Movie name : The lives of Others (2006)
Country : Germany
ইউরোপের মধ্যে অন্যতম বেস্ট ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি হলো জার্মান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। তাদের কালচার সম্পর্কে জানার আগ্রহ হলো তাই ঠিক করলাম বেস্ট বেস্ট জার্মান মুভি দেখবো। লিস্টে প্রথমেই রাখলাম অস্কার জয়ী সিনেমা The lives of Other। এই অসাধারণ সিনেমাটি ২০০৭ সালে বেস্ট ফরেইন ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্ম ক্যাটাগরিতে অস্কার পুরস্কার লাভ করে।
আত্মা কখন মনুষত্বের ছায়া লাভ করে তা কেউ বলতে পারে না। সিনেমায় দেখায় সাহিত্যের শক্তি,কবিতার শক্তি ,শিল্পের শক্তি। নীরবতা বিপ্লব ঘটাতে পারে। সাহিত্য ও সুস্থ সংস্কৃতি নিষ্ঠুর আত্মাকে শান্ত করতে পারে। রাষ্ট্রের জুলুম ও পেশী শক্তিকে নষ্ট করতে পারে।মন জিনিষটা আসলেই অদ্ভুত আর সবচেয়ে অদ্ভুত তার মানবিক পরিবর্তন।
অসাধারণ একটা স্পাই ড্রামা সিনেমা। দেখলাম আর মুগ্ধ হলাম। দেখা শুরু করলে, আপনার অবচেতন মন সিনেমার গভীরে প্রবেশ করতে বাধ্য হবে। খুব বেশি স্পাই ফ্যাক্ট না হলেও ,একজন হাই প্রফেশনাল স্পাই অফিসারের মনের ভিতরের নেতিবাচক ও ইতিবাচক মনোভাব অসাধারণ ভাবে সিনেমায় উপস্থাপিত হয়েছে। সিনেমা ভালো লাগতে বাধ্য।।
জার্মান সিনেমায় সাধারণত পশ্চিম জার্মানী ও পূর্ব জার্মানীদের মধ্যে স্পাইগিরি ও বার্লিন ওয়াল ও ইতিহাসভিত্তিক বিষয়বস্তু বেশ প্রাধান্য পেয়ে থাকে।।
সময়টা ১৯৮৪ সাল, তখন পূর্ব জার্মানী ও পশ্চিম জার্মানী দুটো আলাদা রাষ্ট। পূর্ব জার্মানী রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা স্টাসি তখন দেশের মানুষের উপর গোয়েন্দা কর্মকান্ড চালানো হতো। আবার যদি পশ্চিম জার্মানীর সাথে কারো খাতির তাহলে তো কপালে শনি আশা স্বাভাবিক। কাউকে সামান্য সন্দেহ হলেই তার উপর চলতো হয় গোয়েন্দা নজরদারি, না হয় গ্রেফতার। এগুলো ছিলো বেশ অন্যায় কাজ। ব্যক্তি ও গঠনমূলক সমালোচনার স্বাধীনতা নেই।।
স্পাই মানেই হাজারো রকমের সাইকোলজিক্যাল খেলা। মাইন্ড গেমস বলা যায়। স্পাইদের কাছে দেশ সবার আগে। এদিকে পূর্ব জার্মানিতে সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে জড়িতদের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়। দুই একজন শিল্পী আত্মহত্যা করেন। যেটা সরকারের কাছে বেশ আতঙ্কের বিষয়। এগুলো জানাজানি হলে আন্তর্জাতিক চাপ আসবে, তাই গায়ের জোড়ে গোপন রাখা হয়। নাট্যকার মিঃ ড্রাইম্যান কৌশলে ফাঁস করতে চান।।
মিঃ ডিসলার ও ড্রাইম্যানের মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই কিন্তু ভাগ্য ও জাগ্রত বিবেক তাদের দুজনের মধ্যে আন্তরিকতা সৃষ্টি করেছে। মজার ব্যাপার হলো, দুজনের মধ্যে কখনও দেখা হয়নি, কথা হয়নি কিন্তু ব্রেইনের ভিতরে আন্তরিকতা সৃষ্টি হয়েছে। সিনেমার শেষে দেখা যায়,মিঃ ড্রাইম্যান সেই স্পাই অফিসার ডিলারকে তার লিখা বই উৎসর্গ করেছে।
মিঃ ড্রাইম্যান এক সময় বুঝতে পারে গোপনে কেউ গোপনে তাকে সাহায্য করেছে। পরে নিজে তদন্ত করেন। স্পাই অফিসারদের নাম নথিতে থাকে না কিন্তু কোড থাকে। তাই সেই কোড দিয়ে নিজের নতুন প্রকাশিত বই উৎসর্গ করেছেন।।
