প্রথম পাতাচিন্তা ও চেতনাআমরা কি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি আমাদের শিকড়?

চিন্তা ও চেতনা

আমরা কি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি আমাদের শিকড়?

আমরা কি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি আমাদের শিকড়?

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলা🏡🌴 উন্নয়ন হচ্ছে 🏢, কিন্তু আমরা কি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি আমাদের শিকড়?

কখনো কি এমন হয়েছে—অনেক বছর পর নিজের পরিচিত কোনো জায়গায় গিয়ে হঠাৎ মনে হয় “এটা কি সেই জায়গা?”

রাস্তা একই রকম মনে হয়, কিন্তু চারপাশটা আর আগের মতো নেই। যেখানে একসময় ধানক্ষেত ছিল, সেখানে এখন দালান। যেখানে পুকুর ছিল, সেখানে মাটি ফেলে বাড়ি উঠেছে। যে রাস্তার পাশে বিশাল একটা গাছ ছিল, সেটাও নেই। যে মাঠে বিকেল হলে ছেলেদের ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা দেখা যেত, সেখানে এখন দোকান, বাড়ি কিংবা মার্কেট।

বিজ্ঞাপন

সবকিছু বদলে যাচ্ছে, আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই পরিবর্তনটা আমরা খুব সহজেই মেনে নিচ্ছি, কারণ আমরা এটাকে উন্নয় মনে করি।।

উন্নয়ন কি শুধু ইট-কংক্রিট?অবশ্যই গ্রাম উন্নত হবে। গ্রামের মানুষ ভালো রাস্তা পাবে, বিদ্যুৎ পাবে, দ্রুত ইন্টারনেট পাবে, আধুনিক স্কুল-কলেজ পাবে, ভালো হাসপাতাল পাবে—এসব তো দরকারই। কেউ চায় না গ্রামের মানুষ সুযোগ-সুবিধা থেকে পিছিয়ে থাকুক।

কিন্তু প্রশ্নটা হলো—উন্নয়ন করতে গিয়ে আমাদের কি গ্রামের অস্তিত্বটাই বদলে ফেলতে হবে? একটা গ্রামে নতুন রাস্তা হতে পারে, কিন্তু সেই রাস্তার পাশে গাছও থাকতে পারে। নতুন বাড়ি হতে পারে, কিন্তু গ্রামের পুকুরটা বাঁচিয়ে রাখা যায়। আধুনিক বাজার হতে পারে, কিন্তু পাশের কৃষিজমিটা রক্ষা করা যায়। ইন্টারনেট আসতে পারে, কিন্তু পাখির ডাক হারিয়ে যেতে হবে—এমন কোনো নিয়ম তো নেই। তাহলে কেন আমাদের উন্নয়ন মানেই প্রকৃতির জায়গা কএকটা সময় গ্রাম মানেই ছিল অন্যরকম একটা জীবনগ্রামের সকালটা ছিল পাখির ডাকে ঘুম ভাঙা, কোথাও মসজিদের আজান, কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ, পুকুরের পানিতে হাঁসের সাঁতার, আর বাড়ির উঠানে মুরগির ঘোরাঘুরি। দুপুরে রোদ, বিকেলে মাঠে খেলা বা আড্ডা, কেউ মাছ ধরছে, কেউ গাছের নিচে গল্প করছে, কেউ বাড়ির সামনে বসে চা খাচ্ছে। সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে গ্রাম শান্ত হয়ে যেত।

এই জীবনটা হয়তো খুব আধুনিক ছিল না, কিন্তু এর মধ্যে শান্তি ছিল, একটা সম্পর্ক ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির। আজ আমরা অনেক কিছু পেয়েছি, কিন্তু সেই শান্তিটা কি কোথাও হারিয়ে ফেলছিশুধু মানুষ নয়, হারিয়ে যাচ্ছে অন্যরাগ্রাম বদলালে শুধু মানুষের জীবন বদলায় না, বদলে যায় পুরো ecosystem। পুকুর কমলে মাছ কমে, গাছ কমলে পাখি কমে, খাল ভরাট হলে জল চলাচলের পথ বন্ধ হয়, ধানক্ষেত কমলে অনেক ছোট প্রাণীর আবাসও কমে যায়। এমনকি গ্রামের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো কুকুরগুলোর জীবনও বদলে যায়।

