Movie name : ROMA (2018)
Country : Mexico
মেক্সিকান সিনেমার ইন্ডাস্ট্রির ভক্ত হয়ে গেলাম। এদের দেশে এতো অসাধারণ সিনেমা নির্মিত হয় সেটা না দেখে বুঝতে পারা যাবে না। এই রোমা সিনেমাটি আসলেই অসাধারণের চেয়েও অনেক বেশি অসাধারণ। শুধু মেক্সিকতেই নয়, পুরো বিশ্বে এই রোমা সিনেমাটি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ও প্রশংসিত। সিনেমাটির মূল চরিত্র একজন গৃহকর্মী যার নাম ক্লিও। মালিকের প্রতি আনুগত্য, সততা ও আন্তরিকতার দৃশ্যগুলো আবেগ ও দক্ষতার সাথে প্রেজেন্ট করা হয়েছে, যেটা সিনেমা প্রেমীদের অনুপ্রাণিত করবে।।
সিনেমার নাম Roma কেনো ? আসলে এটি মেক্সিকো সিটির একটি এলাকা যেখানে বাস করতেন এই সিনেমার পরিচালক আলফোনসো কুয়ারোন। এই ধুলোমাখা আবেগময় শহরে তার শৈশব কেটেছে আর তাদের বাসার গৃহকর্মী ছিলো মিস ক্লিও যাকে নিয়েই এই সিনেমা। মিস ক্লিও শুধুই গৃহকর্মী ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন তাদের পরিবারের একটি অংশ।তাদের আত্মার অংশ। মালিকের প্রতি কতটা ভালোবাসা ও আন্তরিকতা থাকলে আত্মার বন্ধন সৃষ্টি হয়। এরকম গৃহকর্মী থাকলে যে কোন পরিবার আপন করে নিবে। বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মিস ক্লিওকে নিজদের পরিবারে একজন ভাবতো।।
সিনেমার সময়কাল ছিলো ১৯৭০ সালের মেক্সিকো সিটি। মধ্যবিত্ত মানুষের প্রবাহমান জীবন চিত্র ফুটে উঠেছে। হাসি, আনন্দ, দুঃখ ও কষ্ট সব কিছুই আছে। সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন চলছে। সিনেমার সাউন্ড থেকে শুরু করে প্রতিটা দৃশ্য আর ডায়লগ খুব অসধারণ লেগেছে। ভালো লাগার মতন আর্ট ড্রামা। সিনেমাটি সাদাকালো হলেও সিনেমার চরিত্রগুলোর মধ্যে যে আবেগ, কল্পনা এবং বুকভরা আশা ও হতাশা গুলো রঙিন ছিলো। এই রঙিন বুঝতে হলে মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে।।
মিস ক্লিও হাসিখুশি একজন মহিলা। তার মালিক সোফিয়ার ঘরে নিজের মত করেই থাকেন ও কাজ করেন।সোফিয়াও তার গৃহকর্মীকে ভালোবাসেন। হুট করেই সোফিয়ার স্বামী স্ত্রী সন্তান ছেড়ে চলে যায়। মিস ক্লিও ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আগলে রাখেন। পুরো সিনেমাটাই আবেগ ঠাসা। এক একটা দৃশ্যে মায়ায় ভরপুর। চোখের জলে আনন্দ আছে আবার কষ্ট আছে। নিজের কষ্ট অনেকটাই কমানো যায় যদি অন্যের কষ্টের ভাগীদার হওয়া যায়।।
সিনেমায় কয়েকটি ইমোশনাল দৃশ্য আছে। মিস ক্লিও তার বয়ফ্রেন্ডের দ্বারা গর্ভবতী হন কিন্তু আগত সন্তান ও নিজের কোন স্বীকৃতি পায়নি। দৃশ্যগুলো বেশ আবেগময়। মনে মনে ক্লিও এর বয়ফ্রেন্ডের উপর রাগ হচ্ছিলো। বদমাস একটা। মানষিক ভাবে যখন ক্লিও ভেঙে পরেন, তখন মিসেস সোফিয়া তার পাশে ছিলো। সব ধরনের মানসিক ও আর্থিক সাহায্য করেছেন। নিজ খরচে গাইনী ডাক্তার দেখিয়েছেন। মানবতার অপূর্ব সৌন্দর্য দেখে আমি অভিভূত। এটা সিনেমা নাকি মানবতার এক জীবন্ত শিল্প।
