জুম্মার দিন। পাজামা-পাঞ্জাবি পরে মসজিদে যাচ্ছিলেন তিনি। পথে এক লোক তাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "জীবনে এত আকাম-কুকাম করছেন, জুম্মার নামাজ পড়ে আপনার লাভ কী?"
শুধু তাই নয়, শোনা যায় সিনেমায় তার খলচরিত্রে অভিনয় দেখে পর্দার উপর জুতা ছুঁড়েছেন কেউ কেউ।
এতটাই শক্তিশালী অভিনেতা ছিলেন এ টি এম শামসুজ্জামান। নোয়াখালীর নানাবাড়িতে আবু তাহের মোহাম্মদ শামসুজ্জামানের জন্ম হয়েছিল। বড় হয়েছেন পুরান ঢাকার দেবেন্দ্রনাথ দাস লেনে। সাহিত্য নিয়ে তুখোড় ফ্যাসিনেশন ছিল তার। স্কুলে থাকতে 'অবহেলা' নামে একটা গল্প লিখেছিলেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পর্যন্ত সে গল্প পড়ে বাহবা দিয়েছিলেন।
সাহিত্য করতে চাওয়া এ টি এমের চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হয়েছিল অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে। 'বিষকন্যা' মুভিতে উদয়ন চৌধুরীর এডি ছিলেন তিনি। এডি ছিলেন খান আতাউর রহমান, সুভাষ দত্ত, কাজী জহিরেরও। আর যেহেতু সাহিত্যের টান ছিল, কাহিনী আর চিত্রনাট্য লেখাতেও তার দারুণ দক্ষতা ছিল। 'জলছবি' সিনেমার কাহিনী আর চিত্রনাট্য লেখার মাধ্যমে তার স্ক্রিনপ্লে রাইটিংয়ের যাত্রা শুরু হয়। 'জলছবি' সেই সিনেমা যার মাধ্যমে অভিনেতা ফারুকের চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়েছিল। এরপর তিনি পঞ্চাশেরও বেশি বাংলাদেশি সিনেমার ডায়লগ ও স্ক্রিনপ্লে লিখেছেন।
১৯৬৫ সালে সিনেমাতে তার অভিনয়ের অভিষেক হয়। সিনেমার নাম ছিল 'নয়া জিন্দেগানি'। মজার ব্যাপার হলো, সেই সিনেমা কখনো রিলিজ হয়নি। এরপর ব্রেক পেতে তার প্রায় ৩ বছর সময় লাগে। ১৯৬৮ সালে নারায়ণ ঘোষ মিতা'র 'এতটুকু আশা' রিলিজ পায়। খবরের কাগজ বিক্রেতার ভূমিকায় প্রথমবারের মতো পর্দায় দেখা যায় তাকে।
প্রথম দিকে বেশ স্যাটায়ারিক্যাল ক্যারেক্টার প্লে করেছেন তিনি। শেষ দিকে এ নিয়ে আক্ষেপও করেছেন। তিনি মনে করতেন, যদি অভাব না থাকত, তবে হয়তো ভাঁড়ামি বাদ দিয়ে মনের মতো অভিনয় করতে পারতেন।
তবে তার শ্রেষ্ঠ অভিনয় দক্ষতা দেখা গেছে ভিলেন ক্যারেক্টারগুলোতে। ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট ছিল আমজাদ হোসেনের 'নয়নমণি'। সেই সিনেমায় মন্দ লোকের অভিনয় তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। অনেকেই তাকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের সর্বকালের সেরা ভিলেন মনে করেন। বাংলাদেশি গ্রিটি সিনেমার অঁতর কাজী হায়াতের সাজেশন, আপকামিং অ্যাক্টরদের উচিত তাকে নিয়ে গবেষণা করা।
তবে একই সাথে ফানি এবং সিরিয়াস ভিলেন আর্কেটাইপ ক্যারি করতে পারা অ্যাক্টর বাংলাদেশে হয়তো একজনই! বাংলাদেশি সিনেমায় একটা সময় গেছে যখন সিনেমা জমানোর জন্য তার কোনো অল্টারনেটিভ ছিল না।
তিনশ'রও বেশি সিনেমায় অভিনয় করা এ টি এম শামসুজ্জামান অভিনীত গ্রেট সিনেমার নাম নিতে গেলে সময় ফুরিয়ে যাবে। তারপরও বলতে হয় ওরা ১১ জন, সংগ্রাম, লাঠিয়াল, নয়নমণি, যাদুর বাঁশি, গোলাপী এখন ট্রেনে, অশিক্ষিত, সূর্যদীঘল বাড়ী, ছুটির ঘণ্টা, দায়ী কে?, চুড়িওয়ালা, চাঁপা ডাঙার বৌ, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, ম্যাডাম ফুলি, ঘৃণা, ভন্ড, আধিয়ার, মোল্লাবাড়ীর বৌ, হাজার বছর ধরে, ডাক্তার বাড়ি, গেরিলা, চোরাবালির কথা।
'দায়ী কে?' সিনেমার কদম আলী চরিত্রের জন্য তিনি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। তিনি এই ছবির রাইটারও ছিলেন, কো-রাইটার ছিলেন কাজী হায়াৎ। এ ছবির পর তিনি আরও ৪ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ম্যাডাম ফুলি, চুড়িওয়ালা, মন বসে না পড়ার টেবিলে সিনেমায় শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা হিসেবে। আর ২০১২ সালে 'চোরাবালি' সিনেমাতে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে ৷ ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার হচ্ছে, 'মোল্লাবাড়ীর বৌ' সিনেমাও তার গল্পে নির্মিত। 'এবাদত' নামে একটি সিনেমাও পরিচালনা করেছিলেন তিনি।
শুধু সিনেমা নয়, গুণী এই অভিনেতা বাংলাদেশের নাটকেরও অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ। রঙের মানুষ, ভবের হাট, পত্রমিতালী, শীলবাড়ি, ভোদাইয়ের মতো কাজগুলো এখনো দর্শকদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়।
এ টি এম শামসুজ্জামান চাইতেন সাহিত্যনির্ভর গল্পের চরিত্রে অভিনয় করতে। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় অভিনয় করা এই লেজেন্ডারি অভিনেতার বেশি বেশি সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে না পারার একটা আক্ষেপ ছিল।
২০১৫ সালে শিল্পকলায় অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক লাভ করেন।
আজ এই প্রখ্যাত স্টোরি, স্ক্রিনপ্লে এন্ড ডায়লগ রাইটার, লেজেন্ডারি অ্যাক্টরের জন্মদিন।
হ্যাপি বার্থডে এ টি এম শামসুজ্জামান!
#ATMShamsuzzaman #PopStream #Dhallywood #BangladeshiCinema #LegendaryActor
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!