অকুতোভয় সৈনিক বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ।
১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যশোর জেলার গোয়ালহাটিতে পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে করার সময় পাক বাহিনীর হাতে শহীদ হন এই বীর।
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৩৬ সালে ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদরের চন্ডীকপুরস্থ মহেষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন৷ বাবা মোহাম্মদ আমানত শেখ এবং মা জেন্নাতুন্নেসা। তার বাবা ছিলেন কৃষক৷ নূর মোহাম্মদ পড়াশোনা করেছেন সপ্তম শ্রেনী পর্যন্ত।
কিন্তু অল্প বয়সেই অনাথ হন নূর মোহাম্মদ। পিতা মাতাকে হারিয়ে অকূল পাথারে পড়েন। পিতৃমাতৃহীন অবস্থায় আর্থিক সংকটের ফলে তিনি পৈতৃক জমিজমা বিক্রি করে ফেলেন। বিয়েও করলেন৷ স্ত্রী তোতাল বিবি, অবস্থাসম্পন্ন কৃষকের মেয়ে৷
নূর মোহাম্মদ শেখ একদিন দেখলেন বাড়ির ভিটি ব্যতীত বিক্রি করার মতো তাঁর আর কোনো জমি নেই৷ অবশ্য বিয়ের পর থেকে তিনি শ্বশুরবাড়িতেই বাস করছিলেন৷ কিন্তু নিজের ভেতর একটা বিষয় জাগ্রত হলো, কিছু একটা করা প্রয়োজন, এখন সংসার হয়েছে৷ উপার্জনের জন্য তিনি প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে যোগ দিলেন স্থানীয় আনসার বাহিনীতে৷ কিন্তু তাতেও সংসার চলে না ৷
১৯৫৯ সালের ১৪ মার্চ তিনি যোগ দিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস অর্থাৎ ইপিআরে৷ তখন বয়স মাত্র তেইশ৷ বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার দেড় বছর পর তিনি এই চাকরি পেলেন৷ প্রাথমিক সামরিক শিক্ষা সমাপ্ত হলে নূর মোহাম্মদ শেখকে পোস্টিং দেয়া হলো দিনাজপুর সেক্টরে৷ ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি দিনাজপুর সেক্টরে যুদ্ধে আহত হন। যুদ্ধে তাঁর বীরত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ সরকার তাঁকে ‘তমগা-এ-জং’ ও ‘সিতারা-এ-হরব’ পদকে ভূষিত করে। ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে তিনি যশোর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে বদলি হন।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে গ্রামের বাড়িতে ছুটি কাটাতে এসে নূর মোহাম্মদ মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধ চলাকালীন ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বে যশোরের শার্শা উপজেলার কাশিপুর সীমান্তের বয়রা অঞ্চলে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন নড়াইলের এ সাহসী সন্তান। এ সময় এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী এবং সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কমান্ডার ছিলেন মেজর এম এ মঞ্জুর।
৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ ৷
সকাল সাড়ে নয়টা৷ শত্রুর গতিবিধির ওপর লক্ষ্য রাখছিলেন ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ ও তাঁর দুই সঙ্গী৷ শত্রুর দিকে নজর রাখতে গিয়ে উল্টো শত্রুরই নজরে পড়ে যান তাঁরা৷ হানাদাররা তাঁদেরকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে৷ হানাদাররা গুলি চালাতে চালাতে এগুতে থাকে তিন দিক থেকে।
এই হঠাৎ পরিস্থিতিকে আঁচ করে নেন নূর মোহাম্মদ৷ তাঁদের কাছে আছে মোটে একটি হালকা মেশিনগান আর দুটি রাইফেল৷ একদিকে ওরা তিনজন আর অন্যদিকে পাকিস্তানের একটি বিশাল সেনাদল৷ সামান্য অস্ত্র দিয়ে তাদের মোকাবেলা করা একেবারেই অসম্ভব৷ তাঁদের সামনে ডানে-বাঁয়ে তিন দিকেই শত্রু, এখন উপায় কেবল পেছন দিক দিয়ে হটে যাওয়া৷ হটে যেতে পারলে মুক্তিবাহিনীর স্থানীয় মূল ঘাঁটিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে৷ নূর মোহাম্মদের ভাবনায় এল, এতে পাক হানাদার বাহিনী মুক্তিবাহিনীর মূল ক্যাম্পে পৌঁছানোর সুযোগ পেয়ে যাবে, যা মোটেও ঠিক হবে না৷ যতক্ষণ পারা যায় প্রতিরোধ করতে হবে৷ এতে মূল ঘাঁটির মুক্তিযোদ্ধারা লড়াই করার কিংবা পিছু হটার সুযোগ পাবে৷
এরই মধ্যে গুলি আসতে লাগল তিন দিক থেকে৷ গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়লেন সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া৷ হাত থেকে পড়ে গেল এলএমজিটা৷ খুব দ্রুততার সাথে নান্নু মিয়াকে কাঁধে তুলে নিলেন নূর মোহাম্মদ, অন্য হাতে তুলে নিলেন লাইট মেশিনগান৷ ডানে বামে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে লাগলেন তিনি৷ এতে হানাদাররা একটু স্থিমিত হলো ৷
