প্রথম পাতাচিন্তা ও চেতনাবিবর্তন

চিন্তা ও চেতনা

বিবর্তন

বিবর্তন

মানুষের অদ্ভুত সব জিনিস বিশ্বাস করার প্রবণতা আদতে নতুন কিছু নয়। একটু খেয়াল করলে দেখা যায় চারপাশের অনেক বুদ্ধিমান মানুষও এমন কিছু ধারণা বা বিশ্বাস মনের মধ্যে লালন করেন যার সাথে বিজ্ঞানের বা বাস্তবতার কোনো মিল নেই। ভূতে বিশ্বাস করা নির্দিষ্ট কোনো বার বা সংখ্যাকে অশুভ মনে করা কিংবা রাশিফল দেখে দিনের কাজ শুরু করার মতো ঘটনা আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। তবে প্রশ্ন হলো মানুষ কেন এমন করে। এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের মস্তিষ্কের গঠন আর হাজার হাজার বছরের বিবর্তনমূলক ইতিহাসের মধ্যে।


বিজ্ঞাপন

আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন বনে জঙ্গলে বা খোলা প্রান্তরে বাস করত তখন তাদের টিকে থাকা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। চারপাশের পরিবেশ ছিল হিংস্র প্রাণী ও নানা ধরনের বিপদে ভরা। সেই বিপজ্জনক পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের মস্তিষ্ক এক বিশেষ কৌশল আয়ত্ত করে নেয়। সেই কৌশলটি হলো খুব দ্রুত চারপাশের ঘটনার মধ্যে এক ধরনের প্যাটার্ন বা ধরন খুঁজে বের করা। জঙ্গল বা ঝোপঝাড়ের মধ্যে পাতা নড়ে ওঠার শব্দ হলে মস্তিষ্ক সঙ্গে সঙ্গে ধরে নিত সেখানে কোনো শিকারি প্রাণী বা বাঘ লুকিয়ে আছে। এটি ছিল টিকে থাকার এক চমৎকার উপায়। যদি ঝোপের পেছনে সতাই বাঘ থাকত আর মানুষটি পালিয়ে যেত তবে তার প্রাণ বেঁচে যেত। অন্যদিকে যদি বাতাসে পাতা নড়ত আর সেটিকে বাঘ ভেবে সে পালিয়ে যেত তাহলেও তার কোনো বড় ক্ষতি হতো না।


কিন্তু যদি সে উল্টোটা করত অর্থাৎ বাতাস ভেবে বসে থাকত আর বাস্তবে বাঘ থাকত তবে তার জীবন সেখানেই শেষ হয়ে যেত। এই কারণে বিবর্তনের ধারায় মানুষ এমনভাবে তৈরি হয়েছে যেখানে সামান্য শঙ্কার মুখেও কোনো অদৃশ্য কারণ বা শক্তিকে সত্যি মনে করাটা নিরাপদ ছিল। একে বিজ্ঞানীরা বলেন ভুল অনুমান করার প্রবণতা। কোনো কিছু না থাকা সত্ত্বেও সেখানে ক্ষতিকর কিছু আছে বলে ধরে নেওয়ার এই স্বভাবই কালক্রমে অদ্ভুত বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। ঝোপের শব্দকে অহেতুক বাঘ ভাবার এই মানসিকতা থেকেই আধুনিক যুগে অলৌকিক বা অদ্ভুত শক্তিতে বিশ্বাস গড়ে উঠেছে।


এর পাশাপাশি আমাদের মস্তিষ্কের আরও একটি বিশেষ স্বভাব রয়েছে। তা হলো চারপাশের নির্জীব বা নিরপেক্ষ জিনিসের মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো অর্থ বা উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া। আকাশে মেঘের ভেসে যাওয়ার দৃশ্য দেখলে অনেক সময় মানুষের মুখ বা কোনো প্রাণীর আকৃতি মনে হয়। রাতের অন্ধকারে ঘরের কোণে ঝুলতে থাকা জামাকাপড়কে হঠাৎ মানুষ বলে মনে হতে পারে। এই বিষয়টিকে বলা হয় ভুল দৃশ্য দেখার প্রবণতা। আদিম যুগে বিপদের দিনে ক্ষিপ্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মস্তিষ্কের এই ব্যবস্থা খুব কার্যকর ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে এটিই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ এখন যেকোনো সাধারণ ঘটনার পেছনে কোনো এক অদ্ভুত বা অলৌকিক হাত দেখতে পায়।


বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে মানুষ আসলে সত্যের চেয়ে নিজের নিরাপদ অনুভব করাকে বেশি প্রাধান্য দেয়।


