প্রথম পাতাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগ্যালিলিও গ্যালিলি (Galileo Galilei) ,"আধুনিক বিজ্ঞানের জনক"

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

গ্যালিলিও গ্যালিলি (Galileo Galilei) ,"আধুনিক বিজ্ঞানের জনক"

গ্যালিলিও গ্যালিলি (Galileo Galilei) ,"আধুনিক বিজ্ঞানের জনক"

গ্যালিলিও গ্যালিলি (Galileo Galilei) ছিলেন ১৭ শতকের ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক। আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে তার অবদান এতই বিশাল যে তাকে "আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক", "আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনক" এবং "আধুনিক বিজ্ঞানের জনক" বলে অভিহিত করা হয়।


বিজ্ঞাপন

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন

গ্যালিলিও ১৫৬৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির পিসা (Pisa) শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ভিনসেঞ্জো গ্যালিলি ছিলেন একজন বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ। বাবার ইচ্ছায় গ্যালিলিও প্রথমে পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে তিনি নিজের পথ পরিবর্তন করেন।


প্রধান বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও অবদান

গ্যালিলিও বিজ্ঞানের জগতে এমন কিছু বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও যন্ত্র উপহার দিয়েছেন, যা পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের ধারণাই বদলে দিয়েছিল:


  • টেলিস্কোপ বা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের উন্নতি: গ্যালিলিও দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মূল আবিষ্কারক না হলেও, ১৬০৯ সালে তিনি এই যন্ত্রটির নকশায় ব্যাপক উন্নতি ঘটান। তার তৈরি দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করে তিনি প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের পাহাড়, উপত্যকা এবং গর্ত আবিষ্কার করেন।


  • বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহ আবিষ্কার: ১৬১০ সালে তিনি দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে বৃহস্পতি গ্রহের চারটি বৃহত্তম উপগ্রহ আবিষ্কার করেন (আইও, ইউরোপা, গ্যানিমেড ও ক্যালিস্টো)। এগুলোকে আজ "গ্যালিলিয়ান উপগ্রহ" বলা হয়। এই আবিষ্কারটি প্রমাণ করেছিল যে মহাবিশ্বের সবকিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে না।


  • শুক্র গ্রহের কলা (Phases of Venus): চাঁদের মতো শুক্র গ্রহেরও যে বিভিন্ন দশা বা আকার পরিবর্তন হয়, তা তিনি আবিষ্কার করেন। এটি সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদের পক্ষে একটি বড় প্রমাণ ছিল।


  • পড়ন্ত বস্তুর সূত্র (Law of Falling Bodies): প্রচলিত অ্যারিস্টটলের তত্ত্ব অনুযায়ী বিশ্বাস করা হতো ভারী বস্তু হালকা বস্তুর চেয়ে দ্রুত মাটিতে পড়ে। গ্যালিলিও পিসার হেলানো টাওয়ার থেকে ভিন্ন ওজনের দুটি বস্তু ফেলে প্রমাণ করেন যে, বাতাসের বাধা না থাকলে সব বস্তু সমান গতিতে নিচে পড়বে।


  • পেন্ডুলামের সূত্র: তিনি আবিষ্কার করেন যে একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের পেন্ডুলামের দুলতে সবসময় সমান সময় লাগে, তা সেটি যত জোরেই দুলুক না কেন। এই সূত্রটি পরবর্তীতে নিখুঁত ঘড়ি তৈরিতে সাহায্য করেছিল।


চার্চের সাথে দ্বন্দ্ব ও গৃহবন্দী জীবন

গ্যালিলিও পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব (Heliocentric Theory) সমর্থন করেছিলেন, যা বলে—"পৃথিবী নয়, বরং সূর্যই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ সূর্যের চারদিকে ঘোরে।"


কিন্তু তৎকালীন ক্যাথলিক চার্চ এই তত্ত্বের ঘোর বিরোধী ছিল, কারণ এটি বাইবেলের কিছু ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে যাচ্ছিল। ১৬৩২ সালে গ্যালিলিও তার বিখ্যাত বই"Dialogue Concerning the Two Chief World Systems" প্রকাশ করলে চার্চ ক্ষুব্ধ হয়। ১৬৩৩ সালে রোমান ইনকুইজিশন (ধর্মীয় আদালত) তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। নিজের জীবন বাঁচাতে তিনি চার্চের সামনে তার মতবাদ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন (যদিও লোককথা আছে, আদালত থেকে বের হওয়ার সময় তিনি ফিসফিস করে বলেছিলে"Eppur si muove" অর্থাৎ "তবুও এটি ঘুরছে")।


চার্চ তাকে আমৃত্যু গৃহবন্দী (House Arrest) থাকার সাজা দেয়,


শেষ জীবন ও মহাপ্রয়াণ

গৃহবন্দী থাকা অবস্থায়ও গ্যালিলিও তার বৈজ্ঞানিক গবেষণা থামিয়ে রাখেননি। শেষ জীবনে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান। ১৬৪২ সালের ৮ জানুয়ারি ৭৭ বছর বয়সে আর্সেত্রিতে এই মহান বিজ্ঞানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর প্রায় ৩৫০ বছর পর, ১৯৯২ সালে পোপ জন পল (দ্বিতীয়) আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেন যে গ্যালিলিওকে শাস্তি দেওয়া চার্চের একটি বড় ভুল ছিল।



০ মন্তব্য · ৫৭ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!