প্রথম পাতা › গল্প ও উপন্যাস › হাতেম তাই: সাতটি প্রশ্নের রহস্য

গল্প ও উপন্যাস

হাতেম তাই: সাতটি প্রশ্নের রহস্য

বিজ্ঞাপন
হাতেম তাই: সাতটি প্রশ্নের রহস্য

হাতেম তাই: সাতটি প্রশ্নের রহস্য


বিজ্ঞাপন

প্রথম পাঁচ অধ্যায়


প্রথম অধ্যায়: রুপালি বাক্সের সাতটি বৃত্ত


অনেক দিন আগের কথা। পাহাড়, নদী আর বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে ঘেরা এক রাজ্যে বাস করতেন দয়ালু ও সাহসী যুবক হাতেম তাই। তাঁর কাছে ধনসম্পদের চেয়ে মানুষের দুঃখ মোচন করা ছিল অনেক বেশি মূল্যবান। কোনো পথিক বিপদে পড়লে, কোনো ক্ষুধার্ত মানুষ সাহায্য চাইলে কিংবা কোনো অসহায় মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় তাঁর দরজায় এলে—হাতেম কাউকে খালি হাতে ফেরাতেন না।


এক সন্ধ্যায় আকাশে কালো মেঘ জমেছিল। দূরে পাহাড়ের গায়ে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় হাতেমের প্রাসাদের দরজায় এসে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধ। তাঁর পোশাক ধুলোমাখা, মুখ ক্লান্ত, আর চোখে এমন এক গভীর বিষাদ—যেন বহু বছরের কষ্ট সেখানে জমে আছে।


বৃদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল এক তরুণী। তার নাম জোহরা। মেয়েটির চোখে ভয় থাকলেও তার ভেতরে ছিল অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।


হাতেম নিজেই এগিয়ে এসে বললেন, “আপনারা নিশ্চয়ই অনেক দূর থেকে এসেছেন। আগে ভেতরে আসুন। বিশ্রাম নিন, তারপর আপনাদের কথা শুনব।”


বৃদ্ধ কৃতজ্ঞ চোখে তাকালেন। “মানুষ আপনার দয়ার কথা বলে, হাতেম। আজ নিজের চোখে তা দেখলাম।”


রাতের খাবারের পর বৃদ্ধ তাঁর জীবনের গল্প বলতে শুরু করলেন। তিনি একসময় নূরাবাদ রাজ্যের রাজদরবারে কাজ করতেন। কিন্তু রাজ্যে এক রহস্যময় ঘটনা ঘটার পর তাঁর জীবন বদলে যায়। সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক রাজকন্যা, হারিয়ে যাওয়া একটি রাজ্য-রহস্য এবং সাতটি প্রশ্ন।


কথা শেষ করে তিনি পোশাকের ভেতর থেকে বের করলেন একটি ছোট রুপালি বাক্স। বাক্সটির গায়ে সাতটি বৃত্ত খোদাই করা। প্রতিটি বৃত্তের মাঝখানে অদ্ভুত চিহ্ন, আর বাক্সের ঢাকনায় লেখা—


“সত্যের দরজা খুলবে সাতটি উত্তরে; কিন্তু প্রতিটি উত্তরের মূল্য দিতে হবে হৃদয় দিয়ে।”


হাতেম বাক্সটি হাতে নিয়ে গভীরভাবে দেখলেন। বৃত্তগুলোর মধ্যে প্রথমটি ক্ষীণ আলোয় জ্বলজ্বল করছিল।


“এটি কী?” হাতেম জানতে চাইলেন।


বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “এটি নূরাবাদের রাজকন্যা নাজমার রেখে যাওয়া শেষ নিদর্শন। রাজকন্যা নিখোঁজ হওয়ার আগে এই বাক্সটি আমার হাতে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, একমাত্র এমন একজন মানুষই এর রহস্য সমাধান করতে পারবে, যে নিজের স্বার্থের চেয়ে অন্যের কল্যাণকে বড় মনে করে।”


হাতেম কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর বললেন, “যদি একজন মানুষও আমার সাহায্যের অপেক্ষায় থাকে, তবে আমি চেষ্টা করব।”


বাইরে তখন ঝড় আরও জোরে বইছে। আর হাতেমের সামনে খুলে যাচ্ছে এমন এক পথ, যার শেষ কোথায়—তা কেউ জানে না।


