জীবনটা চাইলে খুব সুন্দর করা যায়, তবে তার আগে তো নিজেকে আয়নায় একটু দেখতে হবে। নিজের দুই চোখের অপ্রকাশিত ও লুকায়িত আবেগগুলোর কতটা মায়া আছে, সেটা অনুভব করতে হবে। জীবনের চাপে আমরা নিজের আবেগগুলো অনুভবই করি না। মন যে কত কিছু চায়, সেটাও হয়তো ভুলে যাই। বেঁচে থাকা অবস্থায় অন্তত একবার হলেও নিজেকে নতুন করে চেনা উচিত।
স্বাধীনতার স্বাদ পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন হওয়াটাও প্রয়োজন। তাতেই নিজের আত্মা ও আত্মার সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব। আমরা জীবিকা ও জীবনের তাগিদে নিজেকে একইভাবে আয়নায় দেখতে থাকি, একইভাবে উপলব্ধি করতে থাকি। নতুন করে নিজেকে চিনতে বা বুঝতে চাই না। এই ড্রামা সিনেমাটি ঠিক এই বার্তাটাই দেয়— যদি জীবনের মোড় পরিবর্তন হয়, তাহলে আগে নিজেকে নতুন করে বুঝতে শিখুন। পুরোনো থেকে নতুন হতে হলে আগে দরকার ইচ্ছাশক্তি।
সিনেমার মূল চরিত্র মিস তেরেসা, যিনি একজন ধনী পরিবারের হাউসমেইড হিসেবে প্রায় ৩০ বছর ধরে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করে আসছেন। হঠাৎ সেই ধনী পরিবার বাড়ি বিক্রি করে দেওয়ায় তার চাকরিটা চলে যায়। তাই নতুন চাকরির উদ্দেশ্যে অন্য শহরে যাত্রা শুরু করেন। তিনি ভ্রমণে অভ্যস্ত নন, কারণ এই ৩০ বছর সেই বাড়িটাই ছিল তার মুক্ত বাতাস, তার ছোট্ট পৃথিবী।
নতুন স্বপ্ন আর নতুন ইচ্ছা নিয়ে মরুর পথে চলতে থাকেন। পথিমধ্যে একটি মেলায় তার ব্যাগ হারিয়ে যায়। যে ভ্যানে তিনি ব্যাগটি রেখে গিয়েছিলেন, পরে সেখানেও সেটি পাওয়া যায় না। সেই ভ্যানের চালক El Gringo, যিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে পোশাক বিক্রি করেন। সেখান থেকেই মিস তেরেসার সঙ্গে তার পরিচয়। পঞ্চাশোর্ধ্ব তেরেসার জীবনে আবেগের উষ্ণতা যেন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। জীবিকা থাকলেই যেন জীবন চলে।
সিনেমায় তেমন বড় কোনো ঘটনা নেই। খুব শক্তিশালী প্লটও নয়। পুরো গল্পটাই যেন এক দীর্ঘ পথচলার গল্প। El Gringo ও মিস তেরেসা ব্যাগের খোঁজে একসঙ্গে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন। পথে বিভিন্ন জায়গায় থামেন, নানা মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। শুরুতে মিস তেরেসা লাজুক স্বভাবের হওয়ায় বেশ অস্বস্তি বোধ করেন। তবে ধীরে ধীরে El Gringo-র সঙ্গে তার আন্তরিকতা ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
এই দীর্ঘ যাত্রায় মিস তেরেসা নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার করতে থাকেন। অন্তরে হয়তো নতুন একটি পথের সৃষ্টি হয়, সেই পথ দিয়েই তিনি জীবনের অর্থ নতুনভাবে বুঝতে শেখেন। তিনি তিরিশ বছর অন্যদের জন্য বেঁচে ছিলেন, এখন ধীরে ধীরে নিজের জন্যও বাঁচতে শিখছেন। নিজের স্বাধীনতাকে অনুভব করতে শিখছেন। জীবন আসলেই রহস্যে ভরা। কখন যে হঠাৎ বদলে যায়, কেউ জানে না।
El Gringo ও মিস তেরেসার মধ্যে ধীরে ধীরে এক গভীর মানবিক বন্ধন তৈরি হয়। তারা শুধু হারানো ব্যাগ খুঁজছিলেন না, বরং তেরেসা যেন নিজের জীবনের অর্থও খুঁজে পাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সামনে অপেক্ষা করে নতুন পরিচয়, নতুন স্বাধীনতা আর নতুন জীবন।
সিনেমার মূল বিষয় ছিল হারানো ব্যাগের খোঁজ। কিন্তু ব্যাগ খুঁজতে গিয়েই তেরেসা বুঝতে পারেন, তিনি তো বহু আগেই নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাই এই যাত্রা শুধু একটি ব্যাগ ফিরে পাওয়ার গল্প নয়, বরং নিজের হারিয়ে যাওয়া সত্তাকে ফিরে পাওয়ার গল্প। সামনে নতুন পরিচয়, নতুন স্বাধীনতা, নতুন জীবন। উত্তপ্ত মরুর পথ সেই পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে।।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!