ঘটনাগুলো কিন্তু বেশিরভাগ বাস্তব। সিনেমার যে ডিরেক্টর তার বাসায় যে গৃহকর্মী তার জীবনের গল্প সিনেমার পর্দায় হাজির করলেন। অসাধারণ মেক্সিকান সিনেমা।
সিনেমায় মেক্সিকান কালচার প্রাধান্য পেয়েছে। এক সাথে আনন্দ ও দুঃখ কষ্ট ভাগাভাগি করার মধ্যে শান্তি আছে। সোফিয়ার ফ্যমিলি দূরে ঘুরতে যায়। পাহাড় দেখে,সবুজে ঘেরা বন আর নীল সমুদ্র। ঘুরতে গেলে মিস ক্লিও তাদের অংশ হয়। সোফিয়ার মনেও অনেক কষ্ট কারণ তার স্বামী থেকেও নেই। মিসেস সোফিয়া ও মিস ক্লিও দুজনের মনের কষ্ট একত্র হয়ে যায়। মাইনাসে মাইনাসে যেমন প্লাস তেমনি দুঃখে দুঃখে কাটকাটিতে কিছুটা মানসিক সুখ। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য আনন্দ ও সুখের প্রয়োজন।।
সবচেয়ে বেশি ইমোশনাল দৃশ্য ছিলো সমুদ্রের তীরে।সোফিয়ার ছোট ছোট দুজন ছেলে মেয়ে সমুদ্রের স্রোতে তলিয়ে যায়। জীবন বাজি রেখে তাদের বাঁচায় যদিও নিজে সাঁতার জানে না। নিজের সন্তান জন্মের পরেই মারা যায়। কষ্টের একটা সিকুয়েন্স ছিলো। নিজের সন্তান হারানোর কষ্ট বুঝেছিলো তাই হয়তো বাঁচিয়ে দিলো মালিকের সন্তানদের। কিছু মানবতা অনেক সময় কষ্ট থেকে আসে। শোক হয়ে উঠে শক্তিতে।।
সবাই সবাইকে জড়িয়ে ধীরে রাখে। সোফিয়া কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে সন্তানদের বাঁচানোর জন্য। এই মুভি অনেকটাই বায়োপিক। নিজ বাসার গৃহকর্মী নিয়ে কেউ বায়োপিক বনাইয়েছে কিনা মনে হয় না। অসাধারণ আর্ট। জীবনে বড় কষ্টগুলোকে ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে হয় যেভাবে মাথার উপরে প্লেন মেঘ ফাঁকি দিয়ে দুরন্ত ভাবে এগিয়ে যায়।।
মানুষের জীবনকাল ক্ষুদ্র হলেও ভালোবাসা,সততা ও সম্মান তাকে বড় করে তোলে। ভালবাসা ও আত্মত্যাগ হলো জীবনের ভেলা যেই ভেলায় ভেসে পারি দিতে হয় জীবনের সমুদ্র। সামাজিক ভেদাভেদ ও অহংকার না থাকলে মন বা হৃদয় অনেকটাই হাসিখুশি থাকে। সিনেমাটি নারী কেন্দ্রিক বলা যায় কারণ একজন নারীর সংগ্রাম ও টিকে টাকার লড়াই দেখানো হয়েছে।।
টিকে থাকার কঠিন জীবনে কিছু মুহূর্ত খুব সহজ ও সুন্দর করা যায় যদি অন্তরে ভেদাভেদ না থাকে। মিস সোফিয়া চরিত্র থেকে তাই বুঝায়।।
আত্মত্যাগ ও নিঃস্বার্থ এই দুইটা গুণ সম্মান বয়ে আনে। একজন কর্মচারী কখন মালিকের কাছে অনেক আপন হয়ে সেটা জানতে এই মুভিটা দেখা উচিত।।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!