অসাধারণ একটা আর্জেন্টাইন সিনেমা। ভিন্ন গল্প আর ভিন্ন ধারার এই সিনেমাটি ভালো লাগবেই, বিশেষ করে যারা ড্রামা পছন্দ করেন। যদিও এটা ক্রাইম ড্রামা, তবে জীবনের প্রকৃত সংজ্ঞা হয়তো এই সিনেমা অসাধারণভাবে ব্যাখ্যা করেছে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের মন কতটুকু প্রশান্তি চায়, সেটা হয়তো আমরা বুঝেই উঠতে পারি না। আমরা সময় ও বেঁচে থাকার দাসত্বে বন্দী।
সিনেমাটি তিন ঘণ্টার, কিন্তু দেখতে দেখতে কখন যে শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। তিনটা পার্টে এই সিনেমা প্রেজেন্ট করা হয়েছে। প্রথম পার্টে ব্যাংক থেকে টাকা চুরি, দ্বিতীয় পার্টে টাকা লুকানো ও একঘেয়েমি জীবন থেকে মুক্তি নেওয়া, আর তৃতীয় পার্টে জেল থেকে মুক্তি ও দুই কলিগ বন্ধুর একত্র হওয়া। মানসিক মুক্তিকে উপভোগ করতে হবে তো।
প্রথমে মনে হবে ক্রাইম জনার সিনেমা, পরে আবার মনে হবে ক্রাইম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবনের মানে আসলেই কী, সেটার খোঁজ করা এবং সুখ খুঁজে নেওয়া। আবার জেল জীবনের দৃশ্যগুলো দেখলে মনে হবে ক্রাইম ফিরে এসেছে। শেষ আধাঘণ্টায় ক্রাইম হারিয়ে যায়। জীবনের নতুন দিগন্ত বেছে নেওয়ার দৃশ্য দেখায়। টাকাকে কেন্দ্র করে এত কিছু, সেই টাকা হয়তো জীবনের আত্মসন্তুষ্টির কাছে হেরে গিয়েছে। টাকা অনেক, আবার কিছুই না।
মিঃ মোরান একজন ব্যাংক অফিসার। চাকরিজীবন তার কাছে একঘেয়েমি হয়ে গিয়েছে। নিজের আত্মার চাহিদা বুঝতে পেরেছে, যেটা আমরা বেশিরভাগ সময় বুঝতেই পারি না। শরীর ও মন আর মানতে পারছে না, তাই ব্যাংক থেকে টাকা চুরি করে, কিন্তু চুরি করে তার প্রয়োজনমতো। হিসাব করে দেখল, তার চাকরির বয়স অনুযায়ী রিটায়ারমেন্ট পর্যন্ত চাকরি করলে $650,000 পাবে।
সেটাই করল। $650,000 টাকা চুরি করল। তারপর দূরের একটা গ্রামে ঘুরতে গেল। মিস নরমা নামে একটা মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। মেয়েটির সঙ্গে খাতির হয়ে যায়। পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়, নদী দেখে, ঘোড়ায় চড়ে, সেই সঙ্গে চলে জীবনের গল্প ও আড্ডা। মিস নরমা চাকরিজীবন পছন্দ করে না। দেখিয়ে দিল আত্মসন্তুষ্টির গভীরতা।
মিঃ মোরান টাকা লুকিয়ে রেখে গ্রাম থেকে শহরে চলে এল। পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করল। জেল হলো। সাড়ে তিন বছর জেল। সমস্যা কী? সাড়ে তিনটা বছর জেল খাটতে হবে। তদন্ত কার্যক্রম হয়, কিন্তু টাকা উদ্ধার করতে পারে না, যদিও তা ইন্স্যুরেন্স দিয়ে পূরণ করা হবে।
সিনেমার আরেক চরিত্র হচ্ছে রোমান, যিনি মিঃ মোরানের কলিগ। চুরি করা টাকা এই রোমানের কাছেই থাকে। প্রথম এক ঘণ্টা এই টাকা চুরির প্ল্যান ও টাকা চুরি দেখানো হয়। জেলখানায় মোরানের সঙ্গে রোমানের কথা হয়। সেই গ্রামে যেতে বলে আর টাকা লুকিয়ে রাখতে বলে।