আগে তারা বাড়ির উচ্ছিষ্ট খাবার বা বাজারের ফেলে দেওয়া খাবার থেকে বেঁচে থাকত। এখন মানুষ সচেতন হয়েছে, ডাস্টবিন ব্যবহার করছে এটা ভালো। কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের ভাবতে হবে, মানুষের জীবন সুন্দর করতে গিয়ে আমরা কি এমন পরিবেশ তৈরি করছি যেখানে অন্য প্রাণীদের বেঁচে থাকার জায়গাটাই থাকছে না? প্রাণীদের জন্য আলাদা জায়গা থাকা শুধু আবেগ নয়, এটা ভারসাসবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়—পরিবর্তনটা খুব ধীরে একদিনে কোনো গ্রাম শহর হয়ে যায় না। আজ একটা পুকুর ভরাট হলো, কাল একটা গাছ কাটা হলো, কয়েক মাস পর ধানক্ষেতের এক অংশে বাড়ি হলো, তারপর দোকান, তারপর রাস্তা। এভাবেই ধীরে ধীরে পুরো জায়গাটআমরা প্রতিটা পরিবর্তনকে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখি, তাই বুঝতে পারি না যে আমাদের চোখের সামনে আসলে একটা সম্পূর্ণ জীবনধারা বদলে যাচ্ছে। দশ বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়—“এই জায়গাটা তো এমন ছতাহলে কি আমরা উন্নয়ন বন্ধ করে দেব?না, একদমই না। গ্রামকে পিছিয়ে রাখা কোনো সমাধান নয়। বরং দরকার এমন উন্নয়ন, যেখানে রাস্তা থাকবে কিন্তু গাছও থাকবে, বাড়ি থাকবে কিন্তু পুকুর থাকবে, বাজার থাকবে কিন্তু কৃষিজমি হারাবে না, আধুনিকতা থাকবে কিন্তু গ্রামেরঅর্থাৎ গ্রাম আধুনিক হবে, কিন্তু গ্রাম হারিয়ে যাবে না।আমাদের সন্তানরা কী দেখবে?

আমরা যারা গ্রামের পুরোনো রূপ দেখেছি, তাদের স্মৃতি আছে। কিন্তু পরের প্রজন্ম কি জানবে বর্ষার কাদামাটির রাস্তা, ধান কাটার গন্ধ, পুকুরে বিকেলের আলো, খেজুরের রসের হাঁড়ি, বা সূর্য ডোবার সেই দৃশ্য?নাকি তাদের কাছে গ্রাম মানে হবে শুধু এমন একটা জায়গা, যেখানে এখনো শহরের মতো দালান পুরোপুরি হয়নি?গ্রামকে শহর বানানো নয়, গ্রামকে বাঁচিয়ে আধুনিক করা দরআমরা চাই না গ্রাম পিছিয়ে থাকুক, আবার চাই না গ্রামের পরিচয় হারিয়ে যাক। এমন ভবিষ্যৎ চাই যেখানে গ্রামের ছেলে-মেয়েরা ভালো পড়াশোনা, চিকিৎসা, ইন্টারনেট সবকিছু গ্রামেই পাবে। কৃষক তার ন্যায্য দাম পাবে, তরুণরা গ্রাম থেকেই কাজ করতে পারবে। কিন্তু একই সঙ্গে পুকুর, খাল, গাছ, মাঠ, পাখি, কৃষিজমি—সবই থাকবে, থাকবে গ্রামবাংলার গন্ধ

শেষ কথা

আমরা শহর বানাতে পারি, বড় রাস্তা বানাতে পারি, উঁচু ভবন বানাতে পারি, আধুনিক বাজার বানাতে পারি। কিন্তু একটা পুকুর ভরাট করলে শুধু পানি নয়, হারায় স্মৃতি। একটা গাছ কাটলে শুধু গাছ নয়, হারায় ছায়া, পাখির বাসা, পরিচিত দৃশ্য। একটা মাঠ হারালে হারায় শৈশব।

তাই প্রশ্ন উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয়, প্রশ্ন হলো—আমরা কেমন উন্নয়ন চাই?

এমন উন্নয়ন, যেখানে সবকিছু থাকবে কিন্তু শিকড় হারাবে? নাকি এমন উন্নয়ন, যেখানে আধুনিকতার পাশাপাশি একদিন দাদার হাত ধরে পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ বলতে পারবে—“দাদা, তোমাদের সময়ের গ্রামটা এখনো আছে”?

আমার মনে হয়, দ্বিতীয়টাই আমাদের বেছে নেওয়া উচিত। কারণ গ্রামকে পিছিয়ে রাখা যাবে না, কিন্তু গ্রামবাংলাকেও হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না।


১ মন্তব্য · ২১১ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (১)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন
নিষাদ ১১ আগস্ট, ২০২৬

একমত 🏡🤔🏢