দ্বিতীয় অধ্যায়: নূরাবাদের হারানো রাজকন্যা


পরদিন ভোরে হাতেম যাত্রার প্রস্তুতি নিলেন। তাঁর সঙ্গে যেতে চাইল জোহরা। বৃদ্ধ প্রথমে আপত্তি করলেও শেষ পর্যন্ত বুঝলেন, মেয়েটির সিদ্ধান্ত বদলানো যাবে না।


“রাজকন্যা নাজমা শুধু একজন রাজপরিবারের সদস্য নন,” জোহরা বলল। “তিনি সাধারণ মানুষের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন। তাঁকে খুঁজে বের করা আমার দায়িত্ব।”


দুপুরের দিকে তারা নূরাবাদে পৌঁছাল। একসময় যে নগরী আলো, সংগীত আর উৎসবে মুখর থাকত, সেখানে এখন নেমে এসেছে অদ্ভুত নীরবতা। বাজারের দোকান খোলা, অথচ মানুষের মুখে হাসি নেই। রাজপ্রাসাদের উঁচু মিনারগুলো যেন শোকের ভারে নুয়ে পড়েছে।


রাজা হাতেমকে দরবারে ডেকে পাঠালেন। তাঁর চেহারায় ক্লান্তি, চোখে নিদ্রাহীন রাতের ছাপ।


“আমার মেয়ে নাজমা সাত দিন আগে অদৃশ্য হয়েছে,” রাজা বললেন। “প্রাসাদের সব দরজা পাহারা দেওয়া হয়েছিল। কোনো প্রহরী কাউকে ঢুকতে বা বের হতে দেখেনি। অথচ তার ঘরে শুধু এই চিঠিটি পাওয়া গেছে।”


চিঠিতে লেখা ছিল—


“আমাকে খুঁজতে হলে সাতটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজুন। প্রথম উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের হৃদয়ে, শেষ উত্তর লুকিয়ে আছে আপনার নিজের ভেতরে।”


হাতেম চিঠিটি বারবার পড়লেন। তাঁর মনে হলো, রাজকন্যা হয়তো কোনো বিপদের আগাম ইঙ্গিত পেয়েছিলেন।


রাজা আরও জানালেন, নাজমা ছোটবেলা থেকেই প্রাচীন ইতিহাস, দর্শন এবং রহস্যময় স্থান নিয়ে পড়াশোনা করতেন। রাজ্যের বাইরে থাকা এক পুরোনো গ্রন্থাগারে তিনি প্রায়ই যেতেন। নিখোঁজ হওয়ার আগের দিনও তাঁকে সেখানে দেখা গিয়েছিল।


হাতেম প্রথমে সেই গ্রন্থাগারে গেলেন। ধুলোমাখা বইয়ের তাক, ভাঙা জানালা আর বহু বছরের পুরোনো পাণ্ডুলিপির ভেতর খুঁজতে খুঁজতে তিনি একটি মানচিত্র পেলেন। মানচিত্রে চিহ্নিত ছিল তিনটি স্থান—সাফির নগরী, দর্পণ মরুভূমি এবং নীরবতার হ্রদ।


মানচিত্রের পাশে লেখা ছিল প্রথম দুটি প্রশ্ন—


প্রথম প্রশ্ন: পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জিনিস কী, যা চোখে দেখা যায় না, অথচ মানুষকে বদলে দিতে পারে?


দ্বিতীয় প্রশ্ন: মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু কে—যে তার নিজের ভেতরেই বাস করে?


হাতেম বুঝলেন, এগুলো সাধারণ ধাঁধা নয়। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মানুষের মন, দুর্বলতা আর বিবেকের গভীরে প্রবেশ করতে হবে।


রওনা হওয়ার আগে তিনি রাজাকে আশ্বাস দিলেন, “আমি রাজকন্যাকে খুঁজে বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। তবে এই যাত্রায় শুধু শক্তি নয়, সত্যকে বোঝার ধৈর্যও প্রয়োজন হবে।”


রাজপ্রাসাদের ফটক পেরিয়ে হাতেম ও জোহরা যখন বেরিয়ে এলেন, তখন দূরের আকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। তাদের সামনে অপেক্ষা করছিল সাফির নগরীর দীর্ঘ পথ।