যখন কোনো মানুষ বুঝতে পারে না চারপাশে কী ঘটছে বা কোনো বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয় তখন মস্তিষ্ক খুব ব্যাকুল হয়ে পড়ে। দেখা গেছে বড় কোনো বৈশ্বিক মহামারি বা অর্থনৈতিক সংকটের সময় মানুষ নানা রকম অদ্ভুত conspiracy তত্ত্বে বেশি বিশ্বাস করতে শুরু করে। কারণ আসল কারণটি হয়তো খুব কঠিন বা নিয়ন্ত্রণহীন। কিন্তু যখন মানুষ মনে করে যে সবকিছুর পেছনে গোপন কোনো দল বা অদ্ভুত শক্তি দায়ী, অজানা বিষয়ে নিজের মত শূন্যস্থান পূরণ করলে তখন তারা এক ধরনের মানসিক স্বস্তি পায়। বাস্তব পরিস্থিতি যতই অদ্ভুত হোক না কেন কোনো একটি কারণ খুঁজে পেলে মনের অনিশ্চয়তা কিছুটা দূর হয়।


মানুষের সমাজবদ্ধ হয়ে বেঁচে থাকার আগ্রহও অদ্ভুত বিশ্বাসের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। আদিম সমাজ থেকে মানুষ ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বাস করে আসছে। দলের সব সদস্য যদি একই কথা বিশ্বাস করে তবে তাদের বন্ধন শক্ত হয়। দলের বাইরে কেউ ভিন্ন কথা বললে তাকে সমাজ মেনে নিতে চাইত না। তাই নিজের দলের বা স্বজনদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে মানুষ অনেক অদ্ভুত যুক্তিহীন ধারণা অনায়াসে মেনে নেয়। এমনকি বিজ্ঞানের যুগে এসেও মানুষ যুক্তি বা প্রমাণের চেয়ে নিজের গোষ্ঠীর মানুষের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেয়। যাকে বলা হয় দলবদ্ধ চিন্তার প্রভাব।


আর এসব কারণে ইতিহাসের পাতায় অসংখ্য বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ছিলেন যেমন গ্যালিলিও, নিউটন, ব্রুনো, বা সক্রেটিসের মতো অসংখ্য বড় বড় দার্শনিক তারা অলৌকিক কোন সত্তার বিষয়ে অবিশ্বাসী ছিলেন কারণ তারা জটিল অংক কষে জটিল গবেষণা ও গভীরভাবে চিন্তা করতেন বড় বড় যুক্তি দিতেন। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের এইসব জটিল বিষয় জানার সময় নেই তাদের কাছে এগুলো সময় সাপেক্ষ, তাদের কাছে অলৌকিক confort zone ছিল নিরাপদ। যার কারনে এইসব গোষ্ঠী কে আস্তিক কে নাস্তিক কোন বিজ্ঞানী বা দার্শনিক স্বর্গে যাবে? নাকি নরকে যাবে? এসব নিয়েই পড়ে থাকত। কারণ তাদের কাছে বিজ্ঞান বা দর্শন বুঝে বিশ্বাস করার চেয়ে অলৌকিক কোন সত্তায় বিশ্বাস করাই ছিল সহজ ও নিরাপদ।


নিজের তৈরি করা ধারণাকে আঁকড়ে ধরে রাখার মানসিকতাও মানুষকে বাস্তব থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মানুষ সাধারণত নিজের পছন্দের বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি খুঁজতে ভালোবাসে আর এর বিপরীত প্রমাণগুলোকে এড়িয়ে যায়। যদি কেউ বিশ্বাস করে যে অমুক দিন ঘরের বাইরে গেলে বিপদ হতে পারে তবে সেদিন ছোটখাটো কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই সে সেটিকে তার বিশ্বাসের সত্যতা হিসেবে ধরে নেবে। কিন্তু যে শত শত দিন ওই একই বার বা দিনে বাইরে গিয়ে কিছুই হয়নি সেগুলোর কথা সে পুরোপুরি ভুলে যাবে।


মানুষের মস্তিষ্ক আসলে কোনো নিখুঁত কম্পিউটার নয়। এটি মূলত বিপদ থেকে বাঁচার জন্য আর টিকে থাকার জন্য তৈরি হওয়া এক অদ্ভুত জৈবিক যন্ত্র। হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকার তাগিদে তৈরি হওয়া এইসব মানসিক অভ্যাস আধুনিক যুগের মানুষের মধ্যেও টিকে রয়েছে। এই কারণেই মানুষ আজও যুক্তি আর বিজ্ঞানের বাইরে গিয়ে নানান চমৎকার কিন্তু অদ্ভুত কাল্পনিক গল্প আর বিশ্বাসকে মনে স্থান দেয়। বিবর্তনের এই দীর্ঘ যাত্রায় টিকে থাকার লড়াইই মানুষকে এমন এক অদ্ভুত বিশ্বাসী প্রাণী বানিয়ে তুলেছে।


বিবর্তন আমাদের অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে আর খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে শিখিয়েছে কিন্তু ঠাণ্ডা মাথায় সময় নিয়ে যুক্তি দিয়ে ভাবার শক্তিকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি।


