দৃশ্য: ১
মায়ামি, ফ্লোরিডা।
সুন্দর ঝকঝকে এক শহর।
চারদিকে সুনশান, পরিপাটি অবস্থা।
সবার মাঝে একটা সুখী সুখী ভাব।
সবার জীবন চলছে চমৎকারভাবে।
কিন্তু এরই মাঝে একদিন এক অঘটন ঘটে গেলো।
শহরের কোণে এক আইস ট্রাকে পাওয়া গেল এক অদ্ভুত লাশ।কেউ খুন করেছে।
কিন্তু বীভৎস দৃশ্য!
লাশের শরীরের প্রতিটা অঙ্গ একেবারে নিখুঁতভাবে কাটা, এক ফোঁটা রক্তও নেই বডিতে।
আর, এত শৈল্পিকভাবে মানুষ কর্তন কেবল উচ্চমানের খুনী শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব।
মায়ামি মেট্রো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এই ঘটনায় বেশ বিপাকে পড়ে যায়।
কোনো কূলকিনারা তারা পায় না।
কে করছে এসব, কেন করছে?উত্তর নেই।
.
দৃশ্য: ২
মরগান ডেক্সটার।একজন নিরীহ নিপাট ভদ্রলোক।
ব্যাচেলর।একা একা থাকে।বন্ধুবান্ধব নেই।একটা এপার্টমেন্টে কোনো রকম পড়ে থাকে।
রুটিন বেঁধে চলে।ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়।অনেকক্ষণ বেসিনের আয়নায় অন্যমনস্কভাবে নিজেকে দেখে।কী কী যেন ভাবে আনমনে।
একটা চাকরি করে সে।
মায়ামি মেট্রোপুলিশ ডিপার্টমেন্টের ফরেনসিক ব্ল্যাড স্প্যাটার অ্যানালিস্ট।
তুখোড় মেধা তার এই সেক্টরে।
শুধু রক্ত দেখলেই সে বিশ্লেষণ করে খুনী সম্পর্কে নিখুঁত উপসংহার টানতে পারে।চারদিকে তার বেশ প্রশংসা।
এই আইস ট্রাক খুনের পরও যথারীতি ফরেনসিকের জন্য তার ডাক পড়লো।
অলসভাবে আর দশটা খুনের মতোই সে তার ডিউটিতে গেলো।
কিন্তুউ ফর দ্য ফার্স্ট টাইম সে থমকে যায়।
এই খুনটা তার কাছে গতানুগতিক লাগে না।
কোথাও একটা খুব দক্ষতার ছাপ আছে।
ব্যাপারটা উদ্বেগজনক।
কপালে তার ভ্রুকুটি দেখা যায়।
সে কোনো ক্লু খুঁজে পায় না।
.
দৃশ্য: ৩
ডেক্সটারকে এবার একটু খুঁটিয়ে দেখা যাক।
আসলে দিনের বেলায় ডেক্সটার যতটা নিরীহ আর নির্ঝঞ্ঝাট ভদ্রলোক রাতের বেলায় সে তা না মোটেও।
সে রাতে হয়ে ওঠে এক ভয়ঙ্কর সাইকোপ্যাথ।এক সিরিয়াল কিলার।
কিন্তু চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, ডেক্সটার ঠিক তাদেরকেই কিল করে যারা নিজেরা বড় অপরাধী, অনেক খুনের খুনী। যারা ধরা পড়ে না বা পড়লেও আইনের হাত গলে বেরিয়ে যায়।যাদের কেউ কেউ নিজেরাই সিরিয়াল কিলার, সাইকোপ্যাথ।
অর্থাৎ, ডেক্সটার নিজেই সিরিয়াল কিলারদের কিল করে।
প্রায় প্রতিটা আপিসোডে সে একজন করে সিরিয়াল কিলারকে কিল করে।
এখন প্রশ্ন হলো: মর্গান ডেক্সটার এরকম কেন হলো?