পূর্ব জার্মানীর বিখ্যাত নাট্যকার ও লেখক ড্রেইম্যান ও তার বান্ধবী ও জনপ্রিয় থিয়েটার অভিনেত্রী মারিয়া এবং স্পাই অফিসার মিঃ ডিসলার সিনেমার মূল চরিত্র। প্রতিটা চরিত্রের মধ্যে গভীর দর্শন আছে, আবেগ আছে, হার ও জিতের নৈতিকতার শিক্ষা আছে। মারিয়ার চরিত্রটা বেশ ইমোশনাল ও শোষণের প্রতীক। সমাজ তাকে শুধু ব্যবহারই করে।।
লেখকরা হলেন আত্মার প্রকৌশলী এই কথাটা বলছিলেন সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। মঞ্চ নাটক দেখার পর ড্রেইম্যানের উদ্দেশ্যে এই কথা বলেন। এই সরকারি গোয়েন্দা কর্মকর্তা কিন্তু মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতার পিছনে লেগে থাকেন। বিশেষ করে সুন্দরী অভিনেত্রী মারিয়াকে তার পছন্দ। সরকারের গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেধাবী কিন্তু দুই একজনের মেধা মাঝে মাঝে নারীর স্তন থাকে নাভীর নিচ পর্যন্ত চলে যায়, মানে কেউ কেউ নারী লোভী।।
গোয়েন্দা সংস্থা থেকে অনুমান করা হয় বিখ্যাত নাট্যকার ও লেখক ড্রেইম্যান সরকারের সাথে বেইমানী করলেও করতে পারে। তাই তার বাসায় বিভিন্ন ডিভাইস লুকিয়ে রেখে তার ফোনে আড়ি পাতা হয়। বাসায় কখনো কার সাথে কি কথা বলে সেগুলো শোনা হয়। এই কাজটা খুব মনোযোগ দিয়ে করেন মিঃ ডিসলার। সেই সাথে সব তথ্য টাইপ করে রাখেন। আড়ি পেতে কথা শুনেন আর অবাক হয়ে যান। মনে মনে ভাবেন উনি রাষ্টের শত্রু হতেই পারেন না, বরং রাষ্টই জনগণের শত্রু হয়ে গিয়েছে।।
মিঃ ডিসলার আবেগহীন মানুষ ও বেশ নিষ্ঠুর। তিনি রাষ্ট্রের সুবিধা ছাড়া উনি কিছুই বুঝেন না। সিনেমায় একটা টার্নিং পয়েন্ট আছে। মিঃ ডিসলার মানুষটা এতো আবেগহীন ও নিষ্ঠুর কিন্তু হুট করেই তার মধ্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। কারণ লেখক মিঃ ড্রাইম্যানের প্রেমালাপ ও সাহিত্য নিয়ে কথা শুনতে শুনতে তার মন নরম হয়ে যায়। তার ইমোশনাল কথা তার চোখ দিয়ে অজান্তে নোনা জল চলে আসে।প্রকৃত সত্য ও সাহিত্যের সাইকোলজি যখন একত্র হয় তখন সেটার শক্তি থাকে অনেক।।
মিঃ ড্রাইম্যান পূর্ব জার্মানীর আত্মহত্যা নিয়ে গোপনে একটি বই লিখেন আর ছদ্মনাম দিয়ে পশ্চিমে প্রকাশ করেন। মিঃ ডিসলার এটা জেনেও সরকারকে জানায় নি কারণ মিঃ ড্রাইম্যানের সততা ও তার শৈল্পিকতা তার নিষ্ঠুর মন ভেঙে দিয়েছে ও নরম মনের মানুষ করে দিয়েছে। পুরাই মাইন্ড টু মাইন্ড খেলা হয়েছে। নিজের ক্যারিয়ারের বিপদ জেনেও ঝুঁকি নিয়েছেন মিঃ ডিসকার।
সিনেমাটা এই জন্যই বিখ্যাত কারণ একজন স্পাই অফিসার তার নিষ্ঠুর সত্বাকে কোরবানি করে দিয়েছেন। হার মেনেছেন শিল্পের কাছে।।
সিনেমায় দেখালো শক্ত মনের নিষ্ঠুর মানুষ চাইলে নিজেকে পরিবর্তন হতে পারে। রাষ্ট্রের জন্য মানুষ কিন্তু মানুষের জুলুমের জন্য রাষ্ট নয়। ড্রামা সিনেমা যাদের পছন্দ তাদের তো ভালো লাগবেই কারণ সিনেমার প্রতিটা সিকুয়েন্স থেকে শুরু করে লোকেশন এবং ডিরেকশন বেস্ট মনে হয়েছে। পূর্ব জার্মানীর সংস্কৃতি প্রাধান্য পেয়েছে।।
সরকারের মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ড্রাইম্যান ও ডিসলারের উপর আলাদা করে তদন্ত করলেও সেটা বন্ধ হয়ে যায়। অভিনেত্রী মারিয়া রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর সব কিছু বদলে দেয়। অন্যদিকে নব্বই এর পরে বার্লিন ওয়াল ভেঙে যায়। মিঃ ড্রাইম্যান এর নতুন বই পাবলিশ হয়েছে। মিঃ ডিসলার এখন লাইব্রেরিতে।।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!