায় না, জীবন বদলায় একটা মুহূর্তে।


একটা মুহূর্ত, যখন তোমার অহংকারটা পুরোপুরি গলে যায়।


আমরা সারাজীবন "আমি করেছি" - এই অহংকারে বাঁচি। আমি পড়াশোনা করেছি, আমি চাকরি পেয়েছি, আমি সংসার করেছি।


কিন্তু একবার গভীরভাবে ভাবো, তুমি সত্যি কী করেছো? তোমার জন্ম কি তুমি দিয়েছো? তোমার শরীরে রক্ত চলাচল কি তুমি করাচ্ছো? কাল সকালে যে সূর্যটা উঠবে, সেটা কি তোমার জন্য উঠবে?


কিছুই তুমি করোনি। সবকিছু তোমাকে দেওয়া হয়েছে। এই শরীর, এই মন, এই বাতাস - সবটাই দান।


যে মুহূর্তে তুমি এটা সত্যি সত্যি অনুভব করবে, মাথা থেকে নয়, বুকের ভেতর থেকে - যে "আমার তো কিছুই নেই, সবই পাওয়া", সেই মুহূর্তে তোমার ভেতরে যে কৃতজ্ঞতাটা জন্মাবে, সেটা হবে Absolute Gratitude। পরম কৃতজ্ঞতা।


সেই কৃতজ্ঞতায় কোনো চাওয়া থাকে না, কোনো শর্ত থাকে না। শুধু চোখ দিয়ে জল পড়ে।


আর সেই এক ফোঁটা জল, তোমার জন্ম-জন্মান্তরের অহংকার ধুয়ে দিতে পারে। তখন তুমি আর একই মানুষ থাকো না। তোমার পুরো অস্তিত্বটাই বদলে যায়।


কীভাবে apply করবে বাস্তব জীবনে ? 


এটা কোনো পূজা নয়, এটা একটা অভ্যাস।


ক) তুলনা বন্ধ করো, গণনা শুরু করো:--- আমরা সারাদিন অন্যের সাথে তুলনা করি - ওর আছে, আমার নেই। আজ থেকে তুলনা বন্ধ। রাতে ঘুমানোর আগে ৫ মিনিট বসো। আর শুধু গোনো - আজ সারাদিনে কী কী পেয়েছো যা তুমি deserve করো না, তবুও পেয়েছো। সকালে যে চা টা পেলে, যে মানুষটা তোমাকে হাসালো, যে বিপদ থেকে বেঁচে গেলে। লিখতে শুরু করো। দেখবে, তুমি কত ধনী।


খ) "ধন্যবাদ" টাকে অনুভব করো:--- কেউ যখন তোমাকে কিছু দেয়, বা সাহায্য করে, তখন শুধু মুখে Thanks বলো না। এক সেকেন্ড থেমে, তার চোখের দিকে তাকিয়ে, মন থেকে বলো। ওই এক সেকেন্ডের থামাটাই তোমাকে বদলে দেবে। ধীরে ধীরে এই ধন্যবাদটা মানুষ থেকে সরিয়ে গাছকে, আকাশকে, নিজের শরীরকে দিতে শুরু করো।


গ) অভিযোগকে কৃতজ্ঞতায় বদলাও:--- যখনই মনে হবে "আমার এটা নেই", তখনই নিজেকে প্রশ্ন করো - "যা আছে, তার যোগ্য কি আমি?" যখন শরীর খারাপ লাগবে, তখন ভাবো - যে এতদিন শরীরটা ভালো ছিল, তার জন্য কি কখনো ধন্যবাদ দিয়েছি? এই একটা উল্টো ভাবনাই তোমার ভেতরের রসায়ন বদলে দেবে।


শেষ কথা যেটা সকলকে বলার ---


এই বিশ্বে দুই ধরনের মানুষ আছে। একদল ভিখারি, যারা সারাজীবন বলে - "আরও দাও, আরও দাও"। আরেকদল সম্রাট, যারা বলে - "যা দিয়েছো, তার জন্যই ধন্যবাদ, এত কি আমার প্রাপ্য ছিল?"


ভিখারিরা সারাজীবন ভিখারিই থেকে যায়, কারণ তাদের হাত সবসময় বন্ধ, চাওয়ার ভঙ্গিতে। আর সম্রাটদের হাত সবসময় খোলা, তাই তাদের কাছে সবকিছু এসে ধরা দেয়।


তুমি কোনটা হতে চাও?


আজ, এই মুহূর্তে, একবার চোখ বন্ধ করো। লম্বা শ্বাস নাও। আর মন থেকে শুধু বলো - "আমার জীবনে যা কিছু আছে, যেমন আছে, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।"


শুধু একবার, মন থেকে বলো। দেখবে, ওই একটা মুহূর্তই তোমার পুরো জীবনটাকে নতুন করে লিখে দেবে।

০ মন্তব্য · ৬১ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!