এক নির্দয় সিরিয়াল কিলার অ্যান্টন শিগার ও এক মহান-হৃদয় জাভিয়ের বারডেমের কথা...
.
সে অনেকদিন আগের কথা।
আমার খায়েশ জাগলো, অস্কার পাওয়া সব মুভি দেখে ফেলব।লিস্ট দেখে সাল ধরে ধরে পর্যায়ক্রমে দেখা শুরু করলাম।এক এক করে দেখে দেখে পেছনে যেতে লাগলাম।
২০০৭ সালে অস্কার পাওয়া মুভির নামটি দেখে আমার বিরক্ত লাগলো।নাম: No country for old man.
তখন আমার কাছে টান টান উত্তেজনাপূর্ণ মুভি ছাড়া অন্য কিছু ভালো লাগত না।
ফলশ্রুতিতে এই নাম দেখেই মনে হলো, এই মুভি বিরক্তিকর হবে।
কারণ, থ্রিলার, অ্যাডভেঞ্চারের মুভি আয় করে ঠিক ই তবে অস্কার পায় না।
সেজন্য লিস্ট থেকে এটাকে স্কিপ করে আমার প্রিয় হিরো ডিক্যাপ্রিওর The Departed(2006) দেখা শুরু করলাম।
দারুণ থ্রিলার মুভি।
কিন্তু পুরো মুভির সংলাপে জুড়ে থাকা F***ng এই স্ল্যাং এর জন্য আগানো যাচ্ছিল না।
মুভি দেখার পর ভেবেছিলাম এই মুভিতেই বুঝি সর্বোচ্চ এই শব্দ উচ্চারিত হয়েছিল।
কিন্তু লিস্ট দেখে আমি চমকিত।উচ্চারণের ফ্রিকোয়েন্সি অনুযায়ী এটি আছে বরং ৫৭ নাম্বারে।
তাহলে ১ নাম্বারে যেটি আছে সেটির পুরো সংলাপ ই মনে হয় ওই শব্দ দ্বারা তৈরি।
যাইহোক, তখন মনে হলো, ধুর যা ভাবি তা তো হয় না।
আমি বরং No country for old men ই দেখি।
হয়ত ইন্টারেস্টিং কিছু আছে।
যথারীতি মুভি শুরু হলো: শুরুতে বৃদ্ধ শেরিফ Ed Tom Bell এর ন্যারেশনে মুভি শুরু হয়।সে বলতে চায়, আগের সময়ের অপরাধ আর এখনকার অপরাধ এক নয়; পৃথিবী এখন এমন বদলে গেছে যে যেখানে তার মতো পুরোনো ধ্যানধারণার মানুষদের আর মানায় না।অর্থাৎ নো কান্ট্রি ফর ওল্ড ম্যান বা Survival of the fittest.
যাইহোক এর পর একটা পুলিশ স্টেশনের দৃশ্য দেখা যায়।
স্টেশনের শেরিফ এক অপরাধীকে আটক করে।
সেই খুনিকে দেখেই হঠাৎ কেউ ভেবে বসবে তেরে নাম মুভির সলমন খান।
মানে চুলের স্টাইল একদম ই সেরকম ই।
সুতরাং, আমার হাসি চলে আসলো।নিশ্চয়ই শেরিফের নিজের ও এসেছিল।
কিন্তু, এরপর ই যা ঘটলো তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।শেরিফ একটা ফোনকল সারে।সারতে না সারতেই দেখা যায় শেরিফের পেছন থেকে নিজের হাতকড়া দিয়ে শেরিফের গলা পেঁচিয়ে ধরেছে সলমন খন ভেবে ভুল করা অপরাধীটি।
অনেক ধস্তাধস্তি শেষে হার মানে শেরিফ, ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে।
এখান থেকেই মূলত অ্যান্টন শিগার নামক ওই খুনির দৃশ্যায়ন শুরু হয়।
এর পর একের পর এক তার সিরিয়াল কিলিং দেখানো হয়।
কয়েন টস সহ নানা রকম প্রক্রিয়ায় খুন।
এত নির্বিকার, দৃঢ়চিত্ত, হাসি হাসি মুখে কিলিং দেখে যে কেউ ঢোক গিলবে।
টার্গেট এক শহর থেকে আরেক শহর পালায়, কিন্তু কীভাবে যেন অ্যান্টন শিগার নামক সিরিয়াল কিলারটি তার কাছে পৌঁছে যায়।
মানে পৃথিবীর কোথাও গিয়েও রেহাই নেই।
