মেঘ থম থম করে কেউ নেই নেই,
জল থৈ থৈ করে কিছু নেই নেই।
ভাঙ্গনের যে নেই পারাপার,
তুমি আমি সব একাকার।
আলমগীর কবির পরিচালিত কালজয়ী "সীমানা পেরিয়ে" সিনেমাতে, ভূপেন হাজারিকার গাওয়া এই বিখ্যাত গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল। সিনেমাতে দুর্যোগ পরবর্তী সময়ের ধ্বংস আর হাহাকার বোঝানোর ক্ষেত্রে গানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
তবে এটিই এই গানের প্রথম এবং মূল সংস্করণ নয়। "সীমানা পেরিয়ে" সিনেমাতে গানটি গাওয়ার প্রায় ১৫ বছর আগে, ভূপেন হাজারিকা প্রথম এই সুরের আরও একটি গান করেছিলেন। আর সবমিলিয়ে ভূপেন হাজারিকার তত্বাবধানে মোট চারবার, তিনটি ভাষায়, এই একই সুরের গান তৈরি করা হয়েছিল।
অসমীয়া সংস্করণ : এই গানটির মূল সংস্করণটি ছিল অসমীয়া ভাষায়। ১৯৬৩ সালে ভূপেন হাজারিকা নিজে এই সুরের মূল গানটি অসমীয়া ভাষায় লিখে ও গেয়ে প্রকাশ করেছিলেন। যার শিরোনাম ছিল "Buku Hom Hom Kore." গানটি মূলত ১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অসমীয়া সিনেমা "Maniram Dewan" এ ব্যবহারের জন্য তৈরি করেছিলেন উনি।
বাংলা সংস্করণ (বাংলাদেশ) : এরপর ১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত, প্রখ্যাত বাংলাদেশি পরিচালক আলমগীর কবিরের "সীমানা পেরিয়ে" চলচ্চিত্রে গানটি যুক্ত করা হয়েছিল। গানটির বাংলা সংস্করণটির কথা লিখেছিলেন, শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। ওনার লেখা সেই বাংলা সংস্করণটির শিরোনামই হলো "মেঘ থম থম করে।"
বাংলা সংস্করণ (ভারত) : বাংলাদেশের গানের সংস্করণটির কথা কিছুটা পরিবর্তন করে, এই একই সুরে ১৯৮০ সালে আরেকটি গান গেয়েছিলেন ভূপেন হাজারিকা। সেই গানের কথা ছিল, "চোখ ছল ছল করে ওগো মা।"
হিন্দি সংস্করণ: ১৯৯৩ সালে কল্পনা লাজমী পরিচালিত, বলিউড চলচ্চিত্র "Rudaali" তে এই সুরটি হিন্দি সংস্করণে রূপ নেয়। গুলজারের দুর্দান্ত কথায় এবং ভূপেন হাজারিকা ও লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে "Dil Hoom Hoom Kare" শিরোনামের গানটি সেইসময় তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
আমি তিন ভাষার চারটি গানই শুনেছি। তবে সবমিলিয়ে বাংলাদেশের বাংলা সংস্করণটির সঙ্গীতায়োজন আমার কাছে সেরা মনে হয়েছে। বাংলাদেশ এবং বাংলা আমার নিজের ভাষা এজন্য বলছি না, বাকিগুলোও ভালো। এছাড়া হিন্দি গান এমনিতেও আমার অনেক পছন্দের। তবে এই গানের ক্ষেত্রে, বাংলাটা একটু অন্যরকম সুন্দর হয়েছে। ভূপেন হাজারিকা অনেক দরদ দিয়ে বাংলাদেশের বাংলা গানটি গেয়েছেন।
"মেঘ থম থম করে" গানের মধ্যে এক অদ্ভুত সম্মোহনী ক্ষমতা আছে বলে মনে হয়। এজন্য গানটি শোনার সময় আমার সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট, গুপী গাইন চরিত্রটির কথা মনে পড়ে। গুপী গাইন গান গাইলে সবাই যেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে বাধ্য হতো, এই গানটিও আমি সেভাবেই শুনি। হাহাকারও যে এত শ্রুতিমধুর হতে পারে, সেটা এই গানটি শুনলেই বোঝা যায়।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!