এবার নূর মোহাম্মদ হানাদার বাহিনীকে ভ্রান্ত ধারণা দেবার জন্য নতুন এক কৌশল করলেন৷ এক জায়াগায় থেকে মেশিনগান চালিয়ে তিনি আবার অন্য জায়গা থেকে মেশিনগান চালান৷ এভাবে স্থান পরিবর্তন করে করে মেশিনগান চালাতে লাগলেন তিনি৷ এতে কাজও হলো৷ হানাদার বাহিনী ভেবে নিল শুধু তিনজন মুক্তিযোদ্ধা নয়, এরা সংখ্যায় অনেক আর অস্ত্রও আছে৷ এতে হানাদাররা গুলি কিছু কমিয়ে দিল ৷
এই ফাঁকে কিছুটা সময় পাওয়া গেল৷ এই সুযোগে নূর মোহাম্মদ নান্নু মিয়াকে নিয়ে একটু পিছু হটে এলেন, অনেকটা নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে। কিন্তু বাদ সাধল একটা মর্টারের গোলা৷ পড়ল এসে নূর মোহাম্মদের ডানপাশে৷ স্প্লিন্টারের আঘাতে তাঁর হাঁটু ভেঙে গেল, একটা বড় ক্ষত তৈরি হলো কাঁধে৷ রক্তে ভিজে গেল সমস্ত শরীর।
নূর মোহাম্মদ অতি সামনে থেকে তাঁর মৃত্যুকে দেখতে পেলেন৷ সঙ্গে সঙ্গে তিনি অধিনায়কের দায়িত্ব দিলেন সিপাহী মোস্তফা কামালকে৷ এলএমজি তাঁর হাতে তুলে দিয়ে তাঁর এসএলআর রাখলেন নিজের কাছে৷ এলএমজি শত্রুর হাতে পড়ুক তিনি তা চান না৷ কাতর অথচ দৃঢ়কন্ঠে বললেন, 'মোস্তফা কামাল, তুমি আহত নান্নু মিয়াকে নিয়ে দ্রুত পিছনে হটতে থাকো৷ আমি যতক্ষণ পারি শত্রুকে ঠেকিয়ে রাখব।'
সিপাহী মোস্তফা থতমত খেয়ে ল্যান্স নায়েকের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিলেন৷ নূর মোহামদ তাঁর হাত দুটি ধরে নরম গলায় অথচ দৃঢ়ভাবে বললেন, 'আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখ, যেভাবে জখম হয়েছি তাতে আমার আর বাঁচার সম্ভাবনা নেই৷ যেভাবে রক্তপাত হচ্ছে, তাতে এখনই আমার সারা শরীর ঝিমঝিম করছে, চোখে ঝাপসা দেখছি৷ আমাকে সুদ্ধ নিতে গেলে তোমরা দু'জনও মারা পড়বে৷ তিনজন মরার চেয়ে দু'জন বাঁচা ভালো নয় কি! দেশের স্বাধীনতাকে আনার জন্য তোমাদের বাঁচতে হবে ৷ আমি নির্দেশ দিচ্ছি, তোমরা সরে যাও৷'
সিপাহী মোস্তফা, ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের এই নিষ্ঠুর আদেশ শিরোধার্য করে নান্নু মিয়াকে কাঁধে তুলে লাইট মেশিনগানটা হাতে নিয়ে পিছু হটতে লাগলেন৷ আহত নূর মোহাম্মদ রক্তাক্ত ভুলুন্ঠিত অবস্থায় একাই লড়তে লাগলেন৷ সে এক ভয়ংকর যুদ্ধ৷ অবিশ্বাস্য লড়াই৷ একদিকে মাত্র একজন মুক্তিযোদ্ধা৷ তাঁর হাতে একটি মাত্র রাইফেল৷ আর তাঁর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন৷ আর অন্যদিকে একটি শক্তিশালী বাহিনী৷ শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে একেবারে মৃতপ্রায় অবস্থায় একাই লড়াই চালিয়ে গেলেন নূর মোহাম্মদ ৷ তাঁর শরীর রক্তক্ষরণের ফলে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে এল৷
জীবনের শেষবিন্দু শক্তি দিয়ে তিনি হানাদারদের দিকে ট্রিগার টিপলেন৷ ততক্ষণে মোস্তফা কামাল নান্নু মিয়াকে নিয়ে নিরাপদে পৌঁছে গেছে৷ নিজের জীবনের বিনিময়ে নূর মোহাম্মদ এক মরণজয়ী যুদ্ধে বাঁচিয়ে দিলেন সহযোদ্ধাদের।
তার এক ঘন্টা পর৷ এবার মূল ঘাঁটির মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর ওপর পাল্টা আক্রমণ করল৷ মুক্তিযোদ্ধাদের পরাক্রমে টিকতে পারল না পাকিস্তান সেনাদল৷ তারা পিছু হটতে বাধ্য হলো৷ দুশমনরা এলাকা ছাড়লে মুক্তিযোদ্ধারা খুঁজতে লাগল ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখকে৷ তাঁর মৃতদেহ পাওয়া গেল ঝোঁপের পাশে৷ বেয়নেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত একটা লাশ৷ বর্বর পাকসেনা অন্য কাউকে না পেয়ে সমস্ত ক্ষোভ ঝেড়েছে লাশের ওপর৷ প্রতিহিংসায় উপড়ে ফেলেছে তারা নূর মোহাম্মদের দুটি চোখ। এই বীরসেনানীকে পরবর্তীতে যশোরের কাশিপুর গ্রামে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছেই সমাহিত করা হয়। সেখানেই নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ স্মৃতিস্তম্ভ। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের জন্য নূর মোহাম্মদ শেখকে ভূষিত করা হয় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান 'বীরশ্রেষ্ঠ' উপাধিতে।
নূর মোহাম্মদ শেখ মরতে ভয় পাননি। দেশামাতৃকার কাছে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে হয়েছে তাঁর৷ এ জন্যই তিনি বীরশ্রেষ্ঠ। যতদিন থাকবে বাংলাদেশ, ততদিন বাংলার এই সূর্যসন্তানরা থাকবেন দেশের মানুষের হৃদয়ে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
আজ বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫ তম মৃত্যু বার্ষিকী। এই মহান বীরের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!