মুভির একটা পর্যায়ে আমার নিজেই কেমন যেন আনসেইফ ফিল করছিলাম।
মনে হচ্ছিল আমাকেও যেন খুঁজে ফিরছে সে।
যাইহোক, সিনেমা নিয়ে এটুকুর বেশি বললে স্পয়লার হয়ে যাবে।
বলতে চাচ্ছিলাম, শুরুতে নাম দেখে অবহেলা করলেও দেখার পর এই সিনেমাটি হয়ে যায় আমার দেখা অন্যতম সেরা সিনেমা।ভিলেন অ্যান্টন শিগার হয়ে যায় আমার সবচেয়ে প্রিয় ভিলেনের একজন।
এবং পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে দেখলাম, সিনেমাখোরদের ও টপ লিস্টে সিনেমা অবস্থান করছে।এবং যথারীতি তাদের কাছেও ভিলেন হিসেবে বা সিরিয়াল কিলার হিসেবে অ্যান্টন শিগার শুরুর দিকে থাকে।
এবার খোঁজ নিলাম এই চরিত্রের অভিনেতার সম্পর্কে।
স্পেনিশ অভিনেতা।
নাম জেভিয়ার বার্ডেম।
অনলাইনে ছবি বা ভিডিওতে দেখলাম।সেখানেও দেখতে কেমন আলাভোলা ভদ্রলোক টাইপ।ব্যক্তিজীবনেও ভদ্র।
এবং মুভিতেও সে ভদ্র চরিত্রেই অভিনয় করে।
আর সিরিয়াল কিলার খলনায়ক হিসেবে কেবল ওই মুভিতেই সে প্রথম অভিনয় করেছিল।
শুরুতে না কি অনেক গাইগুই করছিল, তাকে দিয়ে এরকম চরিত্র হবে না টবে না, অন্য একজন দেখতে ইত্যাদি ইত্যাদি।
কিন্তু মুভির পর পুরো পৃথিবীতেই সে আলোড়ন সৃষ্টি করে ফেললো।পরিণত হলো সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিলেনের একজনে।
এখনো তাকে কেউ পরিচয় করিয়ে দিলে উল্লেখ করে দেয় এভাবে যে, “ওই যে নো কান্ট্রি ফর ওল্ড ম্যান সিনেমার ভিলেনটি..."
এবার আসি অন্য প্রসঙ্গে।
জাভিয়ের বারডেম অভিনয়ের বাইরেও বেশ প্রতিবাদী কণ্ঠ।পৃথিবীর সকল অন্যায় নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি বরাবরই সোচ্চার।
বিভিন্ন সময় ফিলিস্তিন ইস্যুতে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী কাজের বিরোধিতা করেছেন এবং ফিলিস্তিনের প্রতিও অকুণ্ঠ সমর্থন করেছেন।
গত পড়শু অস্কারের অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করার সময়(নিজেও আগে জিতেছেন অস্কার) করে বসলেন আরেক সাহসী কাজ।
প্রাইজ গিভিং অংশে হঠাৎ ই বলে উঠলেন- “No to war and free Palestine.”
আকস্মিক এই বাক্যে সাথের সহ-উপস্থাপক প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে কিছুটা চমকিত ও বিব্রত দেখালেও দর্শকদের করতালি ছিল প্রচণ্ড।
দর্শকেরাও প্রবলভাবে তার সাথে একাত্ম হয়েছিল বটে, তবু অনুষ্ঠান শেষে তাকে পড়তে হয়েছিল তোপের মুখে।
৯৮ তম অ্যাকাডেমিক অ্যাওয়ার্ড গিভিং সিরিমনি না কি পলিটিক্যাল হয়ে গেছে, আগে জানলে না কি তাকে উপস্থাপনায় ও রাখা হতো না এরকম এরকম নানান নিন্দা।
কিন্তু তা থোরাই কেয়ার করেন জাভিয়ের বারডেমের।
তার, জায়গায় তিনি রয়েছেন অবিচল।
আর, সত্য ন্যায়ের পক্ষে থাকার জন্য এই জাভিয়ের বারডেমকে জানাই স্যালুট।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!