প্রথম পাতা › গল্প ও উপন্যাস › দ্বিধা

গল্প ও উপন্যাস

দ্বিধা

বিজ্ঞাপন
দ্বিধা


রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। জানালার পাশে বসে রায়হান একদৃষ্টিতে অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল।

বিজ্ঞাপন


তার হাতে একটি পুরোনো চিঠি।


চিঠিটা সে পেয়েছে আজ বিকেলে—নিজের দরজার নিচে পড়ে থাকা অবস্থায়। কোনো প্রেরকের নাম নেই, শুধু খামের ওপর লেখা—


“রায়হানের জন্য। একা পড়বে।”


চিঠির ভেতরে মাত্র কয়েকটি লাইন—


«“তুমি যদি সত্যিটা জানতে চাও, তাহলে আজ রাত বারোটায় পুরোনো রেলস্টেশনে এসো। কিন্তু মনে রেখো, সত্য জানার পর তোমার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।”»


চিঠিটা পড়ার পর থেকেই রায়হানের মনে অদ্ভুত এক অস্বস্তি।


পুরোনো রেলস্টেশনটি শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে। প্রায় দশ বছর ধরে সেখানে কোনো ট্রেন থামে না। জায়গাটা এখন পরিত্যক্ত। দিনের বেলাতেও সেখানে মানুষ খুব একটা যায় না।


রায়হান ঘড়ির দিকে তাকাল।


১১টা ৪০।


যাবে?


নাকি যাবে না?


মনের ভেতর দুটো কণ্ঠ যেন যুদ্ধ করছিল।


একটা বলছিল—

“এটা ফাঁদ হতে পারে। যেও না।”


অন্যটা বলছিল—

“যদি সত্যিই এমন কিছু হয়, যা তোমার জানা দরকার?”


শেষ পর্যন্ত কৌতূহল ভয়কে হারিয়ে দিল।


রাত ১২টার পাঁচ মিনিট আগে রায়হান পুরোনো স্টেশনে পৌঁছাল।


চারদিকে নিস্তব্ধতা। ভাঙা প্ল্যাটফর্মের ওপর বৃষ্টির পানি জমে আছে। দূরে একটা পুরোনো বাতি বারবার জ্বলছে আর নিভছে।


হঠাৎ—


টং... টং... টং...


স্টেশনের পুরোনো ঘড়িতে বারোটা বাজল।


ঠিক তখনই রায়হান শুনতে পেল কারও পায়ের শব্দ।


ধীরে ধীরে একজন মানুষ অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল।


রায়হান তাকে দেখে জমে গেল।


লোকটি আর কেউ নয়—


তার বাবা।


কিন্তু তার বাবা তো পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন!


রায়হান পিছিয়ে গেল।


“বাবা...?”


লোকটি কোনো উত্তর দিল না। শুধু তার হাতে থাকা একটি কালো ব্যাগ মাটিতে রেখে বলল,


“এটা তোমার জন্য।”


রায়হানের হাত কাঁপছিল।


“আপনি... আপনি কে?”


লোকটি মৃদু হেসে বলল,


“যাকে তুমি তোমার বাবা ভেবেছ, আমি সে নই। কিন্তু তোমার বাবার মৃত্যুর সত্য আমি জানি।”


কথাটা শুনে রায়হানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।


লোকটি চলে যেতে উদ্যত হলে রায়হান চিৎকার করে বলল,


“দাঁড়ান! আমার বাবার কী হয়েছিল?”


লোকটি ফিরে তাকাল।


“তোমার বাবা মারা যাননি দুর্ঘটনায়। তিনি খুন হয়েছিলেন।”


রায়হান নিস্তব্ধ হয়ে গেল।


“কে খুন করেছিল?”


লোকটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,


“যাকে তুমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো।”


তারপর সে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।


রায়হান ব্যাগটি খুলল।


ভেতরে ছিল কিছু পুরোনো ছবি, একটি ডায়েরি এবং একটি ছোট পেনড্রাইভ।


বাড়ি ফিরে সে ডায়েরিটি খুলল।


প্রথম পাতায় বাবার হাতের লেখা—


“রায়হান যদি কখনো এই ডায়েরি পায়, তাহলে বুঝতে হবে আমি আর বেঁচে নেই।”


পরের পাতাগুলো পড়তে পড়তে রায়হানের চোখ বড় হয়ে গেল।


তার বাবা লিখেছিলেন, বহু বছর আগে তিনি একটি বড় আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছিলেন। সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল তার নিজের ব্যবসায়িক অংশীদার—রায়হানের চাচা।


শেষ পাতায় লেখা ছিল—


“আমি জানি, আমার মৃত্যুর পেছনে সে জড়িত। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, রায়হান তাকে নিজের বাবার মতো বিশ্বাস করে।”


রায়হানের হাত থেকে ডায়েরি পড়ে গেল।


তার চাচা!


যে মানুষটি বাবার মৃত্যুর পর তাকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিল।


যে মানুষটি তার পড়াশোনার খরচ দিয়েছিল।


যে মানুষটি প্রতিটি বিপদে তার পাশে দাঁড়িয়েছিল।


তাহলে এতদিনের ভালোবাসা কি অভিনয় ছিল?


পরদিন সকালে রায়হান চাচার বাড়িতে গেল।


চাচা তাকে দেখে হাসলেন।


“কী ব্যাপার রে? এত সকালে?”


রায়হান কোনো উত্তর দিল না।


তার চোখে তখন এক অদ্ভুত দ্বিধা।


সে কি ডায়েরির কথা বলবে?


নাকি চুপ থাকবে?


একদিকে বাবার মৃত্যুর সত্য জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।


অন্যদিকে শৈশব থেকে পাওয়া চাচার ভালোবাসা।


হঠাৎ চাচা বললেন,


“তোর বাবার কথা মনে পড়ছে?”


রায়হান চমকে উঠল।


“কেন?”


চাচা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,


“কারণ আজ ঠিক পাঁচ বছর আগে তোর বাবা মারা গিয়েছিল।”


রায়হানের বুক কেঁপে উঠল।


সে ধীরে ধীরে বলল,


“চাচা... বাবা কীভাবে মারা গিয়েছিল?”


চাচার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।


অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি বললেন,


“সব সত্য জানা ভালো নয়, রায়হান।”


এই একটি কথাই রায়হানের সমস্ত দ্বিধা ভেঙে দিল।


সে বুঝে গেল—


চিঠিটি শুধু তাকে সত্যের কাছে নিয়ে যায়নি, বরং এমন এক সত্যের দরজা খুলে দিয়েছে, যার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে তার নিজের পরিবার।


রায়হান পকেট থেকে পেনড্রাইভটি বের করল।


“চাচা, এটা কী?”


চাচার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।


তিনি কিছু বললেন না।


রায়হান বুঝতে পারল—


তার সন্দেহ ভুল নয়।


কিন্তু ঠিক তখনই চাচা চোখের পানি মুছে বললেন,


“তোর বাবাকে আমি খুন করিনি।”


রায়হান থমকে গেল।


“তাহলে?”


চাচা ধীরে ধীরে বললেন,


“আমি জানতাম কে করেছে। কিন্তু এত বছর আমি চুপ ছিলাম... কারণ খুনি শুধু তোর বাবাকে হত্যা করেনি—সে আমার পরিবারকেও ধ্বংস করে দিতে পারত।”


রায়হান এবার প্রশ্ন করল,


“কে?”


চাচা কাঁপা হাতে জানালার দিকে তাকালেন।


“যে মানুষটা তোকে গত রাতে স্টেশনে চিঠি দিয়েছে।”


রায়হানের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।


সে বুঝতে পারল—


গত রাতের সেই মানুষটি তাকে সত্য জানাতে আসেনি।


সে তাকে একটি নতুন ফাঁদের দিকে নিয়ে গেছে।


রায়হান জানালার বাইরে তাকাল।


দূরে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।


অন্ধকারের মধ্যেও তাকে চেনা যাচ্ছে।


তার হাতে সেই একই কালো ব্যাগ।


লোকটি দূর থেকে শুধু একবার হাত নাড়ল।


তারপর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।


রায়হান বুঝল—


তার আসল পরীক্ষা এখন শুরু।


সত্য জানার আগে মানুষের দ্বিধা থাকে।

কিন্তু সত্য জানার পর—কাকে বিশ্বাস করবে, সেই দ্বিধাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

০ মন্তব্য · ৬৩ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!