প্রথম পাতা › গল্প ও উপন্যাস › হারানো সুর

গল্প ও উপন্যাস

হারানো সুর

বিজ্ঞাপন
হারানো সুর

বিকেলের আকাশে তখন মেঘ জমেছে। জানালার পাশে বসে পুরোনো হারমোনিয়ামটার দিকে তাকিয়ে ছিল অয়ন। হারমোনিয়ামটির গায়ে ধুলোর আস্তরণ, কয়েকটি চাবি ভেঙে গেছে, আর বেলোতে জমেছে সময়ের পুরোনো গন্ধ। অথচ একসময় এই হারমোনিয়ামের সুরেই মুখর হয়ে উঠত পুরো বাড়ি।


বিজ্ঞাপন

সেই সুরের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একজন মানুষের স্মৃতি—অয়নের মা।


ছোটবেলায় অয়ন যখন রাতে ঘুমাতে চাইত না, মা তখন তার পাশে বসে গান গাইতেন। মায়ের কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত মায়া। সেই সুর শুনতে শুনতে কখন যে অয়নের চোখ বুজে আসত, সে নিজেও বুঝতে পারত না।


মা প্রায়ই বলতেন, “বাবা, পৃথিবীতে অনেক কিছু হারিয়ে যায়। কিন্তু মন থেকে যে সুর একবার জন্ম নেয়, তাকে কখনো পুরোপুরি হারানো যায় না।”


তখন অয়ন মায়ের কথার অর্থ বুঝত না। তার কাছে গান ছিল আনন্দের, খেলার মতো সহজ একটা বিষয়।


কিন্তু জীবন সব সময় একই সুরে বাজে না।


অয়নের বয়স যখন ষোলো, তখন এক কঠিন অসুখে তার মা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। মায়ের চলে যাওয়ার পর বাড়িটা যেন হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। ঘড়ির কাঁটার শব্দও তখন অয়নের কাছে অসহ্য লাগত। যে ঘরে প্রতিদিন গান শোনা যেত, সেই ঘরে নেমে এল গভীর শূন্যতা।


সেদিনের পর অয়ন আর কখনো গান গায়নি।


মায়ের হারমোনিয়ামটি ঘরের এক কোণে পড়ে রইল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধুলো জমল, চাবিগুলো নষ্ট হলো, কিন্তু অয়নের মনের ভেতর মায়ের কণ্ঠটা কোথাও আটকে রইল।


বছর পেরিয়ে গেল।


অয়ন এখন শহরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। ব্যস্ত জীবন, অফিসের কাজ, মানুষের ভিড়—সবকিছুর মাঝেও সে যেন নিজের ভেতরের মানুষটাকে হারিয়ে ফেলেছে। বাইরে থেকে তাকে সফল মনে হলেও, গভীর রাতে একা ঘরে ফিরলে তার মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান কিছু একটা সে কোথায় যেন ফেলে এসেছে।


একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে রাস্তার পাশে একটি ছোট্ট চায়ের দোকানে বসেছিল অয়ন। হঠাৎ পাশের গলি থেকে ভেসে এল একটি গানের সুর।


অয়ন চমকে উঠল।


সুরটা খুব পরিচিত। যেন বহু বছর আগে শোনা কোনো ডাক। তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে উঠে দাঁড়িয়ে গলির দিকে এগিয়ে গেল।


একটি ছোট মেয়ে রাস্তার ধারে বসে পুরোনো একটি বাঁশি বাজাচ্ছিল। তার বয়স বড়জোর দশ বছর। পরনে মলিন জামা, চোখে অদ্ভুত এক নিষ্পাপ আনন্দ।


অয়ন কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এই সুরটা তুমি কোথায় শিখেছ?”


মেয়েটি বাঁশি নামিয়ে বলল, “কোথাও শিখিনি। আমার বাবা বাজাতেন। তিনি বলতেন, এই সুর শুনলে মন খারাপ থাকলেও ভালো লাগবে।”


অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।


“তোমার বাবা কোথায়?”


মেয়েটির চোখের আনন্দ একটু ম্লান হয়ে গেল।


“বাবা আর নেই। কিন্তু আমি তাঁর বাঁশিটা বাজাই। মনে হয়, বাবা আমার পাশেই বসে আছেন।”


কথাটা শুনে অয়নের মনে হলো, কেউ যেন তার বহু বছরের বন্ধ দরজায় আলতো করে টোকা দিল।


সে মেয়েটিকে কিছু টাকা দিতে চাইল। মেয়েটি টাকা হাতে নিয়ে বলল, “কাকু, আপনি গান জানেন?”


অয়ন মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।


“আগে জানতাম। এখন আর পারি না।”


মেয়েটি সরল চোখে বলল, “গান কি হারিয়ে যায় নাকি? চেষ্টা করলে আবার বাজবে!”