সেটা জানতে যেতে হবে পেছনে।
বেশ কিছু বছর আগে।
যখন ডেক্সটারের বয়স ছিল মাত্র তিন বছর।
সে সময় একদিনের একটি দৃশ্যপটে দেখা যায় ডেক্সটারের মা কে চেইনস দিয়ে খুন করা হয়।
এর পর দেখা যায় রক্তে ভরা কন্টেইনারে মায়ের লাশের সাথে ৩ বছরের শিশু ডেক্সটার আটকে আছে।
দীর্ঘ সময় মৃত্যু আর রক্তের গন্ধের ভেতর থাকা ডেক্সটারকে উদ্ধার করে একজন পুলিশ সদস্য, হ্যারি।
পরবর্তীতে হ্যারির পালকপুত্র হিসেবেই ডেক্সটার বড় হতে থাকে হ্যারির পরিবারে।
কিন্তু সমস্যা একটি দেখা দিতে থাকে কদিন পর।
ডেক্সটার ওই ঘটনার পর আর স্বাভাবিক হয়নি।
তার ব্রেনে বেশ নেতিবাচক পরিবর্তন আসে।
পোস্ট ট্রমাটিক ইফেক্ট পড়ে।
দেখা গেলো, সে অবসরে খেলাচ্ছলে পোকামাকড় বা জীব হত্যা করছে।
মানে তার কাজটা খুব ভালো লাগে।
ব্যাপারটা দেখে তার পালকপিতা হ্যারি উদ্বিগ্ন হলেন।
নানাভাবে বুঝালেন।
কিন্তু কাজ হলো না।
খুনোখুনি থেকে ডেক্সটার বেরুতে পারছে না।
দীর্ঘদিনের পুলিশি অভিজ্ঞতা থেকে হ্যারি একটা সিদ্ধান্ত নিলেন।
ডেক্সটারের মধ্যে খুন জিনিসটাকে রাখতেই হবে।উপায় নেই।
তবে যদি পারা যায় সেটাকে একটু ইতিবাচক দিকে ঘুরিয়ে দিতে হবে।
অর্থাৎ সে যদি সিরিয়াল কিলারদের ই কিল করে তাহলে এরচেয়ে আর ভালো বিষে বিষক্ষয় হয় না।
এর পর ডেক্সটারকে তিনি সেই ট্রেনিং দিতে চেষ্টা করলেন।
কাজ হলো।ডেক্সটারের মাঝে একটা কোড গেঁথে দিলেন।
যাকে বলা হয়- হ্যারি'স কোড।
অর্থাৎ কগনিটিভ জাস্টিফিকেশন এন্ড বিহেভিয়ারেল ট্রেনিং এর মাধ্যমে তিনি এই ডেক্সটারকে গড়ে তুললেন।
আর এভাবেই ডেক্সটার পরিণত হয়ে উঠলো দিনে শান্ত আর রাতে অশান্ত এক দ্বৈতসত্তার মানুষে কিংবা এক সিরিয়াল কিলার সাইকোপ্যাথে।
.
দৃশ্য: ৪
আইস ট্রাক কিলার ব্যাপারটাতে এবার ফেরা যাক।(স্পয়লার এলার্ট)
আইস ট্রাক কিলার কে?
কী চায় সে?
সে ই বা কীভাবে সিরিয়াল কিলার হয়ে উঠলো?
এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় সিজন ১ এর শেষে।
আইস ট্রাক কিলার ওরফে ব্রায়ান হলো মর্গান ডেক্সটারের আপন ভাই।
ডেক্সটারের মায়ের খুনের দিন ডেক্সটারের সাথেই ব্রায়ানও আটকে পড়েছিল সেদিন।
কিন্তু সে হ্যারি কর্তৃক উদ্ধার হয়নি।
সে অন্যভাবে বেঁচে গিয়ে নিজে এক ভিন্ন পরিবেশে বড় হয়।সাথে থাকে সেই ঘটনার পোস্ট ট্রমাটিক ইফেক্ট, যা তাকেও সিরিয়াল কিলার বানায়।
আর, ডেক্সটারের মতো হ্যারি'স কোড পেয়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে সে সিরিয়াল কিলার হয়ে উঠেতে পারেনি।
অর্থাৎ, সে বেড়ে উঠেছে একজন রুথলেস সিরিয়াল কিলার হিসেবেই।
সে নিরীহ মানুষদের পিস পিস করে কেটে মেরে আনন্দ পায়।তার মধ্যে অযোগ্যদের ছাঁটাই করার প্রবণতা প্রবল।
আর সেজন্য ই পুরো শহরে একের পর এক সে আইস ট্রাক ট্রাকের মধ্যে খুন করে যেতে থাকে।
এবং খুব ই দক্ষ কিলার হওয়ায় তার ভাই ডেক্সটার তাকে খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়।
.
আজকের ডেক্সটারকে নিয়ে লেখার কারণ হলো: পোস্ট ট্রমাটিক ইফেক্টের কারণে একজন মানুষ কীভাবে সাইকোপ্যাথ হয়ে উঠে তার একটি নমুনা প্রদর্শন করা।
এটা পিওর সাইন্সের অ্যাসপেক্ট থেকে না বরং পপ-সাইন্স এবং সোশ্যালজির অ্যাসপেক্ট থেকে লেখা।
যাইহোক, কেউ চাইলে ডেক্সটার টিভি সিরিজটি দেখতে পারেন।বেশ উপভোগ্য।
আর, পাবলিক রেসপন্স সাপেক্ষে ইচ্ছে হলে আমি আগামীতে সাইকোপ্যাথ হয়ে ওঠার বিভিন্ন কারণ, প্রেক্ষাপট ও দৃষ্টান্ত নিয়ে কোনো লেখা লিখব ভাবছি।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!