প্রথম পাতাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিজীবনের উৎপত্তি

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

জীবনের উৎপত্তি

জীবনের উৎপত্তি

কখনও কি ভেবে দেখেছেন—এই যে আমরা বেঁচে আছি, হাসছি, কাঁদছি, প্রশ্ন করছি, মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টা করছি, এমনকি ফেসবুক স্ক্রোল করছি—এসবের কি মহাবিশ্বের কাছে আদৌ কোনো “প্রয়োজন” ছিল? পৃথিবীতে যদি কোনোদিন প্রাণের উদ্ভবই না হতো, তাহলে কি মহাবিশ্বের কোনো বড় ক্ষতি হতো? নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু কি থেমে যেত? গ্যালাক্সির গতি কি বদলে যেত? ব্ল্যাক হোল কি তার মহাকর্ষীয় প্রভাব হারাত? না। পৃথিবীতে প্রাণ না থাকলেও মহাবিশ্ব তার নিজস্ব নিয়মে চলতে থাকত। 

তাই প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পায়নি যে প্রাণের সৃষ্টি মহাবিশ্বের কোনো পূর্বনির্ধারিত “প্রয়োজন” বা উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ঘটেছে।

বিজ্ঞাপন

জীবনের উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞান যে চিত্রটি আমাদের সামনে তুলে ধরে, তা কোনো পূর্বপরিকল্পিত কোনও ডিজাইন নয়; বরং দীর্ঘ রাসায়নিক ও জৈব বিবর্তনের ছবি। আদিম পৃথিবীতে জল, কার্বন-সমৃদ্ধ অণু, খনিজ, বিভিন্ন গ্যাস এবং সূর্যালোক, আগ্নেয়গিরি, বজ্রপাত বা ভূ-তাপীয় পরিবেশের মতো শক্তির উৎস ছিল। সেই পরিবেশে কোটি কোটি বছর ধরে অসংখ্য রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটেছে। কীভাবে ঠিক সেই রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলোর মধ্য থেকে প্রথম স্ব-প্রতিলিপিকারী ব্যবস্থা এবং পরবর্তীতে প্রথম কোষীয় জীবন তৈরি হয়েছিল, তা আমরা এখনও পুরোপুরি জানি না।

 “Primordial soup” বা কোনো একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক ঘটনার মাধ্যমে হঠাৎ প্রাণের জন্ম—জীবনের উৎপত্তির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এত সরল নয়। RNA-নির্ভর প্রাথমিক ব্যবস্থা, hydrothermal vent এবং আরও নানা সম্ভাব্য পথ নিয়ে গবেষণা চলছে। কিন্তু একটি বিষয় ক্রমশ স্পষ্ট—জীবনের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত উদ্দেশ্য বা পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনার বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন নেই। রাসায়নিক ও ভৌত নিয়মের মধ্যেই জটিলতা তৈরি হতে পারে; আর একবার এমন ব্যবস্থা তৈরি হলে যা নিজেকে প্রতিলিপি করতে পারে এবং পরিবর্তিত হতে পারে, তখন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের বিশাল দরজা খুলে যায়।


জীবন যদি পূর্বপরিকল্পিত না হয়, তার অর্থ এই নয় যে জীবন সম্পূর্ণ অর্থে একটি “অঘটন”। বরং বলা ভালো—জীবনের উদ্ভব ছিল প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে সম্ভাবনার বাস্তবায়ন। একটি নির্দিষ্ট ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল না, কিন্তু সেই ফলাফল ঘটার জন্য প্রকৃতির নিয়ম ও পরিবেশ কিছু সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। আর জীবন একবার উদ্ভূত হওয়ার পরও মানুষ ছিল তার পূর্বনির্ধারিত গন্তব্য—এমন কোনো প্রমাণ নেই। বিবর্তন কোনো সিঁড়ি নয় যার শেষ ধাপে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে; এটি অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে পড়া একটি বিশাল বৃক্ষ। কোটি কোটি বছর ধরে অসংখ্য জীব এসেছে, পরিবর্তিত হয়েছে, বিলুপ্ত হয়েছে। ডাইনোসর পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করেছে, আবার বিলুপ্ত হয়েছে। স্তন্যপায়ীদের এক ক্ষুদ্র শাখা থেকে বহু পরে মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। অর্থাৎ মানুষ বিবর্তনের উদ্দেশ্য নয়; মানুষ বিবর্তনের একটি ফল।


তাহলে কি আমাদের অস্তিত্বের কোনো মূল্য নেই? এখানেই বিজ্ঞান থেকে প্রশ্নটি দর্শনের দিকে চলে যায়। মহাবিশ্বের কাছে আমাদের কোনো “প্রয়োজন” না থাকলেও মানুষের কাছে মানুষের অস্তিত্বের মূল্য অসীম হতে পারে। আমরা এমন এক প্রাণী, যে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে। দূরবর্তী নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণ করে আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের শরীরের কার্বন, অক্সিজেন, ক্যালসিয়াম কিংবা লোহার মতো মৌলগুলোর ইতিহাস বহু পুরোনো নাক্ষত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। আমরা কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর ইতিহাস পুনর্গঠন করতে পারি, জীবনের বিবর্তন অনুসন্ধান করতে পারি এবং এমনকি প্রশ্ন করতে পারি—“এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা কেন?” এই অর্থে মানুষকে বলা যায় মহাবিশ্বের এমন এক অংশ, যে মহাবিশ্বকে নিজের সম্পর্কে প্রশ্ন করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এটিকে মহাবিশ্বের কোনো সচেতন পরিকল্পনার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি গভীর দার্শনিক উপলব্ধি, বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়।

সম্ভবত এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে সুন্দর দিকটি লুকিয়ে আছে। জীবনের মূল্য হয়তো বাইরে থেকে মহাবিশ্ব আমাদের হাতে তুলে দেয়নি; জীবনের মূল্য আমরা নিজেরাই তৈরি করি। ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, জ্ঞানচর্চা, শিল্প, বিজ্ঞান, সহমর্মিতা, অন্যের জীবনকে একটু ভালো করে তোলা—এসবের কোনো মহাজাগতিক নির্দেশিকা নেই। তবু এগুলোর মূল্য আমাদের কাছে বাস্তব। মহাবিশ্বের কাছে মানুষের প্রয়োজন না থাকলেও মানুষ মহাবিশ্বকে জানতে চায়; মহাবিশ্ব আমাদের জন্য কোনো উদ্দেশ্য নির্ধারণ না করলেও আমরা নিজেদের জীবনের উদ্দেশ্য তৈরি করতে পারি।


তাই প্রাণের সৃষ্টি “মহাজাগতিক প্রয়োজন” ছিল—এমন দাবি করার মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আমাদের নেই। আবার একে নিছক “অঘটন” বললেও ছবিটা অসম্পূর্ণ থাকে। বরং এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানের সবচেয়ে সংযত এবং গভীর অবস্থান হতে পারে—জীবন কোনো পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যের দিকে মহাবিশ্বের যাত্রার প্রমাণ নয়; এটি প্রকৃতির নিয়ম, রাসায়নিক সম্ভাবনা, পরিবেশ এবং দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসের এক অসাধারণ ফল।

আর সেই ফলের সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিণতি সম্ভবত আমরা নিজেরাই—কয়েকটি মৌল দিয়ে তৈরি এমন কিছু জীবন্ত সত্তা, যারা নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করতে পারে, নিজের উৎপত্তি অনুসন্ধান করতে পারে এবং মহাবিশ্বের বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে জানতে চায়—আমরা এখানে কেন?


হয়তো মহাবিশ্বের কাছে আমাদের কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু সেই মহাবিশ্বকে জানার এই বিরল সুযোগটি আমরা পেয়েছি—এটাই হয়তো আমাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় বিস্ময়। আপনি কি বলেন?


✍️ ------ নিষাদ ।।

০ মন্তব্য · ২২ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!