তৃতীয় অধ্যায়: সাফির নগরীর মুখোশ


সাফির ছিল এক বিচিত্র নগরী। সেখানে সোনার বাজার ছিল, দামি রেশমের দোকান ছিল, ছিল রাজকীয় প্রাসাদ আর বিশাল অট্টালিকা। কিন্তু সেই জাঁকজমকের আড়ালে লুকিয়ে ছিল মানুষের অসংখ্য গোপন কষ্ট।


নগরীতে প্রবেশ করেই হাতেম দেখলেন, এক ধনী ব্যবসায়ী তার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ কর্মচারীকে অপমান করছে। বৃদ্ধটি বহু বছর তার জন্য কাজ করেছেন, অথচ সামান্য মজুরি চাইতেই তাঁকে চোর বলে অভিযুক্ত করা হয়েছে।


হাতেম এগিয়ে গেলেন। “আপনি যদি সত্যিই ন্যায়পরায়ণ হন, তবে প্রমাণ ছাড়া একজন বৃদ্ধকে অপমান করছেন কেন?”


ব্যবসায়ী হেসে বলল, “এই পৃথিবীতে যার সম্পদ আছে, তার কথাই মানুষ বিশ্বাস করে।”


হাতেম বৃদ্ধ কর্মচারীর কথা শুনলেন, দোকানের হিসাব পরীক্ষা করলেন এবং বুঝতে পারলেন, ব্যবসায়ী নিজেই মজুরি আত্মসাৎ করেছে। উপস্থিত লোকদের সামনে সত্য প্রকাশ পেতেই ব্যবসায়ী লজ্জায় মাথা নিচু করল।


সেদিন রাতে এক সরাইখানায় আশ্রয় নিয়ে হাতেম প্রথম প্রশ্নটি নিয়ে ভাবতে লাগলেন।


পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জিনিস কী?


ভালোবাসা? বিশ্বাস? নাকি ক্ষমতা?


জোহরা বলল, “ক্ষমতা মানুষকে ভয় দেখাতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা তাকে বদলে দিতে পারে।”


হাতেম মাথা নেড়ে বললেন, “হয়তো প্রথম উত্তরের সন্ধান আমরা পেয়েছি। সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষকে নিজের সীমার বাইরে গিয়ে অন্যের জন্য কাজ করতে শেখায়।”


ঠিক তখনই রুপালি বাক্সের প্রথম বৃত্তটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল।


বাক্সের গায়ে নতুন একটি বাক্য ফুটে উঠল—


“ভালোবাসা শক্তিশালী, কারণ তা মানুষকে নিজের চেয়ে অন্যকে বড় করে দেখতে শেখায়।”


কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর তখনও বাকি।


পরদিন সকালে তারা নগরীর এক বিশাল প্রাসাদে পৌঁছাল। সেখানে এক প্রভাবশালী মন্ত্রী দরিদ্র মানুষের জমি দখল করে নিজের সম্পদ বাড়াচ্ছিলেন। মানুষ প্রতিবাদ করতে ভয় পেত, কারণ মন্ত্রীর হাতে ছিল রাজকীয় ক্ষমতা।


হাতেম প্রমাণ সংগ্রহ করে দরবারে বিষয়টি প্রকাশ করলেন। মন্ত্রী প্রথমে অস্বীকার করলেও তার হিসাবের খাতা সব সত্য সামনে এনে দিল।


“আপনার এত সম্পদ, এত ক্ষমতা,” হাতেম বললেন, “তারপরও আপনি অন্যের সামান্য জমি কেড়ে নিতে চান কেন?”


মন্ত্রী উত্তর দিতে পারলেন না।


হাতেম বুঝলেন, মানুষের ভেতরের সবচেয়ে বড় শত্রু অনেক সময় তার নিজের লোভ ও অহংকার। লোভ মানুষকে কখনো তৃপ্ত হতে দেয় না, আর অহংকার তাকে নিজের ভুল দেখতে বাধা দেয়।


দ্বিতীয় বৃত্তটিও আলোয় ভরে উঠল।


দ্বিতীয় উত্তর: লোভ ও অহংকার—যে শত্রু মানুষ নিজের ভেতরেই লালন করে।


বাক্সের নিচে নতুন একটি দিকনির্দেশ ফুটে উঠল। সেখানে লেখা ছিল—“যেখানে বালু আকাশের প্রতিবিম্ব গিলে ফেলে, সেখানে তৃতীয় সত্যের অপেক্ষা।”