সিনেমার দ্বিতীয় এক ঘণ্টা শুধুই রোমানকে নিয়ে। এই জনাব পরিবার নিয়ে অতটা হ্যাপি নন, কিন্তু গ্রামের সৌন্দর্য আর মিস নরমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তার জীবন বদলে দেয়। মিঃ রোমান নিজেকে বুঝতে শিখল, কী করে নিজের আত্মাকে আনন্দিত করতে হয়। এখানে সিনেমার প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়ে যায়। জীবনের বহু দর্শন দেখানো হয়েছে।
মিঃ মোরান ও মিঃ রোমান একই মেয়ের প্রেমে পড়ে, কিন্তু কোনো দ্বন্দ্ব, বিরোধ বা ত্রিভুজ প্রেমের কিছুই হয়নি। জীবনের পরিবর্তনই হয়তো তারা চায়।
তৃতীয় এক ঘণ্টায় মিঃ মোরানের জেল জীবন দেখানো হয়েছে। জেলে বই পড়ে সময় কাটায়। জেলে খুব কষ্টে আছে, কিন্তু এখানে তো আর অফিস করতে হচ্ছে না। জেল ও অফিসের মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই, শুধু স্থান ছাড়া। অফিসে বন্দী, জেলেও বন্দী। জীবন আসলেই সুন্দর, অদ্ভুত ও কষ্টময়।
তৃতীয় এক ঘণ্টায় দেখানো হয়েছে মানসিক স্বাধীনতা, যেটা মিঃ রোমান ও মোরান দুজনই চেয়েছিল। টাকা দিয়ে সব কেনা যায়, মনের স্বাধীনতা কেনা যায় না। তদন্ত কর্মকর্তারা মিঃ রোমানকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। মিঃ রোমান ঝুঁকি নিয়ে মিঃ মোরানের চুরির টাকা লুকিয়ে রাখে, কারণ অর্ধেক সে নিজেও পাবে।
বই পড়ে সময় কাটাত মিঃ মোরান। বই ছিল তার খুব কাছের সঙ্গী। মিঃ মোরানের প্ল্যান তো ভালোই ছিল। কষ্ট করে সাড়ে তিন বছর জেলে থাকবে, কিন্তু পরে তো টাকা পাবেই—তার লুকানো টাকা। সিনেমায় তৃতীয় এক ঘণ্টায় দেখায় মোরান মুক্তি পায়। চলে যায় সেই সবুজ পাহাড়ি গ্রামে। মিঃ রোমান পাহাড়ে বসে অপেক্ষা করছে।
সিনেমায় কিন্তু দেখায়নি যে পাহাড়ে গিয়ে দুই কলিগ টাকা ভাগ করছে। অনেক প্রশ্ন মনে আসবে, কিন্তু এই সিনেমার পরিচালক কিছু কিছু কনসেপ্ট দর্শকের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। একেক দর্শক এই সিনেমার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কী হয়েছে, সেটা নিজের মতো করেও ব্যাখ্যা করতে পারবে। টাকা ভাগ করা দেখায়নি, আবার তাদের দুইজনের এক প্রেমিকা মিস নরমার সঙ্গে কী হয়, সেটাও দেখায়নি।
আমি অনুমান করে বলছি, তারা হয়তো তিনজনে একসঙ্গে বন্ধুর মতোই আছে। টাকা হয়তো ভাগ করে নিয়েছে, আবার নেয়নি। মনে হয় না সেই চুরির টাকার ওপর আর কোনো মায়া আছে। জীবনের নতুনত্ব এসেছে। বোরিং থেকে আনন্দিত হয়েছে। বোরিং এক ধরনের ক্ষুধা, তাই আনন্দ, হাসি, প্রকৃতি আর প্রেম দিয়ে সেই ক্ষুধা নিবারণ তো করতেই হবে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!