এর কারণ হলো বিবর্তনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আমাদের বাঁচিয়ে রাখা, আমাদের দিয়ে সঠিক সত্য বের করা নয়। আদিম যুগে যারা খুব বেশি সময় নিয়ে চিন্তা করত বা যুক্তি দিয়ে সততা যাচাই করতে যেত তারা বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ত। জঙ্গলে একটি বিশাল গর্জন শুনে যদি কোনো মানুষ চিন্তা করতে বসত যে এই শব্দটা সত্যি বাঘের নাকি বাতাসের ঘর্ষণের, তবে সেই যুক্তি মেলাতে মেলাতেই বাঘ এসে তাকে খেয়ে ফেলত। অন্যদিকে যে মানুষটি কোনো যুক্তি না মেনে ভয়ে দৌড় দিত সে বেঁচে যেত।


ফলে বিবর্তন সেই মস্তিষ্কগুলোকেই টিকিয়ে রেখেছে যেগুলো সত্য জানার চেয়ে বেঁচে থাকাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অবিশ্বাসের জন্য দরকার হয় গভীর মানসিক শ্রম, ধৈর্য আর তথ্য প্রমাণের বিশ্লেষণ। আদিম মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ে এই বিলাসিতার কোনো জায়গা ছিল না। ধীরে ধীরে আমরা যে বিজ্ঞান, যুক্তি এবং অবিশ্বাসের চর্চা শিখেছি তা আমাদের বিবর্তনগত স্বভাবের অংশ নয়, বরং তা হলো মানব সভ্যতার অর্জিত কৃষ্টি। বিবর্তন আমাদের তৈরি করেছে খুব দ্রুত অলৌকিক কিছু বিশ্বাস করার জন্য, আর আমাদের তৈরি সমাজ ও শিক্ষা আমাদের শিখিয়েছে থামতে সন্দেহ করতে এবং সত্য উদ্ঘাটন করতে।


তাছাড়া আদিম মানুষের গল্প বলা আর তা শোনার মধ্যে বিশ্বাসের এক বিশাল বিবর্তনীয় ভূমিকা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে গল্প বলা কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না এটি ছিল টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানের একটি উপায়।


একজন মানুষ যখন অন্যকে বলত যে অমুক পাহাড়ের পেছনে বিষাক্ত সাপ আছে বা অমুক নদীতে পানির স্রোত বেশি, তখন শ্রোতাকে সেই কথাটি সরাসরি বিশ্বাস করতে হতো। কারণ নিজে গিয়ে সত্যতা পরীক্ষা করতে যাওয়া মানে ছিল জীবন ঝুঁকিতে ফেলা। তাই কোনো প্রমাণ ছাড়াই অন্যের কথা বা গল্প বিশ্বাস করে নেওয়ার মধ্যে এক ধরনের সুরক্ষার সুবিধা ছিল।


ছোট ছোট দলবদ্ধ সমাজে একে অপরের সাথে তথ্য ও গল্প ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে আস্থা তৈরি হতো। একজন যখন অন্যকে কোনো গল্প বা অভিজ্ঞতার কথা বলত, তখন তা দলের ভেতরে পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়াত। যে গল্পের মাধ্যমে দলের সুরক্ষা বা কল্যাণ নিশ্চিত হতো, শ্রোতারা সেই গল্প আর তার বক্তাকে সহজে বিশ্বাস করত।


কাল্পনিক গল্পের মাধ্যমে দল গঠন ইতিহাসবিদ ও বিজ্ঞানীরা মনে করেন মানুষ একমাত্র প্রাণী যারা পুরোপুরি কাল্পনিক গল্প তৈরি করে হাজার হাজার মানুষকে একসাথে জোটবদ্ধ করতে পারে। যেমন নির্দিষ্ট কোনো অদৃশ্য দেব-দেবী, বজ্র দেবতা বা ভূমিকম্প কে তখন দেবতার ক্রোধ ও পাহাড়ের রক্ষক আত্মার গল্প ইত্যাদি ইত্যাদি। যখন কোনো গোষ্ঠীর সবাই একই কাল্পনিক গল্প বিশ্বাস করত তখন তারা নিজেদের একই দলের অংশ মনে করত। এই ভাগ করে নেওয়া বিশ্বাসই তাদের একে অপরের জন্য আত্মত্যাগ করার আর একসাথে শিকার করার সাহস জোগাত।


গল্প বলা আর তা অন্ধের মতো বিশ্বাস করার প্রবণতা আদতে মানুষ নামক প্রজাতিকে সংঘবদ্ধ করতে এবং বিবর্তনের কঠিন লড়াইতে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল।

#EvolutionaryPsychology

#HumanBeliefs

#CognitiveBias

#বিবর্তনীয়_মনস্তত্ত্ব

#অন্ধবিশ্বাস

#মস্তিষ্কের_রহস্য

০ মন্তব্য · ৭৩ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!