হাতেম মানচিত্র খুললেন। তাদের পরবর্তী গন্তব্য—দর্পণ মরুভূমি।


চতুর্থ অধ্যায়: দর্পণ মরুভূমির পরীক্ষা


দর্পণ মরুভূমির নাম শুনতে যতটা সুন্দর, জায়গাটি ছিল ততটাই ভয়ংকর। দিনের বেলায় বালু আগুনের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠত। দূরে তাকালে মনে হতো, মরুভূমির মাঝখানে বিশাল জলাশয় রয়েছে। কিন্তু কাছে গেলেই দেখা যেত—সেটি কেবল মরীচিকা।


হাতেম ও জোহরা টানা দুই দিন পথ চলল। তাদের পানির মজুত কমে আসছিল। তৃতীয় দিনের দুপুরে তারা একটি পাথুরে টিলার কাছে পৌঁছাল। সেখানে এক আহত পথিক পড়ে ছিল। তার পাশে একটি পানির পাত্র, যাতে সামান্য পানি অবশিষ্ট।


জোহরা পাত্রটি তুলে বলল, “আমাদের নিজেদেরও পানি দরকার। কিন্তু লোকটিকে এভাবে ফেলে যাওয়া যায় না।”


হাতেম এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। তিনি পথিকের ঠোঁটে কয়েক ফোঁটা পানি দিলেন, ক্ষত পরিষ্কার করলেন এবং তাকে ছায়ায় নিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর লোকটির জ্ঞান ফিরল।


লোকটি তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমরা জানো না, এখানে সাহায্য করতে গিয়ে অনেকেই নিজের জীবন হারিয়েছে। কেন আমাকে বাঁচালে?”


হাতেম উত্তর দিলেন, “কারও জীবন বাঁচানো আর নিজের জীবনকে অবহেলা করা এক কথা নয়। তবে বিপদে কাউকে অসহায় ফেলে রেখে চলে যাওয়াও আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”


পথিকটি তাদের একটি সরু পথ দেখিয়ে দিল। সেই পথ ধরে তারা একটি পরিত্যক্ত পাথরের আশ্রয়স্থলে পৌঁছাল। দেয়ালে খোদাই করা ছিল তৃতীয় প্রশ্ন—


“মানুষ যখন একা থাকে, তখন তার কাজের বিচার কে করে?”


জোহরা বলল, “সমাজ হয়তো দেখে না, কিন্তু মানুষ নিজে তো জানে সে কী করেছে।”


হাতেম ধীরে ধীরে বললেন, “সেটিই বিবেক। অন্য কেউ না জানলেও নিজের অন্যায় থেকে মানুষ নিজেকে লুকাতে পারে না।”


কথাটি শেষ হতেই রুপালি বাক্সের তৃতীয় বৃত্ত জ্বলে উঠল।


তৃতীয় উত্তর: বিবেক—যে নীরবে মানুষের কাজের সাক্ষী হয়ে থাকে।


কিন্তু মরুভূমির পরীক্ষা শেষ হয়নি।


রাত গভীর হলে চারদিকে অদ্ভুত শব্দ শোনা গেল। বালুর ওপর ছায়ার মতো কিছু একটা নড়ছিল। জোহরা ভয় পেয়ে হাতেমের পাশে এসে দাঁড়াল। দূরে আগুনের মতো দুটি চোখ জ্বলে উঠল, আবার মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।


হাতেম তলোয়ার হাতে নিলেন, কিন্তু অদৃশ্য কিছুর দিকে আঘাত করলেন না। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, ওটি কোনো প্রাণী, নাকি মরুভূমির আলোছায়ার খেলা।


হঠাৎ বাতাসের মধ্যে ভেসে এল এক কণ্ঠ—


“যে নিজের ভয়কে চিনতে পারে না, সে অন্য কোনো সত্যের মুখোমুখি হওয়ার যোগ্য নয়।”


তারপর সব নীরব।


ভোর হওয়ার আগে রুপালি বাক্সে আরেকটি চিহ্ন দেখা দিল—একটি ঢেউয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কালো পাথর।


মানচিত্রে সেই চিহ্নের অর্থ ছিল একটাই—নীরবতার হ্রদ।


পঞ্চম অধ্যায়: নীরবতার হ্রদ


নীরবতার হ্রদ ছিল পাহাড়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত জলাশয়। সেখানে বাতাস বইত, অথচ গাছের পাতায় শব্দ হতো না। পাখি উড়ত, কিন্তু তাদের ডাক শোনা যেত না। হ্রদের পানি এতটাই স্থির ছিল যে, তাতে আকাশের প্রতিচ্ছবি আয়নার মতো দেখা যেত।


হাতেম ও জোহরা হ্রদের তীরে পৌঁছাতেই দেখলেন, পাথরের তৈরি একটি পুরোনো দরজা। দরজার ওপর খোদাই করা ছিল চতুর্থ প্রশ্ন—


“মানুষের পথ আটকে দেয় কোন অদৃশ্য দেয়াল?”


হাতেম দরজার চারপাশে ঘুরে দেখলেন। কোনো তালা নেই, কোনো হাতলও নেই। শুধু একটি পাথরের ফলক, যেখানে লেখা—“সত্য বলো, তাহলেই পথ খুলবে।”


জোহরা প্রথমে এগিয়ে গেল। “আমি রাজকন্যা নাজমাকে বাঁচাতে চাই,” সে বলল। “কিন্তু সত্যি কথা হলো, আমি ভয় পাচ্ছি। ভয় হচ্ছে, হয়তো তাঁকে আর কখনো খুঁজে পাব না।”


কিছুই ঘটল না।


হাতেম ফলকের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমিও ভয় পাচ্ছি। ভয় হচ্ছে, আমার সব চেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে। ভয় হচ্ছে, আমি এমন এক রহস্যের পেছনে ছুটছি, যার শেষ আমি জানি না। কিন্তু ভয় পেলেই যদি থেমে যাই, তাহলে অসহায় মানুষের জন্য এগিয়ে যাওয়ার অর্থ কী?”


কথা শেষ হতেই পাথরের দরজায় কম্পন শুরু হলো। ধীরে ধীরে দরজাটি খুলে গেল।


ভেতরে ছিল ছোট একটি কক্ষ। কক্ষের মাঝখানে কালো পাথরের ওপর রাখা একটি প্রদীপ। প্রদীপের পাশে লেখা—


“চতুর্থ উত্তর: ভয়। ভয় মানুষকে সতর্ক করতে পারে, কিন্তু ভয়কে নিজের প্রভু হতে দিলে সে মানুষকে বন্দি করে।”


হাতেম বাক্সের চতুর্থ বৃত্তে হাত রাখলেন। সেটিও আলোয় ভরে উঠল।


কক্ষের অন্য পাশে একটি সরু সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে গেছে। সিঁড়ির শেষ প্রান্তে তারা একটি পাথরের দেয়ালে অদ্ভুত চিহ্ন দেখতে পেলেন। চিহ্নগুলোর পাশে লেখা ছিল—


“যে প্রতিশোধকে ন্যায়বিচার বলে, সে একদিন নিজের হৃদয়কেও শত্রু মনে করবে।”


হাতেম বাক্যটি পড়ে থেমে গেলেন।


দেয়ালের নিচে পাওয়া গেল একটি পুরোনো চিঠি। তাতে লেখা ছিল, নূরাবাদের রাজদরবারের এক প্রাক্তন উপদেষ্টা জাফর বহু বছর আগে রাজপরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে রাজ্য ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, রাজদরবারের একটি সিদ্ধান্তে তাঁর পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছিল। এরপর থেকে তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ করেন।


চিঠির শেষ লাইনে লেখা—


“পঞ্চম উত্তর পেতে হলে সেই মানুষের মুখোমুখি হও, যে ন্যায়বিচারের নামে নিজের প্রতিশোধকে লুকিয়ে রেখেছে।”


জোহরা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, “জাফর কি রাজকন্যার নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে জড়িত?”


হাতেম চিঠিটি ভাঁজ করে রাখলেন। “আমরা এখনো জানি না। কিন্তু সত্যের পথ যত কঠিনই হোক, আমাদের এগোতে হবে।”


হ্রদের ওপর তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। দূরের পাহাড়ের চূড়ায় শেষ সূর্যের আলো মিলিয়ে যাচ্ছে। রুপালি বাক্সে চারটি বৃত্ত জ্বলছে, আর বাকি তিনটি অন্ধকারে ঢাকা।


হাতেম বুঝলেন, সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলো হয়তো এখনও সামনে অপেক্ষা করছে।


— প্রথম পাঁচ অধ্যায় সমাপ্ত —

০ মন্তব্য · ৬৯ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!