প্রথম পাতা › গল্প ও উপন্যাস › ঘোল খাওয়ানো

গল্প ও উপন্যাস

ঘোল খাওয়ানো

বিজ্ঞাপন
ঘোল খাওয়ানো

মফস্বল শহরের মজনু মিয়া নিজেকে এলাকার সবচেয়ে বড় চালাক ভাবত। তার মূল ব্যবসাই ছিল কথায় কথায় মানুষকে বোকা বানিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করা, অর্থাৎ সোজা বাংলায় "ঘোল খাওয়ানো। কিন্তু প্রবাদ আছে না—"সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি"? মজনু মিয়ার কপালেও তেমনই এক দিন ঘনিয়ে এল।

ঘটনার শুরু গত বুধবার। মজনু মিয়ার প্রতিবেশী বল্টু মিয়া এক্কেবারে সহজ-সরল মানুষ। বল্টু তার পৈতৃক আমলের এক জোড়া খাঁটি দেশি দুগ্ধবতী গাই গরু বিক্রি করবে। মজনু মিয়া খবর পেয়েই বল্টুর বাড়ি হাজির হলো।

বিজ্ঞাপন

সে বল্টুকে বলল, "আরে বল্টু ভাই, এই গরুর বাট তো ছোট! এরা দিনে দুই কেজির বেশি দুধ দেবে না। এক কাজ করো, আমার গোয়ালের ঐ যে কালা পাহাড় নামের ষাঁড়টা আছে না? ওটার সাথে তোমার এই দুই গাই অদলবদল করে নাও। লাভবান হবে!"

বল্টু সরল মনে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু বাড়ি গিয়ে বল্টু দেখল, মজনুর সেই 'কালা পাহাড়' আসলে এক বুড়ো, অলস ষাঁড়, যা সারাদিন শুধু শুয়ে থাকে আর মশা তাড়ায়! বল্টু বুঝল, "ঘোল খাইয়েছে।

বল্টু মনে মনে বলল, "রসো মজনু ভাই! তুমি যদি হও ডাল-ডাল, আমি তবে পাতা-পাতা। তোমাকে যদি এর উল্টো ঘোল না খাইয়েছি, তবে আমার নামও বল্টু না!"

পরদিন সকালবেলা বল্টু একটা খালি মাটির হাঁড়ি নিয়ে মজনুর বাড়ির সামনে দিয়ে হনহন করে হেঁটে যাচ্ছিল। মজনু ডেকে জিজ্ঞেস করল, "কী হে বল্টু ভাই? সাতসকালে খালি হাঁড়ি নিয়ে কই যাও?"

বল্টু ফিসফিস করে বলল, "আরে মজনু ভাই, আস্তে কথা বলেন! পাশের গাঁয়ের এক পীর বাবা এসেছেন। তিনি এই হাঁড়িতে ফুঁ দিয়ে দিয়েছেন। এই হাঁড়ি এখন অলৌকিক! এর ভেতর এক টাকার একটা কয়েন রেখে রাতে ঘুমালে, সকালে উঠে দেখা যায় হাঁড়ি ভর্তি চকচকে এক টাকার কয়েন হয়ে গেছে! আমি যাচ্ছি বাজারে আরও দুটো বড় হাঁড়ি কিনতে।"

লোভী মজনুর চোখ চকচক করে উঠল। সে ভাবল, বল্টু তো আস্ত বলদ, ওকে আবার ঘোল খাওয়ানো যাবে। মজনু বলল, "বল্টু ভাই, অত দূরে বাজারে কষ্ট করে যাওয়ার কী দরকার? এক কাজ করো, তোমার এই অলৌকিক হাঁড়িটা আমাকে দিয়ে দাও। আর বিনিময়ে আমার সেই দুই দুগ্ধবতী গাই গরু তুমি ফেরত নিয়ে যাও!"

বল্টু প্রথমে একটু আমতা আমতা করল, তারপর খুব অনিচ্ছার ভান করে হাঁড়িটা মজনুকে দিয়ে নিজের গরু দুটো নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল।

সেদিন রাতে মজনু মিয়া পরম উৎসাহে সেই মাটির হাঁড়ির ভেতর নিজের পকেটের শেষ ১০০ টাকার নোট আর কিছু কয়েন রেখে মনের সুখে ঘুমাল। রাতভর সে স্বপ্নে দেখল—সে টাকার পাহাড়ে বসে আছে!

পরদিন ভোরবেলা। মজনু ঘুম থেকে উঠেই এক লাফে গেল হাঁড়ির কাছে। ঢাকনাটা খুলতেই তার চোখ কপালে! হাঁড়ির ভেতরে টাকা-পয়সা তো বাড়েইনি, উল্টো ভেতর থেকে ভনভন করে একঝাঁক মাছি বের হয়ে এলো। আসলে বল্টু চালাকি করে হাঁড়ির তলায় সামান্য গুড় লেপ্টে রেখেছিল, যাতে মাছির গঞ্জনে মজনু ভাবে ভেতরে কিছু একটা অলৌকিক ঘটছে!

মজনু মিয়া রাগে কাঁপতে কাঁপতে বল্টুর বাড়ি গিয়ে চিৎকার শুরু করল, "বল্টু! তুই আমাকে ঠকিয়েছিস! তোর হাঁড়িতে কোনো টাকা ডাবল হয়নি, শুধু মাছি ডাবল হয়েছে!"

বল্টু তখন বারান্দায় বসে আরাম করে চা খাচ্ছিল। সে মুচকি হেসে বলল, "আরে মজনু ভাই, রাগ করছেন কেন? পীর বাবা তো বলেই দিয়েছিলেন—এই হাঁড়ি শুধু সরল মনের মানুষদের কাজ দেয়। আপনার মনে নিশ্চয়ই লোভ ছিল! তাই অলৌকিক টাকাগুলো সব মাছি হয়ে উড়ে গেছে।"

মজনু মিয়া এতক্ষণে বুঝল, চালাকি করতে গিয়ে সে নিজের খাঁটি গরু দুটোও হারাল, আবার পকেটের জমানো টাকা কটাও খোয়াল। গ্রামের মানুষ জমা হয়ে মজনুর এই দশা দেখে হাসাহাসি করতে লাগল।

মজনু মিয়া মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। যে মজন"এক বালতি খাঁটি ঘোল" খেয়ে চুপসে গেল!

০ মন্তব্য · ৮৫ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!