কথাটা খুব সাধারণ। অথচ অয়নের কাছে মনে হলো, এ যেন তার মায়ের কণ্ঠে শোনা সেই পুরোনো কথারই প্রতিধ্বনি।


সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে অয়ন বহু বছর পর মায়ের ঘরের দরজা খুলল। ধুলো ঝেড়ে হারমোনিয়ামটা নিজের সামনে রাখল। আঙুল দিয়ে একটি চাবিতে চাপ দিতেই ভাঙা, কাঁপা একটি শব্দ বেরিয়ে এল।


প্রথমে তার বিরক্ত লাগল। তারপর আবার চেষ্টা করল।


একটি সুর মনে করার চেষ্টা করল সে—মায়ের সেই ঘুমপাড়ানি গান, যে গানের প্রতিটি শব্দ তার শৈশবের সঙ্গে মিশে আছে।


কিন্তু কিছুতেই পুরো সুরটা মনে পড়ছিল না।


অয়ন চোখ বন্ধ করল। মনে পড়ল মায়ের মুখ, হাসি, স্নেহভরা চোখ। মনে পড়ল, ছোট্ট অয়ন মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে, আর মা তার চুলে হাত বুলিয়ে গান গাইছেন।


হঠাৎ তার ঠোঁট কেঁপে উঠল।


বহু বছর পর অয়ন গাইতে শুরু করল।


কণ্ঠ প্রথমে ভেঙে গেল। সুর তাল হারাল। মাঝপথে সে থেমেও গেল। কিন্তু এবার সে হার মানল না। আবার শুরু করল। ধীরে ধীরে স্মৃতির ভেতর থেকে ফিরে এল হারিয়ে যাওয়া সুরের কিছু অংশ।


গাইতে গাইতে কখন যে তার চোখ ভিজে উঠেছে, সে বুঝতেই পারেনি।


পরদিন অয়ন সেই ছোট্ট মেয়েটিকে খুঁজে বের করল। মেয়েটির নাম মেঘলা। সে রাস্তার পাশে বসে বাঁশি বাজায়, আর সুযোগ পেলে গান শোনে।


অয়ন তাকে বলল, “তুমি কি গান শিখতে চাও?”


মেঘলা আনন্দে মাথা নাড়ল।


সেদিন থেকে অয়নের জীবনে নতুন একটি অধ্যায় শুরু হলো। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে মেঘলাকে গান শেখাতে বসে। পুরোনো হারমোনিয়ামটা মেরামত করাল। নিজের কণ্ঠের যত্ন নিতে শুরু করল। অনেক দিন পর সে আবার গানকে ভালোবাসতে শিখল।


কয়েক মাস পর এলাকার একটি ছোট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অয়নকে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হলো।


মঞ্চে উঠে সে কিছুক্ষণ দর্শকদের দিকে তাকিয়ে রইল। সামনের সারিতে বসে আছে মেঘলা। তার পাশে রাখা ছোট্ট বাঁশিটি। অয়ন হারমোনিয়ামের সামনে বসল।


তারপর গাইতে শুরু করল সেই গান, যে গান একদিন তার মা তাকে শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন।


গান শেষ হলে চারদিকে করতালির শব্দ উঠল। কিন্তু অয়নের চোখ আটকে রইল আকাশের দিকে। তার মনে হলো, কোথাও থেকে মা হয়তো হাসছেন।


অনুষ্ঠান শেষে মেঘলা দৌড়ে এসে বলল, “কাকু, আজ আপনার গান শুনে মনে হলো, আপনার মা নিশ্চয়ই খুব খুশি হয়েছেন!”


অয়ন মেয়েটির মাথায় হাত রেখে মৃদু হেসে বলল, “জানিস মেঘলা, আমি এত দিন ভেবেছিলাম, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সুরটা হারিয়ে গেছে। আজ বুঝলাম, সুরটা হারায়নি। আমি শুধু তার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম।”


মেঘলা বলল, “তাহলে এখন আর হারাবে না তো?”


অয়ন কিছুক্ষণ নীরব থেকে উত্তর দিল, “না রে। যত দিন ভালোবাসা থাকবে, যত দিন কেউ কারও জন্য গান গাইবে, তত দিন কোনো সুরই পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না।”


সেদিন বাড়ি ফিরে অয়ন মায়ের পুরোনো ছবিটার সামনে দাঁড়াল। ছবির নিচে রাখা হারমোনিয়াম থেকে আবার ভেসে উঠল পরিচিত সেই সুর।


ঘরটা আর আগের মতো নীরব ছিল না।


মায়ের কণ্ঠ ফিরে আসেনি, অতীতও ফিরে আসেনি। কিন্তু অয়ন বুঝতে পেরেছিল, ভালোবাসার মানুষ চলে গেলেও তার রেখে যাওয়া অনুভূতি, শিক্ষা আর স্মৃতি অন্য কোনো হৃদয়ে নতুন করে বেঁচে থাকতে পারে।


কিছু সুর কানে শোনা যায়, কিছু সুর হৃদয়ে বাজে। আর যে সুর ভালোবাসা দিয়ে তৈরি, তাকে সময় মুছে ফেলতে পারে না।


সেই রাত থেকে অয়ন আর নিজের গানকে হারানো সুর বলে ডাকেনি।


সে তার নাম দিয়েছিল—“মায়ের ভালোবাসা।”


০ মন্তব্য